দেয়ালের গল্প অনেক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

দেয়ালের গল্প থাকে অনেক। দেয়ালের গায়ে লেগে থাকে টপকানোর ইতিহাস, লেগে থাকে দুপুরের রোদ, পুরনো দেয়ালে থাকে শ্যাওলা বন্ধুর মতো। ভাঙ্গা দেয়ালে আজো পা ঝুলিয়ে গল্প করে কয়েকটা ছায়ামূর্তি। কেউ হাওয়ার ওপর হাত রেখে ঠিক হেঁটে যায় দেয়ালের সরু রেখার ওপর দিয়ে। দেয়াল মানেই ঘর পালানো গন্ধ ভাসে শরীরে আমার। দেয়াল মানেই বৃষ্টি-ধোয়া রাতে চোর পালায়, কোনদিন পাখি বসে, উড়ে আসে ভোরবেলা খবর-কাগজ।

কিশোর বয়সে যে বাড়িতে থাকতাম সেখানে উঠান ঘিরে দেয়াল ছিল। দেয়ালের গায়ে ছিল পুরনো কাঠের এক দরজা, যা খুলতো না। বাড়িতে ঢোকার ছিল অন্য পথ। কিন্তু বেশীরভাগ সময় আমি দেয়াল টপকে বাড়ির ভেতরে ঢুকতাম। অকারণেই ঢুকতাম। দেয়াল টপকানোর মাঝেই এক অপার আনন্দ ছিল যা এখন আর বলে বোঝানো যাবে না। আজকাল এই শহরে ফ্ল্যাটের সংস্কৃতি মুছে দিয়েছে সেইসব পুরনো দেয়াল অথবা পাঁচিল।এই সময়ের কিশোর অথবা তরুণদের কাছে ভীষণ অপরিচিত দেয়াল অথবা দেয়াল টপকানো।

ছোটবেলায় নানা কারণে দেয়াল টপকানো ব্যাপারটা শিখে ফেলেছিলাম। এই বিদ্যা দ্রুত আয়ত্বে আনার পেছনে প্রধান কারণ ছিল প্রতিবেশীদের গাছের ফল চুরি করা।কতদিন যে নিঃশব্দ দুপুর অথবা গভীর সুপ্তির রাতে সেইসব দেয়াল টপকে বন্ধুদের সঙ্গে ঢুকে পড়েছি অন্যের বাড়ির উঠানে! তারপর সবাই মিলে পেয়ারা গাছ, নারকেল গাছ, জাম গাছ সাবাড় করে দেয়া।তখন আমাদের পাড়ায় বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করার সবচাইতে আদর্শ জায়গা ছিল দেয়াল। আর সেটা যদি ভাঙ্গা দেয়াল হতো তাহলে তো কোন কথাই নেই। আমাদের গলিটাতে আমিন নামে এক ঘুঘু প্রকতৃতির লোক মুদি দোকান করতো। আমিনের দোকানের পাশেই ছিল অসমাপ্ত এক দেয়াল। পাড়ায় আমাদের আড্ডার জন্য চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল সেই দেয়াল। কী সকাল কী বিকেল, চলতো আমাদের পা ঝুলিয়ে আড্ডা ঘন্টার পর ঘন্টা।শান্তিনগর মোড়ে আমার তরুণবেলায় একটাই ব্যাংক ছিল। সেই ব্যাংকের নিচু দেয়ালটাও বহু বছর আমাদের আড্ডার সাক্ষী। এখন শান্তিনগরের মোড়ে সেই দেয়াল আর ব্যাংক দুটোই লোপাট। বদলে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বহতল এক ভবন। তবুও আমার মনের মধ্যে এক অদৃশ্য পর্দার ওপর সেইসব ছায়ামূর্তিদের দেখতে পাই। মনে হয় তারা আজো পা ঝুলিয়ে দেয়ালে বসে আড্ডা দিচ্ছে।

একটা খেলা ছিল এক সময়ে-টিলো এক্সপ্রেস। খেলার নিয়ম ছিল একজনকে রেখে সবাইকে পালাতে হবে। যে থেকে যাবে তার দায়িত্ব হবে সবাইকে খুঁজে বের করা। এই খেলাটিচর নাম কেন টিলো-এক্সপ্রেস সে সম্পর্কে আমার কোনকিছু জানা নেই। কিন্তু শৈশবে তুমুল প্রিয় এই খেলায় অংশ নিতে দেয়াল টপকানোতে তুখোড় হতে হতো। খেলাটা খেলতে গিয়ে পাড়ার এমন কোন বাড়ি ছিলো না যেটার দেয়াল, কার্ণিশ আর গাড়িবারান্দা অতিক্রম করতে হয় নি আমাদের। কী বিপুল আনন্দ আর অ্যাডভেঞ্চারের হাতছানি ছিল সেই খেলায়। এরকম খেলা এখন আর এই শহরে কোন কিশোরকে খেলতে শোনা যায় না। তারা দেয়াল টপকাতেও জানে না।

বহুকাল আগে কোন এক বৃষ্টির রাতে ঘুম ভেঙ্গে উঠে ঘর লাগোয়া বারান্দায় এসে গ্রীলের বাইরে তাকিয়ে দেখি সামনের বাগানে তুমুল বৃষ্টিতে কোকভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক চোর। হাতে ছোট্ট একটা পুটলি। তার সারা শরীরে পরিধেয় বলতে একটি হাফপ্যান্ট। দুজনের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় হলো কয়েক মুহূর্তের জন্য। তার সেই বৃষ্টির রাতে লোকটি বাগানের দেয়াল টপকে পালিয়ে গেলো। আমি চীৎকার করিনি। বোকার মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম। আজ সেই অজ্ঞাত মানুষটির কথা ভাবলে মন খারাপ হয়ে যায়। মন খারাপ হয় বৃষ্টির রাতে তার দেয়াল টপকানোর ক্লান্ত ভঙ্গীটির কথা মনে পড়লে। তখন পাড়ায় চোর আসতো দেয়াল টপকে। অনেক বাড়িতে চোরের ভয়ে দেয়ালের ওপর লাগিয়ে রাখা হতো ভাঙ্গা কাচের ধারালো টুকরো অথবা কাঁটাতার।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে খনিকটা যুক্ত ছিলাম ছাত্র রাজনীতি আর সাংবাদিকতার সঙ্গে। পুলিশের তাড়া খেতে হয়েছে নানা কারণে। আশির দশকে ছাত্র আন্দোলনের সময় অনেকবার তাড়া খেযে দেয়াল টপকে পালিয়েছি। এখন সেসব দেয়াল দেখলে অবাক লাগে। কীভাবে টপকে গিয়েছিলাম এইসব উঁচু দেয়াল! সেরকম একটি দেয়াল এখনকার আজিজ সুপার মার্কেটের ঠিক উল্টোদিকের দেয়ালটা কী আজও আমার পুলিশের তাড়া খেয়ে পালানোর গল্প মনে রেখেছে? মনে রেখেছে এক সময়ের হকি স্টেডিয়াম? বন্ধুর টিমের হকি খেলা দেখতে গিয়ে তাড়া খেয়ে টপকেছিলাম উঁচু এক দেয়াল। পায়ে ব্যথা পেয়েছিলাম ভীষণ। প্রতিপক্ষের হকিস্টিকের আঘাতে মাথা ফেটেছিল আরেক বন্ধুর।

কৈশোর আর যৌবনের দেয়ালগুলো হয়তো আমাদের টপকে যেতে শিখিয়েছিল বাঁধা। শিখতে পেরেছি কি না কে জানে? তবে এবারকার মতো দেয়ালের গল্প ফুরিয়ে গেলো। এই শহরে এখন আর সেরকম ভাঙ্গা দেয়াল, শ্যাওলায় মোড়ানো দেয়াল নেই, নেই দেয়াল টপকে সেই খেলার প্রহন। এখন নতুন জীবন, নতুন সময় আর বদলে যাওয়া জীবনের দর্শন। তার মাঝে কী প্রয়োজন দেয়াল টপকানোর?

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com