পশ্চিমবঙ্গের রঙ্গ-মঞ্চঃ একটি সাম্প্রতিক ইস্তেহার

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঋক অমৃত

অশ্বত্থামা -the war machine নাটকের একটি দৃশ্য

প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটা পদ্ধতি আমরা ডারউইন স্যর এর কাছ থেকে জানতে পেরেছি। বয়েল ও চার্লসের মিলিত সূত্র থেকে তাপ ও চাপের সম্পর্কটাও বেশ পরিস্কার। এখন প্রাকৃতিক নির্বাচন, অন্ধকার দুনিয়ার চাপ এবং কোল গেট বা সারদা-র কোলের উত্তাপ সমাজকে নতুন কোন ইভোলিউসন বা রিভোলিউসনের দিকে ঠেলবে সে বেশ চিন্তার বিষয়। যেভাবেই হোক, এই চা পান বিরতিতে সমাজের বিকাশ তো থেমে নেই। তাই নিজেকে প্রকাশ করবার তাগিদ থেকে জন্ম এরকম কিছু নমুনা তথা স্যাম্পেল এই ৭০মিমির যুগে, মাইনোরিটির প্রতি সরকারের হৃদ্যতা দেখে নাটকে নামছেন দিয়ে আর উঠতে পারছেন না। ‘পৃথিবীটাই তো একটা স্টেজ রে বাবা। তাই আর সারা পৃথিবী না করে পৃথিবীর সারমর্ম এই স্টেজটুকুই করতে এলুম’, এই হল তাদের ম্যানিফেস্টো। হ্যাঁ এই অধমও সেই গোষ্ঠীরই একজন (আজকাল আবার গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এতই প্রচলিত যে পিএনপিসিটুকু হার মেনে যাচ্ছে। তাই খুব সচেতন ভাবে গোষ্ঠী শব্দটাই ব্যবহার করলাম)।
যে ভাবেই বলুন না কেন আসল ব্যাপারটা হল এই। দর্শনশাস্ত্রের টেস্টপেপারে আর নতুন কোনো সাজেশন পাবেন না। এই গোষ্ঠীর চাহিদা খুবই কম, তাগিদ কিন্তু ততটাই বেশি। এরা গরুও খায়, এরা শুয়োরও খায়। তাই আগে থেকেই গরু এবং শুয়োরদের সাবধান করি। পিথোক্যান্‌থ্রোপাস বা নিয়ান্ডারথালের সূত্র ধরে এগোতে থাকলে কিন্তু এই গোষ্ঠী আপনার নজর এড়িয়ে যাবে। এরা আসলে হোমো সেপিয়েন্স সেপিয়েন্স-এরই এক সমান্তরাল  উপজাতি। অ্যান্টিপিপল্‌। সাধারণ সভ্যতার ইতিহাসে এরা মেলেনা। এদের বাপ মা অ্যাডাম ও ইভ নন। এরা জন্মের পর মা শব্দটাও প্রথম বলেন না। এদের অ আ ক খ যথাক্রমে ইস্কাইলাস,সোফোক্লেস,ভরত, অ্যারিস্টটল্‌ । এরা জামা প্যান্টের বদলে বোঝেন কস্টিউম। সূর্যের বদলে বোঝেন লাইট। এক কথায় এদের আপামর নাটুয়া বলে থাকেন। যদি কোনোদিন গালিভারের মতনই দেশ ঘোরার উপক্রম করেন তাহলে এই প্রজাতির দর্শন করতে ভুলবেন না।

তা হঠাৎ করে এই কথা তুলতে গেলাম কেন? না আমাদেরও কিছু কথা আছে। তোমাদের বলার। সেই কথাগুলো তলিয়ে যাওয়ার আগে একবার ঝালিয়ে নেওয়া ভালো বলে মনে হচ্ছে। আসলে পৃথিবী জন্মের পর প্রায় ৪বিলিয়ন বছর কেটে গেছে। মহাকাশ সেই হিসেবে আরও পুরোনো। তার আকার কিন্তু এখনো বেড়েই চলেছে নাকি বেড়েই চলেছে। কিন্তু আমাদের জাস্ট আগের প্রজন্মের মনটা না কিছুতেই আর বাড়ছে না। হরেক রকমের ডাক্তার বদ্যি দেখানোর পরে, গ্রাণ্ট ওষুধ খাওয়ানোর পরেও এই অসুখ সারছে না। না তাদের দ্বারা কিছু হচ্ছে, না তাদের দিয়ে কিছু। অথচ এই হুটোপাটির পালা পরিবর্তনে তারা এই কথাটাই ভুলতে বসেছেন যে পরিবর্তনের থেকে স্থায়ী আর কিছুই নয়। অবশ্য এই অসুখ আজকের নয়। রোগের কারণ খুঁজতে গেলে সেই আশি নব্বই এর দশকে গিয়ে পৌঁছাতে হয়। যেখানে আদর্শের বাড়া ভাতে বক্সঅফিস মই দিয়ে তৎকালীন সো কলড শিল্পীরা চু কিতকিত খেলার চেষ্টা করেছেন। সেই ঘটনা পরম্পরায় মাঝে এমন একটা সময় এসেছিল যেখানে আবার একটা প্লাবন এসে সেই সব হতাশাকে দূর করে দিয়েছিল। দুঃখের বিষয় যাদের হাত ধরে সেই বিপ্লব, আজ সেই সব প্রিয় মস্তিষ্কে একটা মানসিক শৈথিল্য, একটা বিপন্ন উদাসীনতা ও আবারও সেই নৈরাজ্যের হতাশা দেখতে পাচ্ছি। যেখান থেকে তারা আক্ষরিক অর্থেই প্রসব করছেন, আর সেই সব অযোগ্য  মধ্যমেধার সন্তানেরা সৎ শিল্পীর আগমনের পথকে আরও দুর্গম আরও বন্ধুর করছেন। বিশ্বাস না হয় তাদের তো অনুরোধ করি একবার আয়নায় মুখ দেখুন। আশা করি আপনাদের আয়নাও আপনাদের ক্রন্দনরত মুখ দেখে হাসবে না।

অশ্বত্থামা -the war machine নাটকে অশ্বত্থামার চরিত্রে লেখক

অনেক পর্যবেক্ষণের পর বুঝেছি যে সত্যিই ‘চেঁচিয়ে কোনো লাভ নেই’। সত্যি করেই নেতৃত্বের একটা অভাব ঘটেছে।  একটা অন্য ধরনের প্রচেষ্টা আমারই কিছু দাদার মত বন্ধুদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু সেসব কাজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলে, ভালো কাজ কিন্তু সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাতেও পারবে না।  আর ভালো কাজ করার পরেও আগের এই পচে যাওয়া প্রজন্মের থেকে আখের গোছানোর অসৎ উদ্দেশ্যকে জলাঞ্জলি না দিলে ঠিকঠাক বোধনের আগেই কিন্তু একটা ঠিকঠাক বিসর্জন হয়ে যাবে। মুখে বড় বড় বুলি কপচিয়ে একটা মিথ্যা যাপন কিন্তু আমাদের কোত্থাও পৌঁছে দিতে পারবে না। কাল নিজের নিয়মেই বদলাচ্ছে। তাকে অনুধাবন করো। গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন কোনোদিন গড়েই ওঠেনি আর উঠবে বলে মনেও হয় না। নিজের হাল নিজেই বও। নিজের দর্শক নিজেরা তৈরী করো। আগের প্রজন্ম নিজের যশ খ্যাতি হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে নিজেদের নির্লজ্জ মেকিপনায় অনবরত নিজেদের ছোটো আমির প্রকাশ ঘটিয়েই চলেছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটাবে। তাদের হাততালি আমাদের পথ একটুও প্রশস্ত করতে পারে বলে বিশ্বাস রাখি না। পরনির্ভরশীল আত্মবিশ্বাস নিয়ে পথ চলার থেকে রাস্তার ফুটপাথে গুমটি খোলা অনেক ভালো। ইতিহাসের গতি এতে পাল্টাবে না। নিজেদের মধ্যে বাইরের বন্ধুত্ব আর ভিতরের ভয় শেষমেশ কিন্তু নিজেদেরই দূরের দৃষ্টিকে ডাবল ভিসন করে ছেড়ে দেবে। আর হ্যাঁ অবশ্যই খেয়াল থাকে যেন ‘যে মানুষ একজন অন্য মানুষের থেকে নিঃশব্দে সরে যায়, পারমাণবিক শক্তির বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার তার নেই’। একটা উদ্দেশ্যময় জীবন সময়ের সেই বৃহৎ দেয়াল, যা কোনো বিজ্ঞাপিত সিমেণ্ট দিয়ে গড়ে ওঠেনি, সেখানে একটা ছোট্ট আঁচড় কাটতে সাহায্য করবেই করবে।

         আমার কর্মক্ষেত্র সত্যিই দিন দিন ইতরের কর্মসংস্থান হয়ে উঠছে। কিন্তু নিজের কাজের স্থলকে ন্যাংটো করে দেখানো উচিত নয় বলে মনে করি। প্রকৃত শিল্পীর কাজ আশা করি তা হতে পারে না। তাই অনেক সমস্যা যা সব্বাই জানে, আর এখানে তুলে এনে ঘোলা জলকে আরও ঘোলা করার ইচ্ছেকে দমন করলাম। গ্রান্টের টাকায় বাজারে শপিং না করেও যে থিয়েটার গড়ে তোলা যায় সেইটুকু অন্তত উদ্দেশ্য হোক। কেবল নাটক ও থিয়েটারের মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। পাকে পড়ে অনেক কাদা হাতে মাখতে হয় জানি, কিন্তু তা থেকে যেন পদ্মই উঠে আসে। কেবল কোলকাতা বা মফস্বল নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গের থিয়েটার- মজদুর এক হউক।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com