নেতারহাটে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জয়দীপ রায়

(কলকাতা থেকে): মনসুন এসে যাবার কথা ইতিমধ্যেই নেতারহাটে। আসেনি। মেঘ এখনও হঠাৎ করে এসে পুরনো বন্ধুর মতো জড়িয়ে ধরে না। শুধু হাওয়া আসে শিরশিরিয়ে।

পথ চলে গেছে…

আমাদের আমের মতই এবছর নাসপাতির ফলন হয়েছে খুব। বাগান ভর্তি মিষ্টি জলভরা নাসপাতি। সুস্বাদু। পালামৌ আসলেই আমার শুধু মনে হয় এখানে রাস্তার বাঁকে বাঁকে দেখা হয়ে যাবে সুমিতা বৌদি, যশোবন্ত বা তিতলির সঙ্গে। কেঁচকির বাংলোর সামনে গেলেই মনে হয় এই বোধহয় সিমি টানা চোখ নিয়ে সামনে হাজির হলো। জঙ্গলটার পাতায় পাতায় জড়িয়ে রয়েছে বুদ্ধদেব গুহ। কোয়েলের কাছে গিয়ে প্রতিদিনই শান্ত হয়ে বসেন তিনি। নিয়মকরে।
কোয়েল সবচেয়ে মিষ্টি নামের নদীটি। বয়ে গেছে পালামু টাইগার রিজার্ভের ভেতর দিয়ে।নেতারহাট এখনও আনএক্সপ্লোরড। এখনও গুটিকয় মাত্র থাকার জায়গা। ঝকঝকে কোনও হোটেল তৈরী হয়নি। সেরা জায়গাটা হল ফরেস্ট বাংলো। ভেতরটা স্বর্গের মত। লম্বা কলোনিয়াল বাংলো। দু একটা কটেজ, সানরাইজ ফেসিং। প্রচুর ফুল। পেল্লায়, গায়ের মসৃণ সাদা চামড়া ফেটে বেরিয়ে আসা যেন লাল রঙের ইউক্যালিপটাস।

রিসোর্টের লন

চুরানব্বই সালে প্রথম এসেছিলাম। স্কুল থেকে দল বেঁধে বাস নিয়ে। অঞ্জন দত্তর শুনতে কি চাও সেই পুজোতেই বেরিয়েছে। আমরাও খাদের ধারের রেলিং শুনতে শুনতে দার্জিলিংয়ের মতই পাকদন্ডী বেয়ে হৈ হৈ করে নেতারহাট পাহাড়ে উঠে পড়লাম।
এই তেইশ বছরে খুব বেশী পরিবর্তন হয়নি নেচার হার্ট এর। এখনও কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্টের কোন রিজর্ট গজিয়ে ওঠেনি। সিসিডি ডমিনোজ সাবওয়ের দাপাদাপি নেই। মদের দোকানও হয়নি, তবে মহুয়ার মিস্টি গন্ধ নাক বাড়ালেই পাওয়া যায়।
নেতারহাটের অল্টিচিউড ১০৭১ মিটার। কালিম্পংয়ের ১২৪৭। পাহাড়ের পর পাহাড় পেরিয়ে নেতারহাটে পৌঁছে গেলে আর বোঝা যায় না যে প্রায় কালিম্পংয়ের উচ্চতায় ছোটনাগপুরের এই হিল স্টেশনটা। একটা বড়সড় ভ্যালি মত। পাহাড়ী জায়গায় যেরকম চড়াই উৎরাই থাকে, সেরকম কম।

বর্ষীয়ান গাছ

তবে পরিপাটি চির গাছের জঙ্গল, বড় বড় নাসপাতি বাগান আর বুকে জড়িয়ে ধরতে গেলে স্লিপ কেটে যায় এরকম প্রকান্ড কান্ডের চকচকে ইউক্যালিপটাসের ছবি আঁকা এ এক আশ্চর্য পাহাড়। যেখানে ঘড়ির কাঁটা থেকে থেকেই স্লো হয়ে যায়।
নেতারহাটের আর একটা স্পেশাল ব্যাপার হল সানরাইজ সানসেট দুটোই দেখা যায়। সানসেটটা তো একদম খুনী। আর কোন পাহাড়ী জনপদে এরকম হয় কিনা জানা নেই।
এখন শুধু নেতারহাট পাহাড়ে মনসুন আসার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সব জঙ্গলে বর্ষার তালা পড়ে গেছে। দার্জিলিং পাহাড়ে বৃষ্টিতেও কোণে কোণে ফায়ারপ্লেস জ্বলছে। এই ফাঁকে যদি একবার চলে আসা যায় নেতারহাট, আর বিকেলে হাঁটতে বেরিয়ে হঠাৎ করে মেঘে ঢাকা পড়ে গায়েব হয়ে গিয়ে পাশের মানুষটাকে যদি আলগোছে জড়িয়ে ধরা যায়, বিশ্বাস করো কেউ টের পাবে না। কেউ জানতেই পারবে না তোমার ঠোঁট তার চোখ খুঁজে বেড়ালো, না তার ঠান্ডা নাক তোমার গাল!
তা সে নেতারহাট যতই তোমার শহর থেকে মাত্র ১০৭১ মিটার উঁচু হোক না কেন। বাদবাকি কেউই জানতে পারবো না, সে রাতে কেয়ারটেকার আহমদ মোরগের ঝোলটা কি করে অত স্বাদু বানালো অথবা ডাকবাংলোর লনে সারারাতের বৃষ্টি শুনতে শুনতে কিভাবে আস্তে আস্তে ঘুম ছড়িয়ে পড়েছিল দুটো শরীরে, সন্তর্পণে।

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com