পারা আর না পারায় যোজন যোজন দূর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

কনকচাঁপা

আমি আজ আমার বাবার কথা বলি।বাবা আমার জাত শিল্পী ছিলেন।জন্মগত ভাবেই তিনি গান গাওয়া,ছবি আঁকা কবিতা লেখা,সেলাই করা, কাঠের কাজ করা ইট সিমেন্ট এর কাজ,ঘর বাঁধা সব কাজে তিনি এমন সিদ্ধহস্ত ছিলেন, কেউ দেখলে বুঝতেই পারবেনা এটা ননপ্রফেশনাল কারো কাজ!! কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর, সুন্দর না,অদ্ভুত রকমের সুন্দর ছিল তাঁর হাতের লেখা।এবং তার চাইতে সুন্দর ছিল তার ব্যবহার। সুখে দুখে মুখে হাসি তার লেগেই থাকতো।এবং বিহেইভ ইয়োরসেলফ শব্দটি আব্বা পরিপূর্ণ ভাবে ব্যবহার করতেন।এই আশি বছরের জীবনে তিনি কখনওই কারো সঙ্গে ভুল ব্যবহার করেননি।রিকশাচালকদের আপনি করে ডাকলে কেউ অবাক হলে বলতেন উনি যে-ই হোন না কেন আমি তো আমি! যা বলছিলাম।বাবা প্রথমে ছোটখাটো চাকরীতেই ঢুকেছিলেন ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড এ।পরে চাকুরীরত অবস্থায় পড়াশোনা শেষ করে প্রমোশন নিয়ে ওয়াপদার ফিন্যন্স মেম্বার সাহেবের পিএ হন এবং

বাবা-মা

ডেপুটি ডিরেক্টর হয়ে রিটায়ার করেন।আব্বার কোন ভাইবোন ছিল না কিন্তু সবসময় আব্বার কাজিনরা এক একজন আমাদের বাসায় থেকে পড়াশোনা করে চাকরী নিয়ে চলে গেলে আর একজন আসতো। আমরা চারভাইবোন,দাদীমা আছেন।একজন মানুষের সৎ বেতনে কখনওই এতো গুলো মানুষ স্বচ্ছল ভাবে চলা যায়না।আমার মা সারাজীবন নুন তেল শাড়ি জামা মেহমান সব হিসেব করেই সংসার চালাতেন।

এভাবে করে আব্বা আম্মা কখনওই দুঃখী ছিলেন না, অভাবী ও না।কিন্তু মনের কিছু ইচ্ছে সব সময়ই গলা টিপে মারতে হয়েছে।তার উপর আমাকে গান শেখানোর এবং এখানে ওখানে প্রতিযোগিতার যাতায়াত বাবদ খরচ এ আম্মা আসলে হিমসিম খেতেন।তবুও তিনি শক্ত হাতেই সংসার,সততা,ধৈর্য সব ব্যালেন্স করেছেন।আমাদের পিঠাপিঠি চার ভাইবোনের ষোলো বছর পর আমাদের আর একটি ভাই হয়।তাকে আব্বা খুবই আদর করতেন।তাকে হয়তো আমরা দিলেও আব্বার খুব ইচ্ছে করতো ভালো খেলনা কিনে দেয়ার।আব্বার অফিসে একজন খুব বড় কন্সট্রাকশন ফার্মের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন জনাব ওয়াহিদুন নবী,যিনি আব্বাকে খুব ভালোবাসতেন।মনু ব্যরেজ, তিস্তা ব্যরেজ এগুলো তার ফার্মের কাজ। তিনি কোটি কোটি টাকার কাজের অর্ডার নিয়ে যেতেন,কাজ বুঝিয়ে দিতেন।তিনি আব্বাকে বলতেন মোর্শেদ সাহেব আপনি বিল আটকে দিলেই কিন্তু আপনাকে বড় অংকের টাকা দেবো।আব্বা নাকি হেসে বলতেন ঠিক আছে নবী ভাই,আমাকে চা আর মধুবনের সিংগারা খাওয়ান।নবী আংকেল বলতেন ভাই,এটাও কিন্তু ঘুষ! আব্বা বলতেন আপনি আনেন,আমি বিল দেবো।এভাবে হেসে সব উড়িয়ে দিতেন।হাতের কাছে ভরা কলস,তৃষ্ণা কি মেটানো যায় যেনতেন পানিতে? তো আব্বা একদিন অফিস থেকে ফিরতে কাছে ধারের একটা খেলনার দোকানে একটা রেলগাড়ি দেখছিলেন।হঠাৎ নবী আংকেল ও দোকানে ঢুকে অবাক! মোর্শেদ সাহেব,আপনি খেলনার দোকানে? সলজ্জ্ব আব্বা বললেন আমার ছোট ভাইটির কথা।

বাবার সঙ্গে কনক চাঁপা

নবী আংকেল কিছু বললেন না।আব্বাও যথারীতি দামের সংকুলান না হওয়াতে বাড়ি চলে গেলেন।কদিন পর নবী আংকেল ওই রেলগাড়ি টি বাসায় পাঠালেন।আম্মা বললেন হঠাৎ!!! আব্বা আবারো লজ্জা পেয়ে সব ঘটনা বললেন।আব্বা খেলনা নেড়েচেড়ে দেখেন।আম্মা চুপচাপ। ঝড়ের আভাস।একসময় আম্মা বললেন এই খেলনা ফেরত দিয়ে এসো। সারাজীবন সৎ থেকে শেষ বয়সে ঘরের পৈঠায় আছাড় খাওয়া যাবেনা।আব্বা খেলনাটি ফেরত দিলেন।এবং সোৎসাহে কাঠ দিয়ে পুরো রেলগাড়ি, গোল ইয়াবড় রেললাইন, বগী এবং হুইসেল মোদ্দাকথা আস্ত একটি রেলস্টেশন সহ রেলগাড়ি বানিয়ে ফেললেন।আমরা দেখলাম, চেয়ে চেয়ে বিস্ময়ে,আপাতদর্শন পরাজিত মানুষের সত্যিকার জীবন, অভাববোধ,রিপু,আকাঙ্ক্ষা কে দুর্দমনীয় মানসিক শক্তি দিয়ে জয়ী হওয়ার সত্যিকার গল্প।দেখলাম,অনুভব করলাম,অনুধাবন করলাম,বিস্মিত হলাম,গর্বিত হলাম। হে সততার পরাকাষ্ঠা আমার মা-জননী এবং পিতা— তোমাদের জন্য, তোমাদের এই জীবনচারণ এ আমি, আমরা ভাইবোনেরা,আত্মিয়স্বজন রা ধন্য।গর্বিত।

ছবি: লেখক সৌজন্যে

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com