দিল্লী থেকে মানালি বড্ড বেশি জ্বালালি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

তওহিদ মাহমুদ হোসেন

যত কান্ড ‘বশিষ্ঠ কুন্ডে’

বিয়াসের নামকরণের সঙ্গে তো বশিষ্ঠমুনির সংযোগের কথা আগেই বলেছি। তাঁর নামে এখানে মন্দির আছে। এখানে মহামতি রামেরও একটা পাথরের তৈরি মন্দির আছে। বিশ্বাস করা হয় এটি প্রায় ৪০০০ বছরের পুরোনো। জায়গাটা হিন্দু ধর্মালম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। বশিষ্ট কুন্ড হলো পাহাড়ের ফাটল বেয়ে নেমে আসা একটা উষ্ণ প্রস্রবন বা হট ওয়াটার স্প্রিং। রাজ্যের ভেজষ ওবং খনিজ সমৃদ্ধ এই গরম পানি শরীর ও ত্বকের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

এই উষ্ণ প্রস্রবনের উৎপত্তি নিয়ে যে কাহিনীটা প্রচলিত আছে সেটা হলো প্রতিদিন মহাজ্ঞানী বশিষ্ঠকে বহু দূরে হেঁটে গিয়ে স্নান করতে হতো। রামের কনিষ্ঠ ভ্রাতা লক্ষণ চান নি যে  বশিষ্ঠমুনিকে এই কষ্ট করতে হোক। কারণ লক্ষণের ভয় ছিলো যে স্নানের জন্য এতটা পথ পাড়ি দেয়ার কষ্টের জন্য মহাজ্ঞানী মুনি হয়তো এই জায়গা ছেড়ে চলেও যেতে পারেন। সুতরাং লক্ষণ বশিষ্ট মুনির স্নানের ব্যবস্থা করতে একটা তীর নিক্ষেপ করেন যার ফলশ্রুতিতে এই উষ্ণ কুন্ডের জন্ম হয়।

আগেই বলেছি এটা একটা হট ওয়াটার স্প্রিং। পাহাড়ি ভেষজ মেখে এই উত্তপ্ত জল নেমে এসেছে এক স্থানে। সেই জল স্পর্ষে সমস্ত রোগ উধাও হয়ে যায়। অন্তত আমাদের ড্রাইভার বিকাশের মতে তো অবশ্যই। আগেই আপনারা দেখেছেন, অ্যা’ম ভেরি ভার্নারবল টু হিপ্নোটিজম। এর আগে এই ড্রাইভারেরই যাদু-টোনাতেই বিকেল বেলা বিয়াসের বরফগলা জলে নিজেদের চুবিয়েছিলাম। এবার তাই বউ সতর্ক। আমার চনমনেভাব দেখে বললো, “তুমিই যাও বেইবি। কুন্ড না ভান্ড না আন্ডা – সেইটে ভাল করে দেখে এসো গে। আমি পাপীতাপী মানুষ। এই সুযোগে একচোট ঘুমিয়ে লি।”

এতবার অনুরোধ করলাম, ‘চলো না প্রিয়ে, এ দৃশ্য আর দেখবে না। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসে উষ্ণ জলধারা জমছে জলাশয়ে। চারপাশে ঘন ঝোপের আচ্ছাদন। সেইখানে তদগত প্রাণ ভক্তকূল নিঃশব্দে স্নান করে চলেছেন। এ তো তপোবন। উফ্ …! ভাবতেই গা শিউরে শিউরে উঠছে।’ কিন্তু ভবি ভুলবার নয়। তাই দু’ছেলে বগলে নিয়ে শুরু হলো আমার ডাবল মার্চ।

সরু একটা রাস্তা, এই ফুট পনের ষোল চওড়া। এর মধ্যে মানুষ এবং গাড়ি – দু’টোই টু ওয়ে চলছে। মানে চলার চেষ্টা করছে এবং প্রায়শই মুখোমুখি পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে। অবাক হলাম যে এতে কারও কোন বিকার নেই। কুন্ডের এমনই গুণ…! আমাদের গাড়ি যেখানে দাঁড়ালো সেখান থেকে কুন্ড পর্যন্ত প্রায় ২০ তলার মত উচ্চতা হবে। বহু কষ্টে (আমি মোটা মানুষ, তাই আমার দু’পা হাঁটলেই কষ্ট হয়) অবশেষে চত্বরটাতে পৌঁছালাম।

ও মা! কোথায় কুন্ড? কোথায় পাহাড়? কোথায়ই বা সেই কল্পনার তপোঃবন? এ তো মানুষের গাদি। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম কুন্ডটা কোথায়। সে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে যে ভঙ্গি করলো সেটা আরও ওপরে বোঝাতে পারে, স্বর্গ বোঝাতে পারে আবার ‘কাঁচকলা খাও’ – এ-ও বোঝাতে পারে। আমি প্রথমটাকেই ধরে নিয়ে আবার উঠলাম এক তলা। ছেলেরা দাঁত কিড়মিড় করছে অনেকক্ষন।ধরেই। শুধুমাত্র নামার সময় পানিপুরি খাওয়াবো।- এই লোভ দিয়ে আটকে রেখেছি।

কুন্ডে পৌঁছালাম।

আসলে এটা একটা হাম্মাম এর মতো, মানে গণ গোসলখানা। পুরো ব্যাপারটাই একটা চৌবাচ্চায় এনে ফেলেছে। ছেলেদের জন্য একটা আর মেয়েদের জন্য আরেকটা। সেই হট ওয়াটার পাইপে করে আসছে (কোথা থেকে খোদায় মালুম) আর পড়ছে একটা বড় চৌবাচ্চায়। পানিতে সাদা সাদা গুঁড়ি গুঁড়ি কি যেন মেশানো। সেই চৌবাচ্চায় ল্যাঙট পরা জটাধারী সাধু থেকে শুরু করে লঞ্জেরি পরা ঝুঁটিবাঁধা যুবক একসঙ্গে ‘স্কোয়ার্ট’ মারছে। মানে কোমরে হাত দিয়ে একবার ডুব দিচ্ছে আবার সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এইই রেওয়াজ।

হোয়েন ইন রোম, অ্যাক্ট লাইক রোমানস – এই আপ্তবাক্য স্মরণ করে এবং এই লেখাটা নিজ অভিজ্ঞতায় লিখবো বলে আমিও ‘কাচ্ছা’ পরে নেমে গেলাম সেই প্রায়-ফুটন্ত পানিতে। গা পুড়ে যাওয়ার মত অবস্থা হলো। রিফ্লেক্সেই একটা গোঙ্গানি বেরিয়ে এলো। শুনে একজন অভয় দিলেনঃ “দু মিনিট থাকো। আর গরম লাগবে না।” সে তো লাগবেই না। সেদ্ধ মুরগির কি গরম লাগে? দেড় মিনিটের মাথাতেই তো আমার মাংস খসে পড়বে। ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে এটা বলতেই সে সাধু আবার উপদেশ দিলেনঃ আরে, ডুব দাও। দিলাম। মনে হলো চোখদু’টো গলে বেরিয়ে গেল।

এমনিতে জায়গাটার একটা বিশেষ গন্ধ আছে। কারণ ভেজষ মিশ্রিত পানি, এর বাষ্প, আর এতগুলো মানুষের এক জায়গায় গাদাগাদি।  প্রথমে একটু নাক সিটকানো ভাব আসতে পারে। কিন্তু পাত্তা না দিয়ে নেমে পড়ুন। আর কিছু না হোক অভিজ্ঞতা তো হবে। ও হ্যাঁ, কোন চেইঞ্জ রুম দেখলাম না। হয়তো আছে কিন্তু আমি দেখিনি। এবার নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগছে, আমি কিভাবে পোষাক বদলেছিলাম। ওয়েল, সবকিছু কি জানাতেই হবে?

এত কান্ড করে খাড়া রাস্তা বেয়ে বিশ-পঁচিশ তলা উঠে ল্যাঙট পরিধান করে চৌবাচ্চায় গোসল…! এইবারে আমার সেই আগের কথাটা মিলিয়ে নিন-

যে বোঝে সে খোঁজে। যে খোঁজে সে পায়।

আর যে পায়, সে গিয়ে পরে কপাল চাপড়ায়। (চলবে)

ছবি:গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com