পঞ্চাশ বছরের পুরনো আগুন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাওসেতুং

‘‘ওরা বীর, ওরা আকাশে জাগাতো ঝড়’ কবিতার লাইনের চেয়েও বড় ছিলো আন্দোলন। সত্যিই তারা ঝড় তৈরী করেছিলো এখন থেকে পঞ্চাশ বছর আগে ভারতের বুকে। স্প্রিং থান্ডার, বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ। ১৯৬৭ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি শহরের কাছে নকশালবাড়ির একটি গ্রামে পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিলেন দুটি শিশু-সহ মোট এগারোজন মানুষ। সেই ঘটনা থেকে যে সশস্ত্র কৃষক আন্দোলনের সূচনা, তাতে অচিরেই যোগ দেন হাজার হাজার তরুণ – নকশালবাড়ির গন্ডী ছাড়িয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে ভারতের নানা প্রান্তে। নকশালবাড়ির সেই ধিকি ধিকি জ্বলা আগুন কয়েক বছরের মধ্যে স্তিমিত হয়ে এলেও ভারতের রাজনীতির পাতায় আজো হয়ে আছে প্রাসঙ্গিক।হিমালয়ের পাদদেশে তরাইয়ের নকশালবাড়িতে বিভিন্ন দল বা গোষ্ঠী আজ ৫০ বছর আগের যে দিনটিকে স্মরণ করছে, তা একসময় স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইতিহাসকেই বদলে দিয়েছিল বলে মনে করা হয়। সেই নকশালবাড়ির লড়াই।
বিপ্লবের বর্ষা ফলায় বহু দিনের ঘুনে ধরা সমাজ আর প্রতিবাদহীন মানুষকে তখন ক্ষত বিক্ষত করে জাগিয়ে তুলেছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছিলেন চারু মজুমদার, কানু সান্নাল, জঙ্গল শাঁওতাল, সুশিীতল রায় চৌধুরী, সরোজ দত্ত, আর আজিজুল হকের মতো আরো অনেক কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ।

চারু মজুমদার

ভারতের নকশাল আন্দোলনের সেই আগুন বৃত্ত ভেঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, আজকের স্বাধীন বাংলাদেশেও। হাজার হাজার তরুণ সেদিন দুই বাংলায় প্রথাগত বাম রাজনীতির বলয় থেকে বের হয়ে এসে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল হাতে। শুরু করেছিলো গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাওয়ের লড়াই।বিপ্লবের বেদীতে উৎসর্গ করেছিল নিজেদের জীবন অকাতরে। তারপরের ইতিহাস আগুন নিভে যাবার ইতিহাস।
৬৪ সালে মতাদর্শগত কারণে ভাগ হল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। দলের চীনপন্থী গোষ্ঠী বেরিয়ে এসে তৈরি করল সিপিএম।আওয়াজ উঠলো ভূমি সংস্কারের। যার মূল স্লোগান: ‘জমি কারো নয়, জমি হল চাষির। ’৬৭ সালে যুক্তফ্রন্ট প্রতিষ্ঠার পর উৎসাহী ক্যাডারদের মদত দিতে শুরু করল পার্টি। জেলায় জেলায় নির্দেশ গেল, ধনী জোতদারের বাড়তি জমিতে পুঁতে দাও লাল ঝান্ডা। দখল করো জমি। এই আন্দোলন আর তৎপরতারই চূড়ান্ত রূপ নকশালবাড়ি।
১৯৬৭ সালের ২৩ মে নেতাদের নির্দেশে খেতি জমিতে ঝান্ডা পুঁতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিলো নকশালবাড়ির ভূমিহীন কিছু চাষি আর তাদের পরিবার। এই অঞ্চলে চা বাগানও আছে মাইলের পর মাইল। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল সেখানেও। বিক্ষোভ থামাতে পুলিশ আসে। তর্কাতর্কির মধ্যে তীরবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হল এক পুলিশ ইনস্পেক্টরের। পরদিন ১৯৬৭ সালের ২৪ মে বিরাট পুলিশবাহিনী এসে গুলি চালাল আদিবাসী কৃষকদের ওপর। মারা গেলেন ন’জন, যাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মহিলা। সারা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল এই বার্তা—অধিকার আদায় করতে গিয়ে গুলির মুখে প্রাণ হারিয়েছে আদিবাসী চাষি। হিমালয়ের লাগোয়া অঞ্চলের এক আদিবাসী গ্রাম রাতারাতি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করল আন্তর্জাতিক গণবিদ্রোহের মানচিত্রে।
কিন্তু এই আন্দোলনের সূচনাকে কিন্তু সঠিক পথে ধরে রাখা গেলো না। গলাকাটা স্লোগান দিয়ে পার্টির অন্দরে ঢুকে পড়ল দুর্বৃত্ত সমাজবিরোধীদের দল। পুলিশও ঢুকিয়ে দিল অসংখ্য ইনফরমার—নকশালি বাক্যবন্ধে যাদের বলা হত ‘খোঁচর’। পাড়ায় পাড়ায় বিপ্লবীদের খোঁজে প্রায় জাল ফেলে ধরপাকড় শুরু করল কলকাতা আর জেলা পুলিশ। ঠগ বাছতে যেন গাঁ উজাড়। সেই সঙ্গে সক্রিয় করে দেওয়া হল আন্ডার ওয়ার্ল্ডের ট্রিগার-হ্যাপি খতরনাক খুনিদের।১৯৭২ সালে কলকাতার বরানগর, কাশীপুর এলাকায় এক রাতে বিপ্লব দমনের নামে তিনশ তরুণকে ঠান্ডা মাথায় খুন করা হলো।গোটা পশ্চিমবঙ্গে চললো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হননের মহাভারত রচনা। সঙ্গে পুলিশের নির্দয় দমননীতি।
জমির আন্দোলনকে গলা কাটার রাজনীতি বানিয়ে ফেলল যারা, তাদের দিয়ে দেশের উপকার কিছু হবে না, এটুকু বুঝে নিতে লোকে বেশি সময় নেয়নি। এরপরেও যেটুকু বাকি ছিল, তাকে গলা টিপে মারল পুলিশের নৃশংস দমননীতি। বছর কয়েকের মধ্যে সব শেষ।
তবু অকালমৃত এই ‘বিপ্লবের’ দেশজুড়ে এত কেন খ্যাতি? আজ এই পঞ্চাশ বছর পরেও? যে আন্দোলন দানা বেঁধেছিল নেহাতই কৃষকদের পেট-ভাতের স্বার্থে, কেন তাতে জড়িয়ে পড়েছিল শতশত শহুরে শিক্ষিত যুবক? এর অনেকগুলো কারণ আছে। প্রথম কারণ, নকশালবাড়ি আন্দোলনের নমনীয় চরিত্র। অন্তত প্রথম দিকে তেমনই ছিল। শৃঙ্খলাবদ্ধ নীতিনিষ্ঠ কোনও রাজনৈতিক দল ছিল না। সে সময়ের সিপিআই এমএল, ছিল যেন বড়মাপের এক মঞ্চ। সে-মঞ্চে ভূমিহীন কৃষকের যেমন অবাধ উপস্থিতি, তেমনই উপস্থিতি শহুরে বস্তিবাসীর। ঝান্ডা কাঁধে হেঁটে চলেছে নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ, তাদের পাশে পোস্টার সাঁটছে স্কুল-কলেজের কিশোর। পকেটে পিস্তল পুরে এদেরই মধ্যে কেউ চলে গেল বিপ্লব করতে। কোনও দল নয়, এ যেন বহুবর্ণ-রঞ্জিত এক রঙ্গমঞ্চ যার ‘ইমপ্যাক্ট’ কার্যত গিলে ফেলেছিল গোটা বাংলাকে।দ্বিতীয় কারণ, এই নকশালবাড়ি আন্দোলনই প্রথম আন্দোলন যা ভারতীয় রাজনীতিকে এক আন্তর্জাতিক চরিত্রের উপহার দেয়। নকশালপন্থীদের প্রধান প্রেরণা ছিলেন লাল চীনের নেতা কমরেড মাও-সে-তুং। পশ্চিম বাংলায় বিপ্লবীদের শ্লোগান ছিলো ‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’। ‘আমার বাড়ি তোমার বাড়ি নকশাল বাড়ি নকশাল বাড়ি’, ‘সত্তরের দশক মুক্তির দশকে পরিণত হতে চলেছে’। সমকালীন দুনিয়ায় তখন অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটে চলেছে। একদিকে মাওয়ের চীনে চলছে ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। অন্যদিকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ। দিনের পর দিন নাপাম বোমা ফেলেও আমেরিকার সেনাবাহিনী দমন করতে পারছে না ভিয়েতনামের মুক্তিকামী মানুষকে। পাশাপাশি ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে ভেসে আসছে জবরদস্ত ছাত্র আন্দোলনের সঙ্ঘবদ্ধ স্লোগান। চে-গুয়েভারা বিপ্লবী বিশ্বের আর এক রোমান্টিক হিরো—তখনও নিজেকে গোপন রেখে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। ১৯৬৮ সালে নিহত হলেন মার্টিন লুথার কিং। এর আগের বছর বলিভিয়ায় নিহত হলেন মার্কসবাদী রাজনীতির আরেক ক্ষণজন্মা পুরুষ চে গুয়েভারা। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের এই ভয়ঙ্কর ঢেউ নকশাল বাড়ির আন্দোলনকেেএক পাগল ঝড়ে পরিণত করেছিলো।
লেখিকা ও অ্যাক্টিভিস্ট জয়া মিত্রের ভাষায়, “এই আন্দোলনকে আজও মানুষের মনে রাখার কারণ সম্ভবত ওই শেষবারই একটা মূল্যবোধ নিয়ে ছেলেমেয়েরা লড়েছিল। গ্রাম বা মফসসলে আজও মানুষ বলেন, ওই যুবক-যুবতীরা আর যাই করুক – তারা অন্তত স্বার্থপরতা করেনি। ওরা অন্যের জন্য প্রাণ দেওয়ার, আত্মত্যাগ করার সাহস দেখিয়েছিল।”

ছবি:গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com