ধর্ষণ একটি অসামাজিক প্রপঞ্চ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আঞ্জুমান রোজী,কানাডা থেকে

জীব বিজ্ঞানীদের মতে, প্রাণী জগতের বাইরে অন্যকোন প্রানীর মধ্যে ধর্ষণ নেই। এটি আছে কেবল মানুষের মধ্যে এবং অনেক আগে থেকেই মানব সমাজে নারীকে পুরুষ জোরপূর্বক ধর্ষণ করে আসছে। যদিও যৌনতা একটি প্রাকৃতিক রসায়ন কিন্তু ধর্ষণ একটি অসামাজিক প্রপঞ্চ। এই ধারণাটির জন্ম সমাজ দিয়েছে। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে জৈবিক ক্ষুধার রূপচিত্রটাই এমন। জৈবিকক্ষুধা মেটাতে গিয়ে অনেকে ধর্ষক বনে যাচ্ছে, অবলীলায় হচ্ছে ধর্ষণকার্য। অনেকটাই  যেনো ক্ষমতায়নের খেলা। কারণ,ধর্ষক ক্ষমতা, ক্রোধ এবং যৌনতার অধিকারী। ক্ষমতার অপব্যবহারে পুরুষ নারীকে ভোগ্যপণ্যে রূপান্তরিত করে। তারই হাত ধরে ধর্ষণের লালসা চেপে বসে। যার চিত্র আমরা অহরহ দেখতে পাই। তাই ধর্ষণ এখন  সামাজিক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত।

বাংলাদেশের সমাজ নারীপুরুষের স্বভাবচরিত্রের যে আদর্শ তৈরি করে রেখেছে তার মধ্যেই ধর্ষণের বীজ রোপিত। সমাজ নারীকে নিষ্ক্রিয় ও নাজুকভাবে তুলে ধরে বলেই ধর্ষণের মাধ্যমে আগ্রাসী পুরুষ দ্বারা আক্রান্ত হয়। নারীকে তিনভাবে  নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়। প্রথমত, মজ্জাগত নিষ্ক্রিয়তা যেটাকে  অনেকে প্রকৃতি প্রদত্ত বা জন্মগত নিষ্ক্রিয় বলে থাকেন। সমাজে নারীর বৈশিষ্ট্যগুলো এমন যে, একজন মানুষের বৈচিত্রহীন একঘেয়ে কার্যকলাপ আর সিদ্ধান্ত নিতে না পারার নিঃশব্দ জীবন দেখতে পাই। দ্বিতীয়ত. নিষ্ক্রিয় নারীকে সমাজ কাজ করতে দেখে ঠিকই কিন্তু সেই কাজকে পুরুষের সহযোগি বা সহকারি বা অধিনস্ত হিসেবে দেখা হয়। তৃতীয়য়ত সমাজের মন গড়া নিষ্ক্রিয়তা। এর মানে নারীটি যাই করুক বা বলুক না কেন  সেই কাজকে ধর্তব্যের মধ্যে না আনা। সত্যিকার অর্থে রক্তমাংসের নারীর আচরণ, ব্যক্তিত্ব ও কার্যকলাপের সাথে এই তিন ধরনের নিষ্ক্রিয়তার মিল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নেই কিন্তু ভয়ংকর ব্যপার হলো এই তিন ধরনের নিষ্ক্রিয়তা দিয়ে নারীর সত্যিকার কার্যকলাপকে ঢেকে ফেলা হয় সমাজের তথাকথিত অন্ধকারাচ্ছন্ন কুসংস্কার দিয়ে। এই নিষ্ক্রিয়তার ধারণার কারণেই একজন পুরুষ রাস্তায় চলতে চলতে নারীর প্রতি মন্তব্য ছুঁড়ে দেয় কিংবা শরীর ম্পর্শ করে। সেই একই দৃষ্টিভঙ্গীতে পুরুষেরা পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রনে রাখতে ধর্ষণের ইচ্ছা পোষণ করে বা ধর্ষণ করে। আর বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থা সেই ইচ্ছাকে উৎসাহিত করার কিংবা কার্যকর করার জন্য একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র। শুধু ধর্ষণই নয় দূর্বল ও সুবিধা বঞ্চিতদের শোষণ নিপীড়ন থেকে রক্ষা করতেও এই সমাজ ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয় কোন উপায় নেই। উপরন্তু সামাজিকীকরণের দ্বারা যাবতীয় বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখার প্রক্রিয়া চলে। যার কারণে, নারী ও পুরুষের সম্পর্কের যে বৈষম্য  সমাজ তৈরি করেছে সে হিসেবে ধর্ষণ খুব স্বাভাবিক ঘটনা।

কানাডাকে সেক্স ফ্রী কান্ট্রি বলা হয়। কথাটা শুনলে মনে হবে, কানাডাতে বোধ হয় যত্রতত্র যৌনকর্ম হয়। বাংলাদেশে যাওয়ার পর বেশ কয়েকবার এমন কৌতূহলী প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল এবং তা অনেকসময় বিব্রতকর প্রশ্নও ছিল। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের মানুষগুলোর মানসিকতাই এমন যে, বিষয়টাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে কষ্ট হয়। আসলে বিষয়টা কী? বিষয়টা খুবই সহজ। প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী একটি ছেলে একটি মেয়ের কাছে যাবে , তারপর যা হবার তাই হবে।তবে অবশ্যই দুজনের সমান সম্মতিতে ঘটনা ঘটবে। কিন্তু ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি ছেলে যেমন একটি মেয়ের কাছে যেতে পারে না তেমনই একটি মেয়েও একটি ছেলের কাছে যেতে পারে না। এর জন্য কঠোর আইন বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সেক্স তো দূরে থাক কোনরকম টিজও করতে পারবে না। এই দেশে আইন কথা বলে। ধর্ষণ যে একেবারে হয়না তা বলা যাবে না, তবে ধরা পড়লে ধর্ষককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়।

কানাডাতে বিনোদনের অনেকরকম ব্যবস্থা আছে। শারিরিক, মানসিক যে যেভাবে আনন্দ কুড়াতে চায় বা রিলাক্স করতে চায়, তার সবরকম ব্যবস্থাই আছে। পেটের ক্ষুধার মতোই মানুষের জৈবিক ক্ষুধা। কেউ নিবারণ করে যত্রতত্র নিজেকে ব্যবহার করে আবার কেউ সংযম ও সংবরণের মাধ্যমে জীবনপাড়ি দিয়ে। একেবারে মনের মিল নাহলে কেউ কারোর কাছেই ঘেঁষেনা। তবে যত্রতত্র ব্যাবহারকারীদের জন্য কঠোর আইন বেঁধে দেয়া হয়েছে। সীমা কেউ অতিক্রম করতে পারে না। কিন্তু এটা মানতেই হবে যে, জৈবিক ক্ষুধা মৌলিক চাহিদার মতোই, যা পুরোটাই প্রাকৃতিক। প্রকৃতির মতোই শরীরের অনুভূতির উত্থান পতন হয়।এটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, মানুষের জৈবিকতাড়না প্রকৃতির চাহিদার মতোই। কিন্তু বাংলাদেশে সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। ধর্মীয় বেড়াজাল আর অন্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাস দিয়ে মানুষকে প্রকৃতির ক্রীড়নক করে রেখেছে। আর তাতেই আজ প্রকৃতিও বৈরিভাব দেখাচ্ছে। অন্যদিকে বিকৃত রুচি, নীতি-আদর্শ এবং সুস্থধারার শিক্ষাবর্জিত মানুষ ধর্ষকের রূপ নিতে পারে অর্থাৎ যাদের নিজেদের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না, এদের চিকিৎসা বা কাউন্সিলিং করে সুস্থ করা যায় বা তাদের সমস্যার সমাধান দেওয়া হয় বটে, তবে  এধরণের সমস্যা সাময়িক। কিন্তু অসুস্থ এবং নোংরা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রথাগত কারণে যে ধর্ষকের সৃষ্টি তার নির্মূল এতো সহজে সম্ভব নয়।

কানাডা্র স্কুলে সেই শুরু থেকেই শিশুদের মানুষের মৌলিক বিষয়গুলো বেশ ভালো করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এমনভাবে বিষয়গুলো  তাদের মেধা ও মননে  ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে, পরবর্তীতে বাস্তবজীবনে এসবের প্রতি আর কোনো আকর্ষণবোধ কাজ করে না। যারফলে ছেলেমেয়ে একসাথে গায়ে-গায়ে লেগে সমানতালে কাজ করে যাচ্ছে, নাহলে এদেশ নারীপুরুষের সমঅধিকারের দেশ হবে কেন!? বিষয়টা পুরোটাই মানবিক, মানবতার খাতিরে মানুষকে সবকিছুর উর্ধে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করা এবং তার চাহিদার প্রতি বিশেষদৃষ্টি রাখা কানাডা সরকারের মুখ্য উদ্দেশ্য। তাই সমঅধিকার রক্ষার জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ থাকে বলে আইনের প্রতি সকলের সমান শ্রদ্ধাও থাকে।

বাংলাদেশে ধর্ষণ প্রতিরোধের জন্য কঠিন কোনো আইন নেই আর থাকলেও তার শক্ত প্রয়োগ নেই। ধর্ষণকে উৎপাটনের  কোনো প্রচেষ্টাও নেই। আধুনিক কোন সমাজে ধর্ষণ শূন্যতে পৌঁছে যায়নি। তবে তাকে কমিয়ে রাখার জন্য সামাজিক কঠিন দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্যোগ খুব জোরালোভাবে আছে। ধর্ষণ প্রতিরোধের জন্য দরকার সামাজিক আন্দোলন। এই আন্দোলন  নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের আন্দোলন। এটি কোন উন্নয়নের এজেন্ডা নয়। এটি মূলত নারীর নিজের শরীরের উপর তার নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখার আন্দোলন। তার শরীর একান্তই তার নিজের। তার সন্তান জন্ম দান থেকে, যৌন সম্পর্ক সবকিছু এই আন্দোলনের বিষয়। সেই সাথে যে কোন নারী ধর্ষণ হলে তার জন্য সর্বস্তরের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। এটি যতটা না আন্দোলন তার চেয়ে বেশি নারীর শরীরকে যৌনতার বাইরে মানুষের শরীর হিসেবে প্রতিষ্ঠার একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ধর্ষকদের প্রতি সকল প্রকার সামাজিক সহমর্মিতা দেখানো বন্ধ করতে হবে। তার বিচারের কার্যকর পন্থা বলবৎ রাখতে হবে। এটি করা গেলে নারীর উপর ধর্ষণ  কমানো যাবে। আইন কোন সময়ই কোন সমস্যাকে নির্মূল করতে পারে না, কিন্তু এটি সমস্যাকে কমিয়ে রাখতে সহায়ক। সেজন্য ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইন খুব জরুরী। তারপরেও আরো একটি কথা না বললেই নয়, নারী প্রকৃতির সৌন্দর্যের একটি অংশ। এই সৌন্দর্য নারীর নিজেকেই ধরে রাখতে হবে। সময়, পরিবেশ এবং মানুষ বোঝে নারীর নিজেকেই তার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা জানতে হবে।

সবশেষে সঠিক যৌন ধারণা ও যৌনশিক্ষা প্রচলন করা। শিক্ষা ও বিনোদনমূলক ব্যবস্থার ভিতর দিয়ে যৌনতাকে ক্রমান্বয়ে শিশুদেরকে বুঝিয়ে দেওয়া। ধর্ষণের ধারণা কোন মানবিক ধারণা নয়। এটি একটি সামাজিক ব্যাধি যা রাজনৈতিক, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে ঘটে। তাই বাংলাদেশের সামাজিক ও মানবিক শিক্ষায়   যৌন ধারণা ও শিক্ষা লাভের প্রথাগত খোলনলচে পালটে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে ।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com