নারী কেন ধর্ষণের শিকার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আন্জুমান রোজী, কানাডা থেকে

যৌন সুড়সুড়ি মার্কা কথাবার্তা অনেকেই বলেন। নারীপুরুষ অনেক সময় তাল মিলিয়ে এসমস্ত কথা নিয়ে মজাও করেন, হতেই পারে এমনসব আলোচনায়, সমস্যা নেই। প্রকৃতির নিয়মে নারীপুরুষের ক্যামিস্ট্রি বিভিন্নভাবে কাজ করে। এতে নারীপুরুষ উভয়ে কিছুটা মানসিক তৃপ্তি পেতে পারে, তবে পুরুষের ক্ষেত্রে অনেক সময় এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে কন্ট্রোল করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তখন সেই পুরুষ মাথার বিষ নামানোর জন্য এদিক ওদিক সুযোগ খুঁজবেই। হাতের কাছে না পেলে শেষ পর্যন্ত মাস্টারবেড করবে,  এটাই স্বাভাবিক। ভদ্র, মার্জিত, শিক্ষিত, বিবেকবান, সচেতন পুরুষ নিজেদের সুন্দর করে সামাল দিয়ে উঠেন ঠিকই কিন্তু বেশিরভাগই  অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যায়। এমতাবস্থায় যৌন হয়রানী , ধর্ষণ জাতীয় ঘটনা তো ঘটতেই পারে।

উস্কানিমূলক কথা বা ইশারা পুরুষের কাছ থেকেই আসে বেশি। নারী যে একেবারে এসবের উর্ধে তা নয় কিন্তু। নারীর মধ্যেও এমন যন্ত্রণার কাহিনী অনেক আছে। তবে প্রকৃতির স্বভাবটাই এমন যে পুরুষের যৌনলিপ্সা অগ্রভাগে এবং তা অতিমাত্রায় প্রকাশ পায়। নারীকে আকর্ষণ করার জন্যে যতরকমের কলাকৌশল বা কুটকৌশল পুরুষ সময়, সুযোগ এবং পরিস্থিতি দেখে  প্রকাশ করে। সেখানে নারী যদি  উপযাচিকা হয়ে এসব বিষয়ে উসকিয়ে দেয়, তাদের ভাবা উচিত পরবর্তীতে এর ফল কি হবে! আমরা যেভাবে বড়ো হয়েছি ছোটকাল থেকে ছেলেদের উত্তেজক কোনো কথাবার্তা শোনা বা ইশারা দেখামাত্রই এড়িয়ে অন্যপথ ধরে হেঁটে চলেগেছি। এমনও হয়েছে, অনেক ঘনিষ্ট বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও পেয়েছি এমন আচরণ। একটা মেয়ের বেড়ে ওঠার পথে এটা চরম বাঁধা বটে। কিন্তু পারিবারিক শিক্ষা এমন ছিল যে এই বিষয়গুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল শিখিয়ে দেওয়া হতো। এই কৌশল এমনই  পুরুষকে আর অপমানিত হতে হচ্ছে না। তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, নিজেকে ঠাণ্ডা করো। এমন পরিস্থিতির শিকার যে কোনো অবস্থাতেই ঘটতে পারে। তবে নারীকে কৌশলী হয়ে সরে গিয়ে পুরুষকে বুঝিয়ে দেওয়া উচিত, বিষয়টা ঠিক হচ্ছে না। তারপরেও যদি অতিমাত্রায় ইচ্ছার বিরুদ্ধে এমন কিছু অশোভন কাজ ঘটতে থাকে তখন অবশ্যই আইনের আশ্রয় নিতে হবে। যদিও বাংলাদেশে বর্তমানে নারীর ব্যাপারে প্রকটভাবে বিরূপ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এরজন্য অবশ্যই অস্থির রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যই চূড়ান্তভাবে দায়ী।

আমি অনেক নারীকে দেখেছি তারা এসমস্ত আলাপচারিতায় মগ্ন থাকেন। কী সামাজিক গণমাধ্যমে, কী বাস্তবে। সেসব নারীদের জন্য যতটা না করুণা ঠিক ততটাই ঘৃণা আমার ভিতর জন্ম নেয়। নারী নিজেকেই যৌনপণ্য বানাচ্ছে। আকারে ইঙ্গিতে বেশভূষায়, অঙ্গ ভঙ্গীতে, কথাবার্তায় যৌন আবেদনময়ী করে তুলছে। অনেকের মধ্যে তো এসবের কোনো নান্দনিকতা প্রকাশ পায়ই না বরং দৃষ্টিকটু ও বিরক্তির উদ্রেক করে, সমাজকেও করে যৌন পক্ষাঘাতগ্রস্ত । এখন অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, পুরুষ যদি অবলীলায় বলতে পারে  তাহলে নারী কেন পারবে না?  এক্ষেত্রে আমার দ্বিমত সবসময়ই ছিল এবং এখনো আছে। পুরুষের শারিরিক শক্তির কাছে নারী যেহেতু দুর্বল তখন নারীকেই ঠিক করতে হবে তার কি করা উচিত। প্রকৃতির বিধান বলি আর বাস্তবতাই বলি পুরুষ নারীর উপর চড়াও হবেই। এটা পৃথিবীর শুরু থেকেই হয়ে আসছে। উন্নত দেশেও এর ব্যতিক্রম নয়।

তবে উন্নত দেশে আইনের বলিষ্ঠ প্রয়োগ আছে বলে এর মাত্রা কন্ট্রোলের মধ্যে আছে। আর নারী যেহেতু প্রকৃতির সৌন্দর্যের একটি বড় অংশ, সেহেতু নারীর নিজেকেই জানতে হবে কিভাবে তার সৌন্দর্যের লালল করবে। নারীর ধর্মই নিজেকে সুন্দর করে সামাল দিয়ে চলা। নারী হয়ে জন্মেছি বলেই তো এসব উটকো ঝামেলাগুলো সহ্য করতে হচ্ছে। আর পৃথিবী যতদিন থাকবে  যৌন হয়রানী কখনই বিলুপ্ত হবে না। স্বেচ্ছায় যা হয় হবে, কিন্তু জোরপূর্বক কোনোকিছুই গ্রহণযোগ্যতা রাখেনা।

প্রশ্ন এমনও আসতে পারে, নারী নিজেকে রক্ষা করে চলেও তো পুরুষের বাঘের মতো থাবার শিকার হচ্ছে, হচ্ছে ধর্ষণের শিকার। এক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্য, আইনের অপপ্রয়োগ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথা বা  ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস দায়ী। পুরুষতান্রিক সমাজ যুগযুগ ধরে তার চর্চা করে আসছে এবং সেই মোতাবেক ফায়দা লুটছে। এর বেড়া ভাঙ্গতে হলে নারীকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। এক একেকটি নারী হতে পারে এক একেকটি দূর্গ। একেকটি নারী যদি শিক্ষিত সচেতন, বিবেকবান এবং ব্যক্তিবান হয়ে ওঠতে পারে তাহলে পুরুষের এমন অন্ধলিপ্সা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে। হয়তো পুরোপুরি সমস্যার সমাধান হবে না, তবে পুরুষের ভিতর ভীতিটা ঢুকিয়ে দিতে এক বলিষ্ঠ ভূমিকা নারীই রাখতে পারে।

এরকম আমি অনেক নারীকে দেখেছি, অন্য নারীর বয়সকে ইঙ্গিত করে, অর্থাৎ যৌবন ফুরিয়ে গেছে, এমন খারাপ অর্থে পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এতে পুরুষ গদগদ হয়ে সেই নারীটির প্রতি আসক্তভাব প্রকাশ করে। শরীরিয়ভাবে নিজেকে পুরুষের উপজীব্য করে তোলার জন্য তো অন্য নারীকে হেয় করার প্রয়োজন নেই। সেই নারী নিজেকে নিজের মতো করে পুরুষের সামনে মেলে ধরতে পারে। যদি তার ইচ্ছাটা এমনই থাকে। নারী হয়ে নারীকে হেয় বা অবমাননা করার নারীর এই ঘৃণ্য মানসিকতাকে ধিক্কার জানাই।  এসবের প্রতিবাদ করতে গিয়ে  অনেক সময় দেখা গেছে, সেই নারীটা এটা শুধুমাত্র মজা করার জন্যেই বলা, বলে উল্লেখ করে। যে নারী এই ঘৃণ্য পদ্ধতিতে মজা করার নামে অন্য নারীকে হেয় করে, সমাজে যতবড় কিছুই সে হোক না কেন, তাকে আমি মনুষ্য কাতারে ফেলি না। এমন মানসিকতা অনেক নারীপুরুষ কবি, সাহিত্যিকদের মধ্যেও আছে। এই মজা করতে গিয়ে পুরুষটিকে যে যৌন লালসায় উস্কিয়ে দেওয়া হচ্ছে তা প্রকারান্তরেই বোঝা যায়, সেইসঙ্গে অন্যনারীকে শুধু ছোটই না নিজেকেও যে ছোট করছে সেই নারী হয়তো পক্ষান্তরে কিছুই বুঝেনা।

আমি নারী হয়ে, নারীদের কিছু দুর্বল দিক বা সীমবদ্ধতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আজকের সমাজে অর্থাৎ বাংলাদেশের সমাজে নারীদের অবস্থান শূন্যের কোঠায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।  শিক্ষা, সচেতনতা কোনোকিছুতে কোনো কাজ হচ্ছে না। কারণ, নারীরপুরুষের এই মানসিকতার চর্চা যুগযুগ ধরে অবলীলায় হয়ে আসছে। এতে কোনো বাঁধা বা কোনো নিয়ম ছিলনা। যারফলে ধর্মীয় গোঁড়ামি ঢুকে পড়ে খুব সহজে। এখন ধর্মীয় আস্ফালন দিয়ে যৌন হয়রানী বন্ধ করার জন্য নারীর উপরেই চাবুকের আঘাত আসছে। সব নারী তা বুঝতে পারছে কিনা জানি না। তবে এখনো সময় আছে , নারী ইচ্ছে করলে পারে, নিজেকে হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করে ঘুরে দাঁড়াতে। সেইসঙ্গে  নারী হতে পারে নারীর সহযোদ্ধা। নারীর পাশে দাঁড়ানোও নারীর মৌলিক দায়িত্ব এবং এটাই এখন সময়ের দাবী।

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com