পিরিয়ড ও সমাজ

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বচ্চন গিরি

এইযে ধরো পথ হাঁটছি, এই পথ চলাটা খুব সোজা নয়| সমাজের স্তরগুলো এবড়ো খেবড়ো পাথরে ভর্তি| প্রায় প্রতিদিনই চলার পথে আমরা বারবার হোঁচট খাই| কেউ পড়ে যাই, কেউ উঠে দাঁড়াই| এটাই সমাজের স্বাভাবিক নিয়ম….|

পিরিয়ড মহিলাদের এক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া| মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে শরীর থেকে রক্তরস বেরোয়| এই সমাজ পিরিয়ড হওয়াকে অপবিত্র ভাবে| পিরিয়ডের সময় মহিলারা দেবতার গৃহে উঠতে পারেননা, পিরিয়ডের সময় নারীরা নাকি ছোঁয়াচে হয়, পিরিয়ড মানে ছ্যেঁ ছ্যেঁ মনোভাব পুরুষদের মধ্যে| কিন্তু কেন হবে এমন? কোন শাস্ত্রে লেখা আছে পিরিয়ড হওয়া মানে অপবিত্র? যদি কোনও শাস্ত্রে এটা লেখা থাকে তাহলে আমি প্রকাশ্যে ঘোষণা করছি সেই শাস্ত্র আমি মানিনা| পিরিয়ডের সময় তলপেটে অসহ্য যন্ত্রনা হয় শুনেছি| সেই যন্ত্রনার ভাগ কজন নেয়? কেউনা……
কয়েকদিন ধরে পিরিয়ড নিয়ে বিভিন্ন পেজ ট্রল করছে দেখলাম, অ্যাসিড আক্রান্ত এক মহিলাকে নিয়ে ট্রল করছে নজরে পড়লো, স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়েও ট্রল করে খিল্লি ওড়াচ্ছে পেজগুলো| সেইসব ট্রল পেজের মালিকদের বলছি ‘আপনাদের বাড়ির মহিলাদের পিরিয়ড হয়না?’ খুব ভুল যদি না বলি তাহলে অবশ্যই আপনাদের বাড়ির মহিলাদেরও পিরিয়ড হয়| আমার মা, বোনেরও পিরিয়ড হয়|’ এঁরা কেউ অপবিত্র নয়…..
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নারীদের এই পিরিয়ড হয় বলেই পৃথিবীতে এখনো প্রাণের অস্তিত্ব আছে| তবু প্রত্যেকটি নারীকেই প্রতিনিয়ত কটুক্তি শুনতে হয়| এক্ষেত্রে অবশ্য দোষ মহিলাদেরও কোনও অংশে কম নয়| সদ্য ঋতুমতী হওয়া মেয়েকে তারই মা, ঠাকুমা, কাকিমা বা দিদি শেখায় সে এখন বড় হয়েছে| এখন কিছুদিন তার ঠাকুরঘরে যাওয়া বন্ধ| মহিলারাই বদ্ধ রাখেন নিজেদের এটা খুব সত্যি কথা| জানি ঝাঁটা-জুতো নিয়ে রে রে করে তেড়ে আসবেন তবু বলি, ‘কেন আপনারা সমাজের এই চিরন্তন বন্ধনটার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন না? কেন আপনারা চুপচাপ মেনে নেন ‘অপবিত্র’, ‘ছোঁয়াচে’ শব্দগুলো?

একজন অ্যাসিড আক্রান্ত মানুষই জানে তার যন্ত্রনার কথা| দিনের পর দিন সমাজের নানান কটুক্তি শুনতে শুনতে একসময় মৃত্যুর বিরুদ্ধে জারি থাকা যুদ্ধটা থেমে যায়….
ধরেই নিলাম বাসররাতে লাইট নেভানোর পর ক্যাটরিনার সঙ্গে অ্যাসিড আক্রান্ত জনৈক মহিলার কোনও তফাৎ খুঁজে পাননা কেউ কেউ| কিন্তু ভাবুনতো যদি ওই জনৈক মহিলার জায়গায় আমার বা আপনার বোন বা দিদি থাকতো তখনও কি ঠিক একই কমেন্ট বজায় থাকতো? আচ্ছা কোন মহাপুরুষ আছেন দেখি একবার বলুনতো নিজের ধর্মের নামে শপথ করে যিনি ‘বাথরুম’ নামের আড়ালে অন্য কিছু করেননা? কোন মহাপুরুষ আছেন নামটা শুধু জানতে চাই| জানি শুনতে খুব খারাপ লাগবে, তবু সত্যি কথা তেঁতোই হয়|

অন্য লোককে ‘খানকির ছেলে’ বলার আগে নিজেকে দিয়ে প্রশ্ন করুন তো আপনি কতোটা সৎ? আপনাকে যদি কেউ ‘খা…..ন….কি…..র…..ছে…..লে’ বলে গালাগালি দেয়, আপনার কেমন পিছনটা ফেটে জ্বলবে?
মহিলাদের ব্রায়ের স্ট্রিপ দেখা গেলে সেটা নিয়েও খিল্লি হয়| কিন্তু কেন হবে? অন্যের বোন,মা কে নিয়ে খিল্লি করতে বেশ মজা লাগে| অথচ নিজের মা, বোনের সম্পর্কে কিছু বলতে শুনলেই আপনাদের নিম্নাংশ মাথার তালুতে উঠে যায়| কেন?

গালাগালি দেবেন? যতো ইচ্ছে দিন, প্রাণভরে গালাগালি দিন| আপনাদের গালাগালিতে আমার মা ‘খানকি’ হয়ে যাবেনা| তাই গালাগালি দিলে আমার কাঁচকলা| শুধু গালাগালি দেওয়ার আগে অন্ততঃ একবার ভেবে দেখুন ওই মহিলা যদি আপনার মা অথবা বোন হতো? তখন আপনি ‘অপবিত্র’, ‘খানকি’, ‘বাসররাতের ক্যাটরিনা’ হিসেবেই শব্দগুলো প্রয়োগ করতে পারতেন তো?

ছবি: অনিরুদ্ধ দাস

 

 

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com