পোড়া শহর…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
শেখ রানা

শেখ রানা (এডিনবরা, স্কটল্যান্ড থেকে)

এবার  গীতিকারের গল্প পর্বে পোড়া শহর। আমার ব্যান্ড নস্টালজিক এর দু বছর পূর্তি উপলক্ষে নিমতলির সেই হৃদয়বিদারক দূর্ঘটনা নিয়ে বাঁধা’ পোড়া শহর’ এর পেছনের গল্প।

যে চোখের কালোয় নির্ঘুম রাত, সে চোখের আলোয় শব্দপাখির দল … 

২০১০ এর শুরু শুরুতে দেশে ফিরে একটা মিশ্র অনুভূতি হলো আমার। আনন্দ-বেদনা মাখামাখি। বোহেমিয়ান জীবনের পথচলায় হঠাৎ একটা লম্বা দৈর্ঘ্যের সাময়িক বিরতি।
সে সময়ে গল্পগুলো রাতেই আসতো। শব্দগুলো দেয়ালের সাদা ধুসরেই থেকে যেতো সবার অলক্ষ্যে, আমার মত। আমি দিন ঘুম দিন শেষে রাত জাগা প্রস্তুতি নিয়ে দিন শুরু করতাম। সবাই যখন ঘুমের দেশে, পুরো শহর যখন দুরপাল্লা ট্রেনের কামরায় নিঝঝুম… আমি তখন শব্দ চোখে আমার বুকের ভিতরের বিষাদ ধরতাম।
বিষাদ রাতগুলো আমার জন্য আনন্দচোখ ছিলো… 

আনন্দচোখ! আমার লিরিক,তোমার আয়নায় দৃশ্যমান হোক… 

অনেকদিন পর চেনা পরিবেশে যখন লিখতে বসলাম, শব্দগুলো আমার কাছে নতুন হয়ে ধরা দিলো। নাগরিক চারপাশ, ভিড়ের মানুষ হয়ে যাওয়া এক এক মুখ, চার দেয়ালে বন্দী ভোরের ঘুম, অচেনা হয়ে যাওয়া প্রিয় শহর…এমন সব শব্দ ছন্দের বিনি সুতোয় বাঁধা হতে লাগলো আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে। লেখা শেষ করার এক অপার্থিব অনুভুতি।
আমি তখন এক একটা আলোর রাতের গল্প লেখায় নির্ভার …

তারপর একদিন! 

তারপর একদিন আমি প্রবল বিষাদে এলোমেলো হই।
ততদিনে লন্ডনের অপ্রিয় গ্রীষ্মে আমাকে খুঁজে বের করা সামির এর ঢাকার স্টুডিওতে আড্ডা শুরু হয়। অলস বিকেলগুলো প্রানবন্ত হয়ে ওঠে। সামির মাত্রই সাউন্ড এর উপর পড়াশোনা শেষ করে ফিরে এসেছে। আমরা নানারকম এক্সপেরিমেন্ট করি। নিজেরাই রেকর্ডিং করে ডিলিট করি আর নতুন একটা রেকর্ডিং এর প্ল্যান-প্রোগ্রাম ঠিক করে উদাস মুখে বিড়ি ধরিয়ে পুরান ঢাকায় ঘুরতে বেরোই।
জুন মাস এর মাঝামাঝি। স্টুডিও থেকে বাসায় ফিরে আসি রাত করে। রাতের খাবার নিয়ে টিভি দেখতে বসি। খবর শুরু হতেই নিমতলি! নিমতলির আগুন!
হলুদ আগুন হলুদ গায়ে রং…বিস্ফোরণে সমস্ত বিভ্রম…
হু হু ঘুরপাক বুকের ভিতর…রাত বাড়তেই বিষাদ ক্রমে অস্থির করে তোলে আমাকে। শান্ত হতে ল্যাপটপ এর ঝাপসা আলো আধাঁরিতে লিরিকে মন ফেরাতে চাই।

সেরাতে সমস্ত শব্দ, অনেক দূরে দৃশ্যকল্প সাজাতে ব্যস্ত।
সেরাতে আমার হাতে কিছুই ছিলো না…

বাতাস আমায় দিলো না ধূলি… 

তার বেশ কিছুদিন পর নিমতলিতে যাই। একা একা হেঁটে বেড়াই। দেয়ালে দেয়ালে তখনও লেগে থাকা আগুনের এলোমেলো স্বাক্ষর দেখি। দেখতে থাকি আর হাঁটতে থাকি। হাঁটতে থাকি আর স্থির হই মনে মনে।
রাতে ফিরে এসে ফেসবুকে কথা হচ্ছিলো এক ব্লগ বন্ধুর সঙ্গে। জানতাম ও নিমতলির খুব কাছে থাকতো। কথা প্রসঙ্গে জানায়, ওর আর পোড়া শহরে ফিরতে ইচ্ছে করে না। আগুন লাগার পর অনেকদিন শহর থেকে দূরে ছিলো ও। পোড়া শহর থেকে দূরে…

আমার মাথার ভিতর একটা লাইন ঢুকে যায়। যে লাইনটা দিয়ে গানটা শেষ হয় অবশেষে, সেই লাইনটা মাথার ভিতর ঘুরপাক খেতে থাকে শুরুতে। চা বানিয়ে আমি শান্ত হয়ে লেখায় বসে যাই।
আমি আগুন দেখতে পাই, শব্দগুলোর আসা যাওয়া দেখি আর শুনি, ‘পোড়া শহরে ফেরা হয় না আর…’

সব পুড়ে যায়, আগুন পুড়ে যাক …

পোড়া শহর লিখে ফেলি খুম কম সময়ে। ২০১০ এর জুন মাসের কোনো এক শেষ রাতে লেখা শেষ করে আমি ছাদে উঠি। ভোরের আলোর শুভ্রতা চোখে-মুখে এসে লাগে। ছোটো ভাই একসময় টবে ফুল ফোঁটাবার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিলো, সেই ফুলের সমারোহ ছাদ জুড়ে। নাম না জানা ফুলের গাছ দেখতে দেখতে আমার মনে পড়ে ছোটো ভাইটাকে অনেকদিন ডেকে ভালোমন্দ জিজ্ঞাস করা হয়না কিছু। অথচ ছোটোবেলায় দু’ভাই হাইকোর্টে কত খেলতাম, ঘুরে বেড়াতাম। এইসব হাইকোর্টের সুন্দর দিন ভাবতে ভাবতে পোড়া শহর একদম মাথা থেকে শূন্যে পাঠিয়ে আমি ছাঁদ থেকে নেমে আসি। লিরিকটা ব্লগে পোস্ট করি।
গাঢ় ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে আমার মাথার ভিতর একটা সুর তৈরি হতে থাকে।
পোড়া শহরকে আমি আসলে ঘুমের দেশে নিয়ে যাই, অন্য ঘুমের দেশে পাঠিয়ে দেবো বলে…

গান গায় বি মাইনর … 

বনির দেয়া সিগ্নেচার গিটার হাতে টুংটাং করতেই একটা সার্কেল পেয়ে যাই গিটারে। বি মাইনর-এফ শার্প-জি-এ ধরে বাজাতেই পোড়া শহর বেজে ওঠে। রেকর্ড করে রাখি ল্যাপটপেই। বুঝতে পারিনা সুরটা কেমন হলো।
তার অনেক দিন বাদে বর্ষা অনুভূতি গানটা রেকর্ড করে আমি আর সামির পোড়া শহর নিয়ে বসি স্টুডিও-তে। সামির সুরটা শুনে খুব পছন্দ করে। ততদিনে আমাদের বন্ধু হয়ে যাওয়া বুশরা, রাসেল, রিঙ্কি( এই ব্যাটা অনেক আগে থেকেই জ্বালায় আমাকে। স্কুলের বন্ধু আমার!)হিজল-সবাই এক বাক্যে পোড়া শহরটা করে ফেলতে বলে। অনেক সঙ্কোচ আর দ্বিধা কাটিয়ে রেকর্ড করে ফেলি। নানা কাঁটা-ছেড়া, কম্পোজিশনের এ বাঁক ও বাঁক, নানারকম হামিং এর এক্সপেরিমেন্ট শেষে পোড়া শহর-টা নিয়ে বনির কাছে যাই। বনি খুব ভালো একজন কম্পোজার। আমার প্রিয় ছোটো ভাই। বারেবারেই মনে হতে থাকে, এই গানটা সবচেয়ে ভালো কম্পোজ বনি-ই করতে পারবে।
একসময় সময়ের নিয়ম মেনেই কম্পোজ শেষ হয়ে যায়। তারওপরে মিক্সিং মাস্টারিং শেষে পোড়া শহর শোনার উপযোগী হয়। আমি ট্রেইন্ড ভোকাল না হওয়ায় ভালো একজন ভোকাল আর ব্যান্ডের জন্য ভালো একটা নাম খুঁজি। কেউ গানের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাস করলে হেসেই উড়িয়ে দিই কিন্তু মনে মনে ভাবি নিজের মত করে কিছু গান যদি করা যেতো। একটা দারুন ব্যান্ড যদি আমার হতো। সঞ্জীব’দার মত লিরিক যদি সুর করতে পারতাম!
ভোকাল খুঁজে পাওয়া হয়না, তবে ব্যান্ড এর জন্য নাম পেয়ে যাই। নাম ঠিক করি-নস্টালজিক। আমার ব্লগের নিকটাকেই মনে ধরে যায় আমার!(ধন্যবাদ সামহোয়ার ইন ব্লগ)

যে জ্বলে আগুন জলধির! 

এভাবেই পোড়া শহর আগুনে পুড়তে থাক, ছায়ায় বিশ্রাম নেয়, শহরে দিন যায়, রাত যায়…সব বিগত হতে থাকে, আমাদের হাসি-কান্না, সবুজ, স্মৃতি, খেলার মাঠ…সব। শুধু পড়ে থাকে শহর। পুড়তে থাকে শহর। বিশ্বাসে-অবিশ্বাসে, পালাবদলে, হিংসায়, মেকি ভালবাসার কুটিল হাসিতে প্রতিদিন পুড়ে যেতে থাকে শহর।
আমি এসব দেখি। ভাবনার দাবানলে প্রহরগুলো ফিনিক্স পাখি খুঁজে বেড়ায়। এক একবার ফিনিক্স পাখি মনে করে আমি ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাড়াই, কিন্তু অনেকদুর একসাথে যাওয়ার পর দেখতে পাই- যে সব পাখির কলরবে জেগে উঠেছিলো পুরো শহর, সেসব পাখি নিজেরাই ছাইভস্মে বিলীন হয়ে ছিলো বহুদিন!
ফিনিক্স পাখির অপেক্ষা শেষ হয় না আর…

আজ এতদিন পর, প্রায় তিন তিনটা বছর শেষে গানটা সবার সঙ্গে শেয়ার করতে যেয়ে বারবারই মনে হচ্ছিলো গানের কথাগুলো এই সময়ের প্রেক্ষাপটেই লেখা…বুক পাঁজরের হাড় খামচে ধরে আছে অগ্নিল চারপাশ… 
আর আমরা মুক্তির গান গেয়ে ক্রমেই নিজের ভিতর আবদ্ধ হচ্ছি শৃংখলে,
বন্দী হচ্ছি সমস্ত বিভ্রমে…

পোড়া শহর,এক একটা উত্তাপ
খামচে ধরে বুক পাঁজরের হাড়
আগুন আলোয় মুহুর্ত শ্মশান
ভীড় বাড়ে,ঘুম ভাঙ্গে-অন্ধকার!

হলুদ আগুন,হলুদ গায়ে রঙ
বিস্ফোরণে সমস্ত বিভ্রম
দেয়াল ঘড়ি,সময় বাড়ে রাত
সব পুড়ে যায়,আগুন পুড়ে যাক

আগুন,তুমি পাহাড়ে হারাও
আগুন,তুমি সমুদ্র জল নাও
আগুন,তুমি নির্বাসনে যাও
মধ্য রাতের ভুল পথ, ভুল বাতাস

বন্ধু,তোমার শহর অচেনা
পাখিগুলো হারায় ফেরে না
ফিনিক্স জাগে,অপেক্ষা তোমার
ভস্ম ছাইয়ে উঠে দাড়াবার

ছবি:গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com