দিল্লী থেকে মানালি, বড্ড বেশি জ্বালালি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

উরুসওয়াতি হিমালয়ান ফোক আর্ট ম্যুজিয়াম

তওহিদ মাহমুদ হোসেন

দশ.

মানালিতে গিয়ে শুধুমাত্র একটা জায়গাতে গেলেই চলবে। সেটা হলো নগর ক্যাসেল এবং এর কাছাকাছি উরুসওয়াতি ম্যুজিয়াম। আপনার যদি একটামাত্র জায়গা দেখার অপশন থাকে তাহলে আমি বলবো, লিভ এভ্রিথিং এলস্। শুধুমাত্র এই জায়গাটায় যান। আমাকে ধন্যবাদ দেবেনই দেবেন।

মানালি বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ২২ কিমি দূরে এই নগর নামের জায়গাটা। এখানে একটা ক্যাসেল আছে যেটা আসলে হোটেলে রূপান্তর করা হয়েছে। ক্যাসেলটা নিয়ে কিছু বলতে পারছি না কারণ সেখানে আমাদের থামা হয় নি। কিন্তু আমি যে জায়গাটায় প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম, সেই উরুসওয়াতি ফোক আর্ট ম্যুজিয়াম ক্যাসেল ছাড়িয়ে আরও দূরে এবং একটা পাহাড়ের ওপরে।

কেন আপনি এখানে যাবেন-ই সেটা বলার আগে চলুন সামান্য একটু হোমওয়ার্ক করে ফেলি। জর্জ নিকোলাস রোরিচ নামের এক ক্ষণজন্মা বহুমুখী প্রতিভাধর রাশানের স্ত্রী হেলেনা রোরিচ ১৯২৮ সালে এখানে একটা রিসার্চ ইন্সটিটিউট স্থাপন করেন যার উদ্দেশ্য ছিল ট্র‍্যাডিশন্যাল ভারতীয় ও তিব্বতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা এবং হিমালয়ের ওষধি গাছগাছড়া নিয়ে গবেষণা করা। ১৯৯৩ তে এর নাম উরুসওয়াতি ফোক আর্ট ম্যুজিয়ামে রূপান্তর করা হয়। উরুসওয়াতি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ ‘শুকতারার আলো’। এখানে পাশাপাশি দুটো ভবনের একটা হলো ‘রোরিচ গ্যালারি’ আর আরেকটা ওই ম্যুজিয়াম।

নগর ক্যাসেল ছাড়িয়ে আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথ বেয়ে আমাদের ইনোভা চলছে। স্নিগ্ধতা মেখে আছে চারপাশে। একটু ঝিমুনি মতন এসেছিলো। হঠাৎ হালকা ঝাঁকিতে জেগে উঠে নিজেদের আবিষ্কার করলাম অসম্ভব শান্ত, নিরিবিলি একটা স্থানে। গাড়ি যেখানে থেমেছে সেটা ছোট্ট মতন একটা পার্কিং। পাশেই বিশাল এক গাছ তার জটাবুড়ির মত শেকড় এলিয়ে রেখেছে। উল্টো দিকে একটা লোহার গ্রিলের গেইট। দু’ধাপ সিঁড়ি দেখতে পেলাম। দরজাটা ঠেলে পা রাখলাম সিঁড়িতে।

এইখানে আপনি চোখটা একটু বন্ধ করুন আর মনের আয়নাটায় ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করুন যে আপনি এখন সেই জায়গাটায় আছেন যেটার কথা আমি বলবো।

এঁকে বেঁকে একটা ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন পথ ধাপ বেয়ে যেন উঠে গিয়েছে পাহাড়টায়। বড় বড় গাছ দু’পাশে; কিন্তু তারা বিকেলের সূর্যকে মোটেও আড়াল করেনি। বরং চিরল চিরল পাতার ফাঁক দিয়ে সুয্যিমামাকে জায়গা করে দিয়েছে যেন হিমকাতুরে ভ্রমনকারী তাকে মেখে নিতে পারে সারা গায়ে। একটু উষ্ণতার জন্য আপনার বসতে ইচ্ছে হতেই পারে। বসে পড়ুন। প্রায় রূপকথার মত সাজানো বেঞ্চগুলো।

পথটার জায়গায় জায়গায় ঝোপ। সেগুলো আবার অচেনা বুনো ফুলে ছেয়ে আছে। সেগুলোরি পাশটিতে ওই পাথর অথবা কংক্রিটের বেঞ্চ। দু’দন্ড জিরোবার জন্য আর সেই সঙ্গে প্রকৃতির অকৃপণ হাতে সাজানো এই অপরূপ সৌন্দর্যকে প্রাণভরে উপভোগ করার জন্য। আমরা ধীরে ধীরে উঠছিলাম আর নিস্তব্ধতার মধ্যে অচেনা পাহাড়ি পাখির ডাক যেন ডলবি সারাউন্ড সাউন্ড। এ এক অব্যক্ত, মেসমারাইজিং নিস্তব্ধতা; যেন পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে পথের ঢালাইয়ে, গাছের পাতায়, বুনো ফুলের গব্ধে, পাখির টুকরো টুকরো গানে। পথের একপাশে পাহাড় আর অন্যপাশটা হঠাৎ করেই নেমে গিয়েছে অনেকটা।সেই  অনেক নিচেই আপনি পরিষ্কার দেখতে পাবেন আঁকা ছবির মতো রঙিন বাংলোগুলো সাজিয়ে রেখেছে। পারফেক্টই বলেন আর ইউটোপিয়ানই বলেন, আমার মনে হলো এ এক অবারিত শান্তির আস্তানা।

একদম ওপরে দুটো ভবন – পাশাপাশি। পঞ্চাশ রুপির টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। একটা হলো রোরিচ গ্যালারি। আরেকটা উরুসোয়াতি ফোক আর্ট ম্যুজিয়াম। ছোট্ট দোতলা বাড়ি। আসলে এটা রোরিচ পরিবারের বাসস্থান এবং সংগ্রহশালা ছিলো। বাংলো ধাঁচের বাড়িটা। দেখতে আধঘন্টাটাক লাগবে বড় জোর। যদিও এটাই মূল স্থাপনা কিন্তু আমি আপনাকে নিয়ে যাব একটু অন্য পাশে। রোরিচ গ্যালারির পিছনে পরিচ্ছন্ন একটুকরো ঘাস জমি। ওপাশটায় খাদ। তারই গা বেয়ে সরু একটা পায়ে হাঁটা পথ গাছপালার আড়াল নিয়ে নেমে যে কোথায় গেলো, ঠাহর করতে পারলাম না। এখানে ছবি তুলবেন কিন্তু। তোলা হলে চলে আসুন ম্যুজিয়ামের ডানদিকের চত্বরে। বিশাল গাছগুলোর নিচে একটা করে বেঞ্চ। বিকেলের নরম রোদ এসে পড়েছে। আপনারা দু’জনই বসুন কিছুক্ষন, হাত ধরেই বসুন। বিশ্বাস করুন, এগুলো টাইম মেশিন। আপনাকে এক মুহূর্তে প্রথম প্রেমের দিনগুলোতে নিয়ে যাবেই যাবে। প্রিয় বন্ধুটার উষ্ণতার সান্নিধ্য উপভোগ করার জন্য এর থেকে আদর্শ জায়গা আর হতেই পারে না।

এতক্ষনে আমায় বিরাট রোম্যান্টিক প্রকৃতিপ্রেমী ভাবছেন  নিশ্চয়ই। আমি সেটা নই। তবে প্রকৃতির নির্জনতার মধ্যে আমি বুঁদ হয়ে যাই। আফসোস হচ্ছে জানেন, আমি ঠিকমতো লিখতে পারলাম না। কিন্তু এই রুদ্ধশ্বাস সৌন্দর্য আপনাকেও কবি বানিয়ে ছাড়বে।

সব সুন্দরও একসময় ছেড়ে যেতে হয়। সূর্য তার বেলাশেষের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে৷ শনশনে বাতাসে পাহাড়ে হিমভাবটা বেড়ে যাচ্ছে প্রতি মুহুর্তে। এবার নামার পালা। আমরা বিদায় জানালাম – ওই গাছটাকে, ওই বাড়িদুটোকে, ওই বিশাল পাহাড়টাকে। আপনারা যারা আসবেন আগামীতে তাদের জন্য, জায়গাটা সোমবার বন্ধ থাকে। ন’টা থেকে পাঁচটার মধ্যে ভ্রমন সমাপ্ত করুন। আর গায়ে মিঠেরোদ মেঘে স্মৃতির নোটবুকে জমিয়ে রাখুন অসাধারণ কিছু মুহূর্ত।(চলবে)

ছবি:গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com