নদীতে সূর্যের প্রতিবিম্ব…পাড়ে সারি সারি গ্রাম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজামুল হক বিপুল

বাংলাদেশটা নদীমাতৃক । আর আমার কাছে নদী বলতে খরস্রোতা মনু, ধলাই, খোয়াই, তার চেয়ে একটু প্রশস্ত কুশিয়ারা কিংবা সুরমা নদী। এই নদীগুলোর সঙ্গইে আমার উঠা-বসা, আমার পরিচয়। এর বাইরে প্রমত্তা মেঘনা নদী হচ্ছে আমার কাছে সবচেয়ে বড় নদী। যদিও স্কুলের ছাত্রবস্থায় পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নদীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে পাঠ্য বইয়ের কল্যাণে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে জানার, দেখার, বোঝার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের শত শত নদীর সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে। এরমধ্যে বরিশাল অঞ্চলেই নদীর সংখ্যা বেশি।
এ কারণেই হয়তো বরিশাল নিয়ে প্রচলিত প্রবাদ হচ্ছে- ‘ধান-নদী-খাল-এই তিনে বরিশাল।’ আর এই নদীগুলোই যে বাংলাদেশের সৌন্দর্য্যকে হাজার গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে সেটা চোখে না দেখলে কিংবা নদী পথে ভ্রমণ না করলে বোঝা যাবে না। নদী যে পর্যটকদের কতোটা কাছে ডাকে, প্রাণভরে তাকে উপভোগ করতে বলে সেটা শুধু নদীর কাছে গেলেই অনুভব করা যায়।
গত জানুয়ারিতে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা পটুয়াখালীর কুয়াকাটা গিয়েছিলাম। পর্যটন বিষয়ক একটি কার্ণিভালে অংশ নিতে। কুয়াকাটায় সমুদ্র দর্শন শেষে ঢাকায় ফেরার পথে মনে হল, পঞ্চান্ন হাজার বর্গ মাইলের সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশটা যে কতোটা সুন্দর, কতোটা যৌবনা, কতোটা আকর্ষণীয়, দৃষ্টিনন্দন- দিনের বেলা নৌপথে ভ্রমণ করলেই সেটা বোঝায় যায়। আমরা বিকেলের জাহাজে করে ঢাকায় ফেরার উদ্দেশ্যে কুয়াকাটা থেকে সকালেই রওয়ানা হয়েছিলাম বরিশালের পথে। যেহেতু বরিশাল থেকেই বিকেলের জাহাজে ঢাকার পথে যাত্রা করতে হবে সে কারণে আমরা অযথা সময় নষ্ট করতে চাইনি। কুয়াকাটা থেকে সড়ক পথে বরিশাল ফেরার পথে একাধিক নদী পাড়ি দিতে হয়েছে। তবে এগুলোর প্রায় সবক’টিতেই সেতু থাকায় নদীর আসল রূপ দেখার সুযোগ হয়নি। মধ্যে শুধু পায়রা নদীতে একবার ফেরী পারাপার হতে হয়েছে। তখন দেখেছি বিশাল পায়রা নদীর অপরূপ সৌন্দর্য্য। এই পায়রা নদীতেই হচ্ছে পায়রা সমুদ্রবন্দর।
যাক দুপুরের মধ্যেই আমরা চলে আসলাম বরিশাল শহরে। শহরের প্রধান সড়কের উপর একটি রেস্টুরেন্টে আমাদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা সব মিলিয়ে ছিলাম প্রায় ১৫/১৬ জন। শহরে ঢুকেই আমি প্রথমে চলে গেলাম শহরের বগুড়া রোড ধরে শশী’র মিষ্টির দোকানে। আমার স্ত্রী-কন্যার অর্ডার ছিল বরিশাল থেকে ফেরার পথে যেন শশী’র মিষ্টি অবশ্যই নিয়ে আসি। এর একটা কারণও আছে, শশী’র রসগোল্লাটা সত্যিই সু-স্বাদু। যাকগে মিষ্টি কেনা শেষে আমার বন্ধু বরিশালের সাংবাদিক ফেরদৌস সোহাগের সঙ্গে দেখা করার প্রবল ইচ্ছা থেকে তার অফিসে একটা ঢু মারলাম। ফেরেদৌস সোহাগের সঙ্গে পরিচয় ঢাকায় সাংবাদিকতা করতে এসে। দু’জনেই এক সঙ্গে যোগ দিয়েছিলাম মানবজমিন এ। কিন্তু সোহাগ ঢাকার আলো-বাতাসের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে বরিশালেই ফেরত গিয়েছিলো। এখন সে বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল সময় টিভির বরিশালরে ব্যুারো প্রধান। সেখানে কিছুক্ষণ গল্প আড্ডা শেষে আবার দ্রুত চলে আসলাম নির্ধারিত রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার সাবার করতে। সবার খাওয়া শেষ। বাকি আমরা তিন-চার জন ছিলাম। দ্রুত খাওয়া শেষ করে রওয়ানা হলাম বরশিাল লঞ্চ টার্মিনালের দিকে।
বিকাল তিনটায় বরিশাল থেকে ছাড়বে গ্রিন লাইনের জাহাজটি (ওয়াটার বাস)। ঠিক ১০ মিনিট আগেই আমরা উঠে গেলাম জাহাজে। তিনটা পাঁচ মিনিটে জাহাজ বরিশাল টার্মিনাল থেকে ছাড়লো। দিনের বেলা দূর পাল্লায় আমার লঞ্চ জার্ণি এই প্রথম। তাই সিটে না বসে থেকে আমরা কয়েকজন ব্যাগ-ব্যাগেজ নিরাপদে রেখে চলে গেলাম জাহাজের ছাদে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই জাহাজ ঘাট ছেড়ে কীর্তনখোলার মাঝ বরাবর অনেক দূর চলে গেছে। খুব দ্রুত বেগে ছুটে চলার কারণে নদীতে বড় বড় ঢেউয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। সেই ঢেউয়ে নদীতে থাকা ছোট ছোট নৌকা, ট্রলার ও লঞ্চ দোল খাচ্ছে। বিশেষ করে মাছ ধরার নৌকাগুলোই বেশি দোল খাচ্ছে। আমাদের এলাকায় অর্থাৎ বৃহত্তর সিলেটের হাওরাঞ্চলে এরকম মাছ ধরার অনকে নৌকাকে দোল খেতে দেখেছি আফাল’র কারণে। ঢেউকে হাওরাঞ্চলে ‘আফাল’ বলে।
কীর্তনখোলার মাছ বরাবর ছুটে চলছে গ্রীণ লাইন। আর সুপ্রশস্ত নদীর দুই পারে সারি সারি বিস্তৃির্ণ সবুজ গ্রাম। মন ভরিয়ে দেয়া নয়ন জুড়ানো দৃশ্য। জাহাজ যতই সামনের দিকে যাচ্ছে গ্রাম গ্রামকে হারিয়ে যাচ্ছে দূর থেকে দূরে…বহু দূরে। চোখের আড়াল হয়ে যাচ্ছে,পড়ন্ত বিকেলে। সূর্য্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। এক সময় লক্ষ্য করলাম জাহাজ কীর্তনখোলাকে পিছনে ফেলে আড়িয়াল খাঁ নদীতে প্রবেশ করেছে। নদীর বুকে দিব্যি মাছ শিকারে ব্যস্ত জেলেরা। আর জাহাজের পিছনে বড় বড় ঢেউয়ের কারণে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরা দল বেঁধে উড়াউড়ি করছিল, হয়তোবা মাছ শিকারে মত্ত ছিল। পাখিদের এমন দলবেঁধে উড়োউড়ির দৃশ্য যে কাউকে মুগ্ধ করবে।
এসব দৃশ্য দেখেই একবার জাহাজের ভিতরে প্রবেশ করে হাঁটতে হাঁটতে একেবারে সামনের দিকে চলে গেলাম। দেখা হয়ে গেল সাংবাদিক আমিন আল রশীদ এর সঙ্গে। ঝালকাঠির মানুষ। থাকেন ঢাকায়। কাজ করেন একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে। পূর্ব পরিচয় সূত্রে দু’জনে মিলে চুটিয়ে আড্ডা দেয়ার পর আবারো বাইরে বের হলাম। তখনই নদীর সৌন্দর্য্যরে আসল রূপ যেন ধরা দিল চোখের সামনে। জাহাজ তখনও আড়িয়াল খাঁ নদীতে। এরই মধ্যে লাল বর্ণ সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে ডুবতে শুরু করেছে। নদীর মধ্যে সূর্যের প্রতিবিম্ব…নদীর পাড়ে সবুজ গ্রাম। ধীরে ধীরে সূর্য আড়াল হচ্ছে। সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত জাহাজের বাইরে থাকা অসংখ্য তরুণ-তরুণী। আমাদের হাতে থাকা মোবাইলও সচল হয়ে উঠলো। একের পর এক ক্লিক চলতে থাকলো অবিরাম। সূর্য একেবারে চোখের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া পর্যস্ত সমানে চললো ক্যামেরার ক্লিকবাজি…। কেউ কেউ আবার চমৎকার এই দৃশ্যকে শুধু স্থির চিত্রেই সীমাবদ্ধ না রেখে ভিডিও করলেন। আর এমন অপরূপ দৃশ্য মুহুর্তেই দূর করে দিল আমার দীর্ঘ জার্নির সকল ক্লান্ত।ি সেই অপেক্ষার ফাঁকেই আমাদের গল্পের মাঝে আমিন আল রশীদ বললেন, নদীকে ঘিরে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। দরকার শুধু উদ্যোগ আর রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা। তাহলেই নদী কেন্দ্রীক দেশী বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করা যাবে। ধীরে ধীরে নেমে আসল অন্ধকার। আমরা অপেক্ষায় থাকলাম সদর ঘাটের। কখন ভিড়বে জাহাজ, কখন পৌঁছবো গন্তব্য।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com