“পুরুষ মানুষের কলংক হয়না; কলংক কেবল নারীর”

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাসকাওয়াথ আহসান

সমাজে কোন অপরাধের জন্য দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে; সে অপরাধ জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। এ কারণেই ধর্ষকের মতো ভয়ংকর অপরাধ প্রবণতা বাংলাদেশ সমাজে মড়কের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই খবরের কাগজে ধর্ষণের খবর প্রকাশিত হয়। যে ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে নাগরিক সমাজ বাদ-প্রতিবাদ করে; সে ঘটনাটির বিচারে ক্ষমতা কাঠামোটি কিছুটা সক্রিয় হয়। কখনো কখনো তা হয় সাময়িক সক্রিয়তা। নাগরিক সমাজ অন্য কোন সংকটে বাদ-প্রতিবাদে ব্যস্ত হয়ে পড়লে; অর্থাৎ জনমনোযোগ একটি ঘটনা থেকে অন্য ঘটনায় সরে যাওয়া মাত্রই ক্ষমতা কাঠামো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ফলে অধিকাংশ ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। এই পার পেয়ে যাওয়ার সামাজিক সংস্কৃতি অন্য অপরাধীদের আত্মবিশ্বাস দেয় ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটনে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার হোটেল রেইন দ্য ট্রিতে দুজন তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনাটি জনমনোযোগ পেয়েছে; এ নিয়ে বাদ-প্রতিবাদ হয়েছে; ফলে সরকার সক্রিয় হয়ে আসামীদের গ্রেফতার করেছে। কিন্তু কিছুদিন আগে ঢাকার বাইরে গাজিপুরে একটি কন্যাশিশু ধর্ষিত হওয়ার পর স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপে কন্যাশিশুটির পিতা আপোষে বাধ্য হয়ে সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভে কন্যাশিশুটিকে নিয়ে তার রেল লাইনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।। ঘটনাটি মিডিয়ায় এলে কিছু বাদ-প্রতিবাদ ঘটে। কিন্তু রাজধানীর বাইরের প্রত্যন্তের ঘটনা বলেই একসময় তা বিস্মৃতির অতলে চলে যায়। এইভাবে অসংখ্য ধর্ষণের ঘটনা হারিয়ে যায় জনস্মৃতি থেকে। আর এই জনবিস্মৃতির সুযোগে ক্ষমতা কাঠামো ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে আন্তরিক সক্রিয়তা দেখায় না। ধর্ষণ প্রবণতা সমাজ মানসে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে “নারী”-কে পারিবারিক “সম্মান” বা অনারের সঙ্গে সম্পৃক্ত করায়; যে নারী ধর্ষিত হয় তাকে বাধ্য করা হয় পরিবার আর কম্যুনিটির সম্মানের দিকে তাকিয়ে ধর্ষণের বিষয়টি গোপন রাখতে। অথচ ধর্ষকের কারণে তার পরিবারের বা কম্যুনিটির কোন সম্মানহানি ঘটেনা। পুরুষ শাসিত সমাজ এভাবেই ধর্ষকদের “সম্মান” রক্ষার দায়মুক্তি দিয়ে ধর্ষিতাদের কাঁধে তুলে দিয়ে আসছে সমুদয় সম্মান রক্ষার দায়িত্ব। এর ফলে বাংলাদেশের নারী সমাজকে নানারকম সম্মান রক্ষার দায় নিয়ে প্রায় জীবন্মৃত অবস্থায় থাকতে হয়। একটি ধর্ষণকে কেন্দ্র করে কোন অভিযোগ দায়ের করতে চাইলে; পরিবারের সম্মানের স্বার্থে পরিবারের অনেকেই বিষয়টিকে নিরুৎসাহিত করে; এরপর সমাজ আসে শুভাকাংক্ষী সেজে অভিযোগ দায়ের না করার পরামর্শ নিয়ে; বরং ধর্ষিতা মেয়েটিকেই “ধর্ষণে”-র জন্য দায়ী করে এই কুমিরের অশ্রু বিসর্জনকারী পরিপার্শ্ব। এরপরেও ধর্ষিতা মেয়েটি অভিযোগ দায়ের করতে গেলে পুলিশ বিষয়টিকে প্রাথমিক অবস্থায় অবজ্ঞা করে; কোন কোন ক্ষেত্রে ধর্ষিতা নারীর দ্বিতীয়বার ধর্ষিত হবার আশংকাও তৈরী হয় পুলিশের সাহায্য নিতে গিয়ে। কোনভাবে অভিযোগ দায়ের করা হলেও পুলিশ, ধর্ষণের আলামত পরীক্ষাকারী ডাক্তার, আইনজীবী, আদালত পদে পদে হেনস্থা করতে থাকে “ধর্ষিতা”-কে। ধর্ষণে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া নারীকে রীতিমতো রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ষণের মুখোমুখি হতে হয় ধর্ষণের বিচার পেতে। আর এই আইনী প্রক্রিয়া চলাকালে ধর্ষকের পক্ষ থেকে “প্রভাবশালী”রা ধর্ষিতা নারীর পরিবারকে হুমকি-ধামকি দিতে থাকে। ওদিকে কথিত নরভোজি সমাজটি ধর্ষিতা নারীর চরিত্র খারাপ বলেই এমন ঘটনা ঘটেছে বলে অনুসিদ্ধান্ত দিয়ে অন্য ধর্ষকদের উৎসাহিত করে। “পুরুষ মানুষের কলংক হয়না; কলংক কেবল নারীর ” এই আদিম ন্যারেটিভটি সমাজের শেকড়ে প্রোথিত হয়েছে। এই কথিত “সম্মানহানি” ও “কলংকে”-র ভয়ে সমাজের নানা পর্যায়ে নারী মুখ বুঁজে সহ্য করতে থাকে নানারকম শারীরিক নির্যাতন। বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার পুরুষ সমাজের মধ্যে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, নারীকে কোথাও একা পেলেই তার শরীরে হাত দেয়া যায় কিংবা ধর্ষণ করা যায়। ফলে প্রতিদিনই ধর্ষণের খবর আসতে থাকে। গৃহে নৈতিকতা শিক্ষা দিতে আসা মোল্লা-পুরুত, গান শেখাতে আসা গানের মাস্টার, রাস্তার বখাটে, এলাকার প্রভাবশালী লোক বা তার বখাটে ছেলে, বাজারের বা বাস-ট্রেনের ভীড়ে অপরিচিত পুরুষের লোমশ হাত , শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে সতীর্থ বা শিক্ষক; অফিসের সহকর্মী কিংবা বস; এই সমস্ত যৌন রাক্ষস নারীর দিকে লোলুপ চোখে তাকায়, লালসার লালামাখা হাতে নারীর শরীর স্পর্শ করে কিংবা ধর্ষণ করে। পরিস্থিতিটা এমনই ভয়াবহ; অথচ নারীর জন্য প্রতিকূল এই পরিবেশ পরিবর্তনে রাষ্ট্র-সমাজ কারোরই কোন আগ্রহ চোখে পড়ে না। রাষ্ট্র ও সমাজের মনে লিঙ্গগর্বের আদিমতা বিরাজ করায়; নারীকে জোর করে “ভোগ” করার ঐতিহ্যটিকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় পুরুষতান্ত্রিক লিবিডোতাড়িত বিকৃতিকে প্রতিদিন প্রশ্রয় দিতে। এই বাস্তবতায় কেবল একটি দুটি ধর্ষণের ঘটনা জনমতের চাপে ন্যায়বিচারের মুখ দেখলেও সংকটের সমাধান সুদূর পরাহত। কারণ চয়িত বা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার সামগ্রিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারেনা। ধর্ষণের যে সমস্ত অভিযোগ লিপিবদ্ধ হয়েছে; সরকার ও বিচার বিভাগ সবগুলো অভিযোগের তদন্ত ও ন্যায়বিচার প্রদানে এখনই সক্রিয় না হলে; যে কন্যাশিশুরা বেড়ে উঠছে তাদের আজ ও আগামীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। আর সমাজ যদি দ্রুততার সঙ্গে ” “পুরুষ মানুষের কলংক হয়না; কলংক কেবল নারীর ” ; এই অন্ধকার চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ না নেয়; যে কোন ধর্ষণের ঘটনায় “মেয়েটিরই” চরিত্র খারাপ বলে ধর্ষণের সক্রিয় সমর্থক ও উৎসাহদাতা হওয়া বন্ধ না করে; এই আদিম ধর্ষণ বান্ধব পরিবেশে আজ যিনি ধর্ষিতা মেয়েটির চরিত্র খারাপ বলে সনদ দিচ্ছে; কাল তার নিজের পরিবারের মেয়েটিই ধর্ষণের শিকার হবে। অপরিনামদর্শী সমাজের সংকট হচ্ছে যতক্ষণ পর্যন্ত একটি সমস্যা নিজের গৃহে প্রবেশ না করছে; ততক্ষণ পর্যন্ত সমস্যাকে আমল দেয়না কেউ; বরং বিপদগ্রস্ত পরিবার নিয়ে অযাচিত পরচর্চা্র ক্ষণিকের বিনোদন খুঁজে সমস্যাকে আরো ঘনীভুত করে বোধ-বিবেচনাহীন এই সংখ্যা গরিষ্ঠ।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com