পাঠকের হৃদয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

কনকচাঁপা ছোট বেলা থেকেই আমার বইয়ের নেশা। যে কোন কিছু, তা হোক কাগজের ঠোঙ্গা, আমি পড়তেই থাকি, পড়তেই থাকি। পড়ার বই পড়ি। পেপার পড়ি। গল্পছড়া পড়ি। মাঝেমধ্যে আম্মার পড়ার বইয়ে হাত দেই। বড় বোনের ইস্কুলের বইয়েও হাত দেই। এভাবেই চলতে থাকলো। নিজের বইয়ের সারা বছরের পড়া দুই মাসের মধ্যেই শেষ হয়। আম্মা বোধহয় চিন্তায়ই পড়লেন। আম্মা টুকটাক বই জোগাড় করে দিতেন কিন্তু হয়তো খেই খুঁজে পেতেন না যে তাঁর মেয়েকে এর পর কি বই হাতে ধরিয়ে দেবেন। এভাবেই দিন কাটতে লাগলো। তখন আমি ক্লাস সিক্স এ পড়ি। গরমের ছুটিতে বাড়ির কাজ শেষ করে ফেলেছি। শুয়ে বসে আছি। আম্মা আমাকে একটি বই দিয়ে বললেন, পড়ো। আমি উঠে বসলাম। হাতে নেড়েচেড়ে দেখলাম। কি সুন্দর বইটি। the world of foam, ফেনার রাজ্য। লেখক রাশিয়ান, ইভান ইয়েফ্রেমভ। একজন শিল্পীর ভ্রমন কাহিনী। কি দারুণ লেখা, কি শব্দগাঁথুনী। কি অপরূপ এগিয়ে যাওয়া।

ইভান ইয়েফ্রেমভ

আমি এর ভেতরে এগিয়ে গেলাম। ডুবে গেলাম, ভেসে উঠলাম, নিমজ্জিত হলাম, থমকে গেলাম। পড়তে পড়তেই আম্মার দিকে তাকাই, বিস্মিত হই, আম্মা, আমার মা এ বই পড়েছেন! কবে এমন বই সংগ্রহ করলেন। আমি পড়ার শুরুতেই আম্মার উপর কৃতজ্ঞ হয়ে গেলাম। গল্পের নায়ক (গ্রীক ইতিহাসের ক্লাসিকাল যুগের ও আগেকার মানুষ, তখনকার এ গল্প) পান্দিওন,উত্তর গ্রীসের দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্তের একটি দেশ এনিয়াদার অধিবাসী। তার বাবা মা নেই। দাদুর কাছে সে বড় হচ্ছে।দাদু শক্তিমান যোদ্ধা ছিলেন।তিনি চান নাতীও তার মত শক্তিধর হোক।কিন্তু পান্দিওন হতে চায় শিল্পী। পান্দিওন লুকিয়ে লুকিয়ে এনিয়াদার সবচেয়ে বড় ভাস্কর আগেনরের কাছে শিল্প খোদাই শেখে।সে আগেনরের মেয়ে তেসসার প্রেমে পড়ে বসে আছে।দাদু তার নাতীকে বর্শা ছোড়া থেকে শুরু করে সব রকম শারীরিক কসরত শিখিয়ে দিয়ে তার মেয়েদের কাছে চলে যান।পান্দিওন একলা হয়ে পড়ে।আগেনর চান পান্দিওন তার মেয়েকে বিয়ে করে এনিয়াদায় থেকে যাক।কিন্তু পান্দিওন চায় সারা দুনিয়া দেখে তার শিল্পিত মনকে সম্বৃদ্ধ করতে।সে উত্তর গ্রীস থেকে আইগিপতস বা ইজিপ্ট হয়ে সাগর পথে মিকেনীয়র পুর্বে ওইকুমেনার এ গিয়ে পৌঁছায়। এবং কুয়াশাদ্বার বা জিব্রালটার প্রণালী র কাছে গিয়ে আফ্রিকান এট্রাস্কান দের হাতে ধরা পড়ে। এবং দাসত্ব স্বীকার করে।গল্প কিন্তু খৃষ্টপূর্বাব্দের!!! যাইহোক সেখানে পান্দিওন নিদারুণ বন্দীত্ব বরণ করে এবং ভয়ংকর ভাবে নির্যাতিত হতে থাকে।তবুও সে তার শিল্পীরর চোখ বন্ধ করেনা।

তাঁদের মুলত রাজমিস্ত্রির মত বা দিনমজুর এর মত নানা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয় খোদাই, পাথর কাটার কাজ করার জন্য।অত্যাচারিত হতে হতেও সে আরো শিল্পিত হতে থাকে।জেলখানাতেই তার দুটি বন্ধী কিদগো আর কাভির সঙ্গে দারুণ বন্ধুত্ব হয়।এবং তিন বন্ধু মিলেই তারা একসময় পালায় এবং বাকিটাই চমকপ্রদ গল্প।একজন সত্যিকার শিল্পী যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন তৃষিত স্পঞ্জের মত সে শিল্প শুষে নেবেই। যত কষ্টই হোক না কেন শিল্পীর এই কষ্টই তার আসল জীবন,বরঞ্চ আরাম আয়েশেই একজন শিল্পীর মননে মেদ জমবে।সারা দুনিয়া ঘুরে ভিন্নতর মানুষ দের বন্ধু হিসেবে পেয়ে বারবার প্রেমে পড়ে সে তার বন্ধু কিদগোকে একটি অত্যাশ্চর্য নিলাভ সবুজ পান্নায় তিন বন্ধুর বন্ধুত্ব সম্বলিত ক্যমিও খোদাই করে দেয় যা একটি ঐতিহাসিক ধাঁধার মত হয়ে যায়।লেলিনগ্রাদ এর হার্মিটাজ মিউজিয়াম এর দর্শক রা কখনওই এই ক্যমিওর ইতিহাস বা রহস্য উদঘাটন করতে পারেনা।কারণ তিন বন্ধু তিন রকম দেহভঙ্গি তিন রকম অস্ত্র হাতে কিন্তু অপূর্ব এক মায়াময় ভালোবাসায় জড়াজড়ি করে দাঁড়ানো।( হার্মিটাজ মিউজিয়াম এ আসলে এমন ক্যমিও কিন্তু নেই) আমার মানসিক শক্তির মূলমন্ত্র বাবা মায়ের শিখিয়ে দেয়া শিক্ষা এবং এই পান্দিওনের কষ্টকর শিল্পিত জীবন এবং অনুসন্ধিৎসু মন! আমি বিশ্বাস করি আরামে আয়েশে শিল্পী হওয়া খুব বিরল। শিল্পী হতে গেলে কষ্ট করেই একটা পুড়ে পুড়ে খাঁটি সোনা হওয়ার প্রক্রিয়ায় যেতে হয়।আমি সেই পথে হাঁটতে রাজী হয়েছি জীবনের শুরুতেও শুধু এই বই পড়ে।এই বই থেকে আমি আমার জীবনের ‘পকড়’ একে ফেলেছি।পকড় মানে একটি রাগের মেরুদণ্ড। জীবনে অনেক বই পড়েছি।পাঠকের মন বদল হয় জানি।আমারো মন বদল হয়।একটা বই পড়ে তখন যেমন কাঁদতাম এখন হয়ত কান্না আসা দুরের কথা মনে হল যে, আল্লাহ! তখন কেন কেঁদেছিলাম,তখন আমি কতই না অবুঝ ছিলাম! কোন বই হয়তো দুইবার পড়েই আর ভালো লাগেনা কোন বই হয়তো অর্ধেক পড়েই আর ভালো লাগেনা কিন্তু এই বইটা! কতবার যে পড়েছি তার ইয়ত্তা নেই।এবং বইটা এতো পুরাতন হয়ে গেছে যে ধরলেই তা চুরচুর হয়ে ভেংগে পড়ার ভয়।শুধু চেয়ে চেয়ে দেখি আর মুছে মুছে রাখি। এই বইয়ের ব্যপারে এমন অন্ধ ভালবাসার কথা শুনে আমার অনলাইন ছাত্র আমার সন্তানসম মাইদুল ইসলাম শাকিল আমাকে এই বইটি উপহার দিয়েছে।আসল বইয়ের শেষ দুটি পাতায় পান্দিওনের দেশে ফেরার গল্প ছিল।তা কখনওই পড়তে পারিনি কারন পাতা দুটি ছিল না।সাঁইত্রিশ বছর পর নতুন বইয়ে পান্দিওনের ঘরে ফেরা ও তেসসার সাথে বিয়ে হওয়া শুনে আমার এতদিনের ভাললাগা পান্দিওনের প্রতি ভালবাসা চুরচুর করে ভেঙ্গে পড়লো। এতো দিনের ভাবনা জলীয় হয়ে গেলো কারন আমি আসলে গল্পের সাথে গল্পের মিলন, বিরহ, ইতিহাস, শিক্ষার সাথে জড়িয়ে পান্দিওনের প্রেমেই পড়ে গিয়েছিলাম এবং পান্দিওনের বিরহের ও প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম।বিরহ যখন মিলনে পর্যবসিত হল তখন পান্দিওন আর তেসসার উপর থেকে সব অনুরাগ উবে গেল!!! হায়রে পাঠক! হায়রে পাথকের মন!

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com