পরীক্ষাভীতি ! কি করবেন…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল

পরীক্ষা শব্দটি শুনলেই অনেক ছাত্রছাত্রীর বুক ধড়ফড় করে, মুখ শুকিয়ে যায়; মাথায় ভর করে একরাশ দুশ্চিন্তা। পরীক্ষার সাথে এই অস্বস্তিকর আবেগীয় অবস্থার উপস্থিতিকে পরীক্ষাভীতি বলে। এই ভীতি সবার হয় না, তবে বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রীর হয়। একটা কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে এমন বোধ থেকে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। পরীক্ষাভীতি থেকে শারীরিক কিছু উপসর্গও প্রকাশ পায়, যা একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত জীবনকে ব্যাহত করে।
পরীক্ষাভীতি কি অহেতুক কোনো ভীতি?
এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। কোনো বস্তু বা অবস্থা সম্পর্কে মাত্রাতিরিক্ত ভয়কে অহেতুক ভীতি বলে। পরীক্ষা এমন এক পরিস্থিতি, যা অনেকের মধ্যেই মাত্রাতিরিক্ত উদ্বেগ সৃষ্টি করে। পরীক্ষা মানেই কারো কাছে ভিন্ন এক জগতে অনুপ্রবেশ, যে জগৎ সম্পর্কে আগে থেকে কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। ফলে মনের ওপর সৃষ্টি হয় ভীষণ চাপ। পরীক্ষার প্রধান ভার বইতে হয় মগজকে, ফলে আরো কিছু উপসর্গের সৃষ্টি হয়। মানুষ অনেক সময় অনেক ভীতিকর বস্তু বা অবস্থাকে এড়িয়ে চলতে পারে। কিন্তু পরীক্ষা এমন এক অবস্থা, যাকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই; তার মুখোমুখি হতে হবে। সুতরাং পরীক্ষাকে অহেতুক ভীতি না ভেবে কাক্সিক্ষত অবস্থা ভাবাই ভালো এবং সেভাবেই তার মোকাবেলা করা ভালো। পরীক্ষাভীতি আসলে এক ধরনের উৎকণ্ঠা, যে যত সহজে এটাকে গ্রহণ করবে, তার জন্য তত মঙ্গল।

পরীক্ষাভীতির লক্ষণ
আগেই বলা হয়েছে, পরীক্ষাভীতি এক ধরনের উৎকণ্ঠা বা উদ্বেগ। এ সময় অনেকেই খাওয়া-নাওয়া ভুলে যায়। ঘুমেরও অসুবিধা হয়। এ সময়ে সাধারণত যেসব লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দেয় তা হলো-
– অস্থিরতা
– ক্লান্তি ও দুর্বলতা
– অনিদ্রা
– হাত-পা অতিরিক্ত ঘামা ও কাঁপা
– বুক ধড়ফড় করা
– মুখ ও গলা শুকিয়ে যাওয়া
– মেজাজ খারাপ হওয়া
– জানা জিনিস ভুলে যাওয়া
– শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট
– বমি বমি ভাব
– ঘন ঘন প্রস্রাব
– ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা ইত্যাদি।

কী করণীয়
পরীক্ষা বিষয়টিকে সহজ স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। নিজের আকাক্সক্ষা কমাতে হবে। মূলত আকাক্সক্ষার কারণে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। আকাক্সক্ষা কমলে চাপও কমবে, এতে পরীক্ষাভীতিও কমে যাবে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা মানসিক চাপমুক্ত পরীক্ষা দিয়েছেন, তাদের পরীক্ষার ফলও ভালো হয়েছে। পরীক্ষাভীতি কাটানোর ভালো উপায় হলো আগে থেকেই নিয়মমাফিক পড়া। যদি বছরের শুরু থেকেই একটা নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী সঠিকভাবে পড়ালেখা করা যায়, তাহলে পরবর্তীকালে পরীক্ষাভীতি থাকে না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কিংবা সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত পড়ালেখার প্রয়োজন নেই। পড়ালেখার জন্য দৈনিক ছয় থেকে আট ঘণ্টা সময় যথেষ্ট। এ সময়টুকু একটানা পড়তে হবে এমন কথা নেই। সময়টাকে ভাগ করে নিতে হবে। সকালে এতটুকু, সন্ধ্যায় এতটুকু…। এভাবে ভাগ করে পড়লে পড়া ভালো হবে, পরীক্ষার সময় তাড়াহুড়োর প্রয়োজন হবে না এবং এর ফলে পরীক্ষাভীতিও থাকবে না।
পরীক্ষার সময় খাওয়াদাওয়া
পুষ্টিকর খাবার শরীরে শক্তি জোগায় ও অমনোযোগী হতে বাধা দেয়। তাই সব সময় পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। অনেক ছাত্রছাত্রীকে দেখা যায়, পরীক্ষার সময় খাওয়াদাওয়া কমিয়ে দিয়ে সারাক্ষণ পড়ালেখায় ডুবে থাকে। এটা ঠিক নয়। মস্তিষ্ককে যথাযথ সচল রাখতে ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করতে হবে। চিনি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। এসব খাবার যথেষ্ট শক্তি দেয় ঠিকই, কিন্তু এগুলোর শক্তি সরবরাহ সাময়িক, যার কারণে পরীক্ষার্থী নিজেকে আগের চেয়ে আরো দুর্বল মনে করতে পারে। এ সময়ে তাজা বা শুকনো ফল, ফলের রস, সুপ, লবণমুক্ত বাদাম খাওয়া যেতে পারে। এসব খাবার পড়ার ফাঁকে ফাঁকে খেতে হবে। ভাত, মাছ, গোশত বা ডিম নিয়মিত খেতে হবে প্রধান খাবার হিসেবে। ভাতের বদলে অন্যান্য সিরিয়াল ও রুটি খাওয়া যেতে পারে। চর্বি জাতীয় খাবার কম খেতে হবে। পানি পান করতে হবে বেশি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচুর পরিমাণ পানি খেলে মনোসংযোগ বৃদ্ধি পায়। যেসব পানিতে চিনি রয়েছে সেসব পানি পরিহার করতে হবে। সুতরাং কোনো সফটড্রিংকস বা কোমল পানীয় না খাওয়াই ভালো। তবে পড়তে বসে পড়ার মধ্যে কিছু খাওয়া যাবে না। পড়ার টেবিল থেকে উঠে তারপর খেতে হবে। পরীক্ষার সময় অনেকে চা বা কফি খেতে পছন্দ করে। কিন্তু চা বা কফিতে বিদ্যমান ক্যাফিন স্নায়ুকে উত্তেজিত করে তোলে এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। সুতরাং এসব পানীয় পরিহার করাই ভালো। এ সবের পরিবর্তে দুধ খেলে স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে এক গ্লাস হালকা গরম দুধ খেলে তা ঘুমের জন্যও ভালো হবে। কমবে মানসিক চাপও। পরীক্ষার আগের রাতে শর্করা জাতীয় খাবার যেমন ভাত, রুটি, আলু ইত্যাদি খেতে হবে। পরীক্ষার দিন সকালে উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার, যেমন ডিম, শিম, মাশরুম বা সিরিয়াল জাতীয় খাবার খেতে হবে।

লেখক : আবাসিক সার্জন, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।
চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিঃ, ২ ইংলিশ রোড, ঢাকা। ল্যাব সাইন্স ডায়াগনস্টিক লিঃ, ১৫৩/১ গ্রিন রোড (পান্থপথের কাছে), ঢাকা।

ছবি:গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com