ধর্ষণঃ না বলি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ধর্ষণ কি আমাদের সমাজে প্রতিদিন ভোরে উঠে চা খাওয়া, গান শোনা, অফিসে যাওয়া, বাজারে যাওয়ার মতো খুব সহজ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অন্তর্গত হয়ে উঠলো? রাজধানীর বনানী এলাকার এক হোটেলে দুই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া যুবতী  ধর্ষিতা হলেন, গাজিপুরে বাবা মেয়ের ধর্ষণের লজ্জা ও যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মেয়েকে নিয়েই ঝাঁপ দিলেন চলন্ত ট্রেনের নীচে, ঢাকার জুরাইন এলাকায় ১১ বছরের এক কন্যা রাতভর ধর্ষিত হলো এক স্কুল কক্ষে আটক থেকে…এরকম আরো, আরো ঘটনা হয়তো রয়েই গেল আমাদের দেখার আড়ালে, জানার বাইরে।  আমরা কোন পথে হাঁটছি? আমাদের সন্তানরা কোন অন্ধকারে ভেসে যাচ্ছে? কোন সভ্য সমাজের অংশ হিসেবে নিজেদের দাবি করছি? অমানবিকতা আর নির্বিকারত্বের মুখোশ পড়ে প্রতিদিন অভিনয় করে যাচ্ছি?
নারীর ওপর এই নির্যাতনের তীব্র প্রতিবাদ জানাই আমরা, যতো দূর্বলই হোক না কেন নিজেদের মতো করে প্রতিবাদ সংগঠিত করি। নারীর উত্থানকে রুখে দিতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই ভয়ানক অপরাধমূলক কর্মকান্ডকে তীব্র কন্ঠে না বলি। এই ‘না’ টুকু বলার অধিকার তো আমাদের আছে যতক্ষণ না কন্ঠরোধ করা হয়। কারণ সমাজের মধ্যে কালোটাকা আইনকে, আইনের প্রয়োগকেও কিনে নেয়ার স্বদম্ভ ঘোষণা দিচ্ছে। ক্ষমতার দাপট অন্যায়ের পক্ষাবলোম্বন করছে।
এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন ধর্ষণের বিরুদ্ধে। চারপাশে গত কিছুদিনে নারীর ওপর নির্যাতনের ঘটনার বিরুদ্ধে। কথা বলেছেন, প্রতিবাদ জানিয়েছেন অভিনয় শিল্পী ও সঙ্গীত শিল্পী শম্পা রেজা, লেখক আঞ্জুমান রোজী, মানবাধিকার কর্মী কাশফিয়া ফিরোজ, ফেরদৌস আর রুমী ও  লেখক শামীমা জামান।

শম্পা রেজা
আমার কাছে মনে হয় পুরুষের এই হীন আচরণের পেছনে যে মূল সংকট তার কারণ উপযুক্ত শিক্ষা। ছেলেদের মানসিক গঠন কেমন হবে সেটা নির্ভর করে পরিবারের ওপর। আর এজন্য পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজন যথাযথ শিক্ষা। আজকাল আমাদের সমাজে নতুন বিত্তের তোড়ে সন্তান বিশেষ করে পুত্র সন্তান ভিন্ন মানসিকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। অর্থের দাপট ক্ষমতাকে হাতের পুতুল বলে মনে করছে। আর এই গোটা ঘটনাটা ঘটছে বাবা-মায়েদের অশিক্ষার ফলে। ধর্ষণের এই ধারাবাহিক প্রবাহকে আটকাতে হলে আমাদের নজর দিতে হবে শিক্ষার দিকে।
বাংলাদেশে এখন মেয়েরা ঘরের বাইরে এসে কাজ করছে, লেখাপড়া করছে। মেয়েদের আবার ঘরের ভেতরে, অবগুন্ঠনের আড়ালে ঠেলে দেয়ার চক্রান্তের একটি অংশই এ ধরণের কাজ। মেয়েদেরকেই এ ব্যাপারে আরো সচেতন হতে হবে। তরুণীদের সচেতন হতে হবে তাদের বন্ধু নির্বাচনে, পারিপার্শ্বিক সম্পর্কে। যারা মেয়েদের আবার পেছনে ঠেলে দেয়ার চক্রান্ত করছে তাদের হাতে সুযোগ তুলে দেয়া যাবে না কিছুতেই।

আঞ্জুমান রোজী
ধর্ষক তিনটি বিষয়ের অধিকারী-ক্ষমতা, ক্রোধ ও যৌনতা। ক্ষমতা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় তখনই পুরুষ নারীকে ভোগ্যপণ্যে রূপান্তরিত করে। আর তারই হাত ধরে ধর্ষণের লালসা চেপে বসে। এরকম চিত্রই এখন বাংলাদেশে আমরা বারবার দেখতে পাচ্ছি। ধর্ষণ এখন এক সামাজিক ব্যধিতে রূপান্তরিত।
বাংলাদেশের সমাজ নারীকে নিষ্ক্রিয় ও নাজুকভাবে উপস্থাপন করতে চায় বলেই মেয়েরা ধর্ষণের মাধ্যমে আগ্রাসী পুরুষের লালসার শিকারে পরিণত হয়।
এই সমাজে পুরুষ এখন নারীকে কাজ করতে দেখে ঘরের বাইরে। কিন্তু মেয়েদের সেই কাজকে মানসিক জায়গা থেকে পুরুষের সহকারী অথবা অধিনস্ত হিসেবেই দেখা হয়। এর অর্থ হচ্ছে নারী যা-ই করুক অথবা যে কোন কাজই করুক না কেনো সেটা কখনোই ধর্তব্যের মধ্যে না আনা।বলা যেতে পারে এই পুরো প্রক্রিয়াটিই সাজানো নাটক। এই নাটকের মঞ্চায়নের মধ্যে দিয়ে মেয়েদের সমস্ত কার্যকলাপকে ঢেকে ফেলা হয় অন্ধকারাচ্ছন্ন কুসংস্কার দিয়ে। এই দৃষ্টিভঙ্গীর কারণেই পুরুষ পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ধর্ষণ করতে চায় অথবা করে।
কানাডা পৃথিবীতে ‘সেক্স ফ্রি কান্ট্রি’ হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু সেখানে মানব-মানবীর জৈবিক তাড়নাকে প্রকৃতির তাড়নার মতো করে দেখা হয়। এসব বিষয়ে অগ্রসর ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাকেই অনুসরণ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তার উল্টোটাই ঘটছে। ধর্মীয় বেড়াজাল আর অন্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাস দিয়ে মানুষকে প্রকৃতির ক্রীড়নক করে রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশে ধর্ষণ প্রতিরোধের জন্য কঠিন কোনো আইন নেই আর থাকলেও তার শক্ত প্রয়োগ নেই। ধর্ষণকে উৎপাটনের  কোনো প্রচেষ্টাও নেই। আধুনিক কোন সমাজে ধর্ষণ শূন্যতে পৌঁছে যায়নি। তবে তাকে কমিয়ে রাখার জন্য সামাজিক কঠিন দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্যোগ খুব জোরালোভাবে আছে। ধর্ষণ প্রতিরোধের জন্য দরকার সামাজিক আন্দোলন। এই আন্দোলন  নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের আন্দোলন। এটি কোন উন্নয়নের এজেন্ডা নয়। এটি মূলত নারীর নিজের শরীরের উপর তার নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখার আন্দোলন। নারীর সন্তানের জন্মদান থেকে শুরু করে যৌন সম্পর্ক সবকিছুই এই আন্দোলনের অংশ। তাই যখনই ধর্ষণের কোন ঘটনা ঘটবে তখনই জরুরী হচ্ছে সমাজের সকল পর্যায়ে সামাজিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা। একইসঙ্গে আইনের কঠোর প্রয়োগও ধর্ষণকে রোখার একটি কার্যকর পন্থা এখন সারা বিশ্বে। বাংলাদেশে কঠোর আইন করা এবং সে আইনের সঠিক প্রয়োগও এখন জরুরী।

কাশফিয়া ফিরোজ
গত কয়েকদিন ধরে মিডিয়া তোলপাড় হচ্ছে রাজধানীর বনানীতে দুই তরুণীকে ধর্ষণের মামলাকে কেন্দ্র করে।ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ঝড় উঠেছে জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায়  হ্যাঁ, আমরা অপরাধীর দৃষ্টান্ত মূলক সাজা চাই।আমরা ধর্ষণের মতো বর্বরচিত যৌন সহিংসতা থেকে পরিত্রাণ চাই।ঢাকা মেডিকেলের বিছানায় শুয়ে৫ বছরের যে শিশুটি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে আমরা তার দৌড়ে বেড়ানো বিকেলগুলো ফিরে পেতে চাই।গ্লানি আর অপমানের বোঝা মাথায় নিয়ে যে মেয়েটি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে আমরা তার জন্য ন্যায় বিচার উপহার দিতে চাই।
তবে? কোথায় সেই বাঁধা? কোথায় সেই ন্যায়-বিচার?
দেশে আইন আছে, আছে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা।আর আছে খুঁটির জোর।ক্ষমতার দাপটে আইনকে অন্ধ করে দেয়ার শক্তি। মাঝে মাঝে নিজেকেই প্রশ্ন করি, শক্তি কি তবে রাস্ট্র যন্ত্রের চাইতেও শক্তিশালী? তবে কি সকল অপরাধীই প্রভাবশালী? কি শহর কি গ্রাম, সকল ক্ষেত্রেই দুঃস্কৃতিকারী ক্ষমতাবান।আর সব ধর্ষণের ঘটনারই আছে বাঁধা ছক। ধর্ষণের ঘটনা ঘটবে, লোক-লজ্জার ভয়ে নির্যাতিতার পরিবার মুখ লুকিয়ে থাকবে, অপরাধীর স্বজনরা ভয়ভীতি প্রর্দশন করবে।অতঃপর মামলা (হতেও পারে নাও পারে) ।মামলা হলে ক্ষমতার চাপে তা অচিরেই প্রত্যাহার হবে কিংবা জামিনে মুক্তি পেয়ে বীর দর্পে সেই ঘৃণ্য মানুষগুলোর প্রত্যাবর্তন। আর কোন কোন ক্ষেত্রে এই মানসিক চাপ নিতে না পেরে সারভাইভার  না-ফেরার দেশে চলে যাওয়াকে শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত হিসেবে বেছে নেয়া।তবে এতো কিছুর পরও আমরা হাল ছাড়িনি।আমরা প্রতিবাদে মুখর।
আমরা বিচার চাই, ন্যায়-বিচার।আমরা চাই দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি, আইনের কঠোর প্রয়োগ।আমাদের সামনে একমাত্র আশার কথা, মেয়েরা এই নির্যাতন আর ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙ্গে প্রতিবাদ করছে। অকপটে তাদের ওপর নির্যাতনের কথা জানাতে পারছে। মেয়েদের এই প্রতিবাদই একদিন হয়তো দুঃসময়, এই অন্ধকারকে সরিয়ে ফেরাবে আলোকরেখা।

ফেরদৌস আরা রুমী
রাজধানীর বনানীতে ধর্ষণের ঘটনার পর অনেকেই মন্তব্য করছেন, ‘এটা সম্পূর্ণই মেয়েদের দায়। ভালো মেয়েরা এতো রাতে বাড়ির বাইরে যায় না।’ ভালো মেয়ে আর মন্দ মেয়ে এই বিতর্কের বাইরে গিয়ে যদি পাল্টা প্রশ্ন করা যায়, ‘তাহলে তনু নামে যে মেয়েটি কয়েক বছর আগে ধর্ষিত হয়ে খুন হয়েছিল সে তো দিনের বেলা্য় পুরুষের অন্ধ লালসার শিকার হয়েছিল। এখানে দূর থেকে মন্তব্য করা মানুষেরা কী বলবেন?আজকের বাংলাদেশে কি দিনের বেলা, কোন হোটেলের বন্ধ কক্ষের বাইরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে না? যারা এ ধরণের মন্তব্য যারা করেন তারা আসলে ধর্ষকেরপক্ষেই কথা বলেন। তারা পরোক্ষে নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথাই বলেন।
যতদিন পর্যন্ত নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথা বলা হবে, এ ধরণের পাশবিক ঘটনায় তাদের ওপর দোষারোপ করা হবে ততদিন এ দেশে কোন ধর্ষণের বিচার করাই সম্ভব হবে না। ধর্ষকরাও এভাবে বিত্ত আর ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আইনকে, সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করেই যাবে।

শামীমা জামান
ভারত নাকি ধর্ষণের স্বর্গরাজ্য।তাহলে আমাদের দেশ কি? নিয়মিত ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে যে সবার সবকিছু গা-সওয়া হয়ে গেছে ।খুব অবাক লাগে যখন দেখি এইসব বিষয় নিয়ে আমাদের নারী প্রধানমন্ত্রী,বিরোধীদলীয় নেত্রী সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নারী মন্ত্রীরাও চুপ থাকেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই টাকা আর ক্ষমতা দিয়ে সত্য ঢেকে ফেলা হচ্ছে। ভিকটিম এর প্রতিই পুরুষতন্ত্রের তর্জনী কুৎসিত ভাবে দাঁড়িয়ে যায় তার বেপরোয়া লিঙ্গের মতই। মানুষের নৈতিকতা আর মুল্যবোধের অভাব থাকলেও ব্রেকিং নিউজের তো অভাব নেই দেশে। তাই দিন শেষে ধর্ষক নিস্পাপ হয়ে ঘুরে বেড়ায় মুক্ত বাতাসে। তারপর নতুন কোন ইস্যু নিয়ে আবার সরব হয় মানুষ। এ অবস্থার পরিবর্তন হওয়া দরকার। পুলিশ আর সাংবাদিকদের সততার অভাব-ই অপরাধীর মুল শক্তি। ক্ষমতাসীন পরিবারগুলোতে ক্ষমতার চর্চার সাথে অহংকারটা এত তীব্র ভাবে সন্তানদের মাঝে বিরাজ করে যে ঐ অহংকার দিয়েই সে ধরা কে তারা সরা জ্ঞান করে ।শুধু ভিকটিম মেয়েটি কেন পুরো দুনিয়াই যেন এদের হাতের মুঠোয়।

স্বাগতা জাহ্নবী
প্রচ্ছদ ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com