নকল হিটলার…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আঠারো খন্ড বাঁধাই করা ডায়েরি, ১৯ মিলিয়ন জার্মান মুদ্রা, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা হিটলারের নিজ হাতে লেখা বিচিত্র সব মন্তব্য আর শেষে সাংবাদিকতা-সব মিলিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে কুখ্যাত জালিয়াতির এক কাহিনি। এই কাহিনির জন্ম এখন থেকে প্রায় ৩৫ বছর আগে। জার্মানীর ‘স্টার্ন’ নামে একটি পত্রিকার কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করেই একদিন ঘোষণা করলো অ্যাডলফ হিটলারের লেখা ব্যক্তিগত ডায়েরি তাদের হাতে এসেছে। অচিরেই তারা পত্রিকায় এই ডায়েরি প্রকাশিত হবে। ১৯৩২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর এক উন্মাতাল সময়ের ঘটনাপ্রবাহ ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

সেই ডায়েরিতে হিটলার লিখছেন-
.শরীর ভালো যাচ্ছে না। ঘুম কম হচ্ছে।
. ইভা (ইভা ব্রাউন) বলছে আমার মুখে দুর্গন্ধ হচ্ছে। ওর ইচ্ছায় ডাক্তার দেখাচ্ছি।
. ইভার জন্য অলিম্পিক গেমসের টিকেট জোগাড় করতে হবে।

চমকে ওঠার মতো সব তথ্য। সেই সময় বিশ্ববাসী নড়েচড়েই বসেছিলেন পত্রিকাটির এই খবর পড়ে। মানব সভ্যতাকে তছনছ করে দেয়া মানুষ হিটলারের এসব তথ্য তো সবার কাছেই অজানা। হৈ চৈ পড়ে গেলো সবজায়গায়। এক লহমায় ‘স্টার্ন’ পত্রিকা উঠে এলো আলোচনায়।
তারপর? তারপরের ইতিহাস আরও চমকপ্রদ। এই ডায়েরি আবিষ্কারের ঘোষণার মাত্র দুই সপ্তাহ পার না হতেই জার্মানীর তৎকালীন জাতীয় আর্কাইভ বিভাগ ‘বুন্দেসআর্কাইভ’-এর ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা নেমে পড়লেন ব্যাপক গবেষণায়। আর ফলাফলে তারা জানালেন পুরো বিষয়টাই এক অসাধারণ জালিয়াতি। চাকরি হারালেন পত্রিকাটির সেই রিপোর্টার, বার্তা সম্পাদক। ধরা পড়লো জালিয়াত। ঘটলো জেল-জরিমানার মতো ঘটনাও। এই হট্টগোলে ‘স্টার্ন’ পত্রিকার ক্ষতিগ্রস্ত হলো সুনাম, খরচ হলো ১৯ মিলিয়ন জার্মান মার্ক।

ব্রেকিং নিউজ

এই চমকপ্রদ জালিয়াতির ঘটনার মূল নায়ক ছিলো ওই পত্রিকারই এক রিপোর্টার জেরার্ড হেইডম্যান। ১৯৫৫ সাল থেকে স্টার্নে কর্মরত হেইডম্যনের বাতিক ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান সৈন্য অথবা বড় কর্তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র সংগ্রহ করা। এই পুরনো জিনিস সংগ্রহ করার সূত্র ধরেই হিটলারের নকল ডায়েরি-কাহিনির শুরু। ১৯৮০ সালে হেইডম্যান জার্মানীর স্টুটগার্ড শহরে যান তার সংগ্রহে থাকা জার্মান সেনাপতি গোয়েরিংয়ের ব্যবহৃত একটি নৌকা বিক্রি করতে। সেখানে নৌকা বিক্রি হয় নি কিন্তু স্টেফেল নামে এক ব্যবসায়ী তার হাতে তুলে দেয় হিটলারের ডায়েরির একটি খন্ড যার ওপর লেখা ছিল জানুয়ারী-জুন, ১৯৩৫।

ডায়েরি হাতে হেইডম্যান

ডায়েরি হাতে নিয়ে লাফিয়ে ওঠেন হেইডম্যান। তখনও তার কাছে ডায়েরি জালিয়াতির ঘটনাটি পরিষ্কার ছিলো না। এরকম একটি ঐতিহাসিক ডায়েরি হাতে পেয়ে সাংবাদিকতার ইতিহাসে রাতারাতি নক্ষত্র হয়ে ওঠার বাসনায় হেইডম্যান ছুটলেন তার দফতরে। কারণ ইতিহাস বলে হিটলারের গোপন কাগজপত্র পাচারকারী একটি বিমান ২য় বিশ্বযুদ্ধের অন্তিমলগ্নে বিধ্বস্ত হয়েছিল জার্মানীতে। ‘অপারেশন সের্গেইলো’ নামে সেই অভিযানে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর হিটলার নাকি আফসোস করে মন্তব্য করেছিলেন যে তার বহু গোপন কাগজ মিত্রবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যাবে।  হেইডম্যান ধরেই নিয়েছিলেন ওই ডায়েরি বিধ্বস্ত হওয়া বিমানে ছিলো। কিন্তু প্রাথমিক অবস্থায় পত্রিকার কর্তারা হিটলারের ডায়েরির বিষয়টা উড়িয়ে দিয়েছিলো গাঁজাখুরি গল্প হিসেবে। কিন্তু পত্রিকার ঐতিহাসিক তথ্য গবেষণা বিভাগের টমাস ওয়ালডে হেইডম্যানের ডায়েরি আবিষ্কারের কাহিনিটি বিশ্বাস করেন। দুজন মিলে শুরু করেন অনুসন্ধান। সেই ব্যবসায়ী স্টেফলে তাদের জানায় হের ফিশার নামে এক সংগ্রাহকের কাছে ডায়েরির আরও খন্ড থাকার তথ্য। হেইডম্যান ফিশারের কাছে পত্রিকার পক্ষ থেকে বার্তা পাঠালেন ডায়েরিগুলো কিনে নেয়ার কথা বলে। তারা ফিশারকে এ জন্য দুই মিলিয়ন মার্ক দেয়ারও প্রস্তাব দিলেন। ফিশার তাদের টোপটা গিলে ফেললো। এই ফিশারের আসল নাম ছিলো কনরাড কুজো। তার কারবারই ছিলো জালিয়াতির। ওই সময়ে বিভিন্ন জার্মান সেনাপতিদের স্বাক্ষর জাল করে জার্মানদের গোপন দলিলপত্রের জাল তৈরী করে সংগ্রাহকদের কাছে চড়া দরে বিক্রি করাই ছিলো তার পেশা।এই কাজ করতে করতে কুজোর মাথায় আসে হিটলারের জাল ডায়েরি তৈরী করার। পুরনো দিনের স্কুলের বেশকিছু নোট খাতা কিনে কুজো শুরু করে দেয় হিটলারের নকল ডায়েরি তৈরীর কাজ।

 

ওভার ট্রাম্প
হেইডম্যান তার পত্রিকার কর্তাদের বোঝাতে সক্ষম হয় এই ডায়েরির গুরুত্ব। মজার ব্যাপার হচ্ছে তখনও হেইডম্যান নিজেও জানে না কুজোর জালিয়াতির কথা। আর সুযোগ বুঝে কুজো স্টার্ন পত্রিকার কাছ থেকে এই ডায়েরি সরবরাহ বাবদ মোটা টাকা অগ্রীম হাতিয়ে নেয়। ডায়েরি হাতে পেয়ে পত্রিকার মালিকরাও তখন উচ্ছ্বসিত। কুজো ব্যবসায়ী মানুষ। সে-ও ঝোপ বুঝে কোপ মারে। মালিকদের সঙ্গে তার চুক্তি হয় এই ডায়েরি প্রকাশিত হলে রয়্যালটি বাবদ তাকে ৬ শতাংশ টাকা দিতে হবে।

জালিয়াতের কান্ড
কুজো বসে যায় তার জালিয়াতির টেবিলে। তৈরী হতে থাকে একটার পর একটা নকল ডায়েরি। এরমধ্যে হেইডম্যানও নতুন চাল চালে। কুজোকে দেয়া পত্রিকার টাকা থেকে একটা বড় অংশ সে সরাতে শুরু করে। পত্রিকাকে হেইডম্যান জানায় কুজোকে ৮৫ হাজার মার্ক দিলে চলবে না। সে দাবি করেছে দুই লাখ মার্ক। বাড়তি অর্থ হেইডম্যান সোজা ঢুকিয়ে ফেলেন নিজের পকেটে। কারবারটা ভালোই জমেছিল দুই পক্ষের। কুজো ডায়েরিতে এমন সব তথ্য ঢোকাতে শুরু করলো যাতে ইতিহাসের যাত্রাপথই প্রায় বদলে যেতে শুরু করলো। সেখানে কুজো লিখে দিলো হিটলার তার ইহুদি নিধনের কর্মকান্ডের ব্যাপারে অনুতপ্ত হয়ে উঠেছিলো।

চোরের একদিন তো…
কিন্তু চোরের দশদিন তো গৃহস্থের একদিন বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। স্টার্ন পত্রিকা কর্তৃপক্ষ যখন আনুষ্ঠানিকভাবে এই ডায়েরি প্রকাশের কথা ঘোষণা করলো তখন নিউজউইক ম্যাগাজিন ও আমেরিকার মিডিয়া মোগল রুপার্ট মারডকের নিউজ কর্পের পক্ষ থেকে বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাস গবেষকরা এসে হাজির হলেন। তারা ডায়েরি খতিয়ে দেখতে চাইলেন। পত্রিকার কর্তারা বাধ্য হয়ে তাদের হাতে তুলে দিলেন এক খন্ড ডায়েরি। হিটলারের হাতের লেখা এবং অন্যান্য দিক পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞরা বোমাটা ফাটালেন। তারা জানালেন, পুরো ব্যাপারটাই আসলে জাল বা ভুয়া। দুনিয়া জুড়ে শুরু হলো হৈ হৈ কান্ড। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ তখন ভয়ে ভয়ে পরীক্ষকদের হাতে তুলে দিলো বাকী খন্ডগুলোও। তাতেও ফলাফল একই। চারদিক তোলপাড় করে পুলিশ ধরে ফেললো কুজোকে। আর কুজো সাহেবও তাদের জেরার মুখে সব স্বীকার করে বসলো জালিয়াতির কাহিনি।
তারপরের ইতিহাস আদালতের দরজায়। হেইডম্যান আর কুজো চালান হলো সোজা জেলখানায়। চার বছর করে জেল হয়ে গেলো তাদের। পত্রিকার দুজন বার্তা সম্পাদক হলেন অপসারিত। আর এভাবেই পর্দা নামলো বিশ্বের আলোচিত এক জালিয়াতির কাহিনির ওপর।

নয়ন চৌধুরী
তথ্য ও ছবিঃ ইন্টারনেট

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com