দিল্লী থেকে মানালি, বড্ড বেশি জ্বালালি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

তওহিদ মাহমুদ হোসেন

কুল্লুর পথে

ঠিক সোয়া আটটায় আমাদের গাড়ি স্টার্ট দিলো। গন্তব্য কুল্লু হয়ে মানালি। সিমলা থেকে মানালি ২৭০ কিমি হলেও সময় লাগে ১০ থেকে ১১ ঘন্টা। এর একটা কারণ পাহাড়ি রাস্তার স্পিড তেমন তোলা যায় না। এই চল্লিশের আশেপাশেই রাখতে হয়। আরেকটা ব্যাপার হলো কুল্লুতে স্টপওভার। এইখানে রিভার র‍্যাফটিং, প্যারাগ্লাইডিং সহ কয়েকটা ব্যাপার আছে। এদের বর্ণনা দেয়ার আগে বলি সিমলা টু কুল্লু রাস্তার কথা।

টিপিক্যাল পাহাড়ি রাস্তা যেমন হয় প্রথম প্রথম সেরকমই মনে হবে। কিন্তু সময় যত গড়াবে ততই ময়াল সাপের মত এঁকেবেঁকে উঠে যাওয়া পাকদন্ডীর এই রাস্তা (বুদ্ধদেব বসু থেকে ধার করে বললাম) আপনার দৃষ্টি ও মনোযোগ – দুটোই পুরোপুরি কেড়ে নেবেই নেবে। একপাশে খাড়া পাহাড় আর অন্যপাশে ভ্যালি। সেখানে ঘন সবুজের মাঝখানে থোকা থোকা রডেড্রেন্ডন ফুলের মত কয়েকটা করে বাংলোগুলো যেন ফুটে আছে। কত যে তাদের রঙ। ছোটবেলায় ফিজিক্সে যে রাস্তার ‘ব্যাংকিং’ পড়েছিলাম, মানে সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্স এর জন্য গাড়ি ছিটকে যাওয়া আটকাতে যে ঢাল করা থাকে রাস্তায়, সেটাতেই হেলে দুলে এগিয়ে যাওয়া। এ রাস্তায় ড্রাইভিং বেশ ভালই কঠিন। সতর্ক ড্রাইভার না হলে কি হতে পারে শিউরে ওঠার মতো তার দু’তিনটে বিভৎস নমুনা রাস্তার পাশেই পড়ে আছে।

ব্রেকফাস্টের জন্য যে জায়গাটায় থামা হলো সেটা একদম খাদের ওপরে প্রায় ঝুলন্ত অবস্থায়। সিম্পল ভেজ দোকান। এখানে সবাইই ভেজ। বাইরে আগুন জ্বলছে আর একটা কুকুর কুন্ডুলি পাকিয়ে শীত কাটাচ্ছে। আমরা অর্ডার দিলাম ‘পিয়াজ অউর হারিমির্চ কি সাথ পারাঠা অউর আলু কা পারাঠা’। বিশাল সেই পরোটা। এরপর ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা দু’হাতে ধরে ছোট্ট ছোট্ট চুমুকে শেষ করতে করতে দূরের পাহাড়ের সবুজ দেখাটার আনন্দ বোঝাবো কি করে? এসব লেখা যতটা সহজ, ভাষায় প্রকাশ করা অতটা নয়। আপনাকে আসলে ওই পরিস্থিতিতে, ওই জায়গায়, ওই ছুটির আমেজ মেখে রসিয়ে রসিয়ে এই অনুভূতিটাকে চাখতে হবে। আমার অক্ষম লেখার চেষ্টা এর ধারেকাছেও যাবে না।

সিমলা টু মানালির পথটা অনেক জায়গায় ব্ল্যাস্টিং করে বানানো বলে মনে হলো। ধারালো পাথর ঝুঁকে আছে রাস্তার ওপর। বেশি পাশে সরে গেলেই গাড়ি ঘসা খেতে পারে। এরপর আবার জায়গায় জায়গায় দেখবেন বিশাল হাজার টনের পাথর গড়িয়ে এসে খাদের আগেই আটকে গেছে। এই জায়গাওগুলো ভূমিধ্বসপ্রবণ এলাকা। বামে সালতুজ নদীর বুকে সাদা সাদা পাথরগুলো বিছিয়ে আছে। মাঝখানে ছুটে চলেছে দুরন্ত পাহাড়ি তরুণ ‘সালতুজ’ তার প্রেমিকা তন্বী ‘বিয়াসে’র সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য। বলাইবাহুল্য সালতুজ আর বিয়াস এই প্রদেশের দুটো নদী।

এই বিয়াস নামকরণের একটা সুন্দর ইতিহাস আছে। হিন্দু পুরাণের বিখ্যাত সপ্তর্ষির অন্যতম ঋষি বশিষ্ঠমুনি যখন জানতে পারেন যে তাঁর সন্তানরা বিশ্বমিত্রের হাতে নিহত হয়েছে, তখন তিনি মনের দুঃখে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে যান। কিন্তু সে নদী তাঁর মৃত্যুকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। যার জন্য এর নাম হয় ‘বিপাশা’ – অর্থ ‘শৃঙখল থেকে মুক্তি’। পরবর্তীতে বশিষ্ঠমুনি ধ্যানস্থ হয়ে দীর্ঘদিন অতিবাহিত করে নতুন জীবন শুরু করেন। এই বিপাশাই ক্রমে বিয়াসে পরিবর্তিত হয়েছে। আমাদের ভ্রমণে বশিষ্ঠমুনি আরেকবার এসেছেন – ভয়াবহভাবে। কিন্তু সেটা আরও পরে।

রাস্তাটার ওপর ধারালো দাঁত বের করে পাহাড় ঝুঁকে রয়েছে। আক্ষরিক অর্থেই আপনার মনে হবে স্বদন্ত ব্যাদান করে রয়েছে যেন কোনো প্রাগৈতিহাসিক টি-রেক্স। পিচ ঢালা হলেও রাস্তা বেশ এবড়োথেবড়ো। ক্রমাগত পাক খেয়ে খেয়ে এগোতে হলে আপনার কোমর অটোম্যাটিক পিভোটাল মোশনে ঘুরতে থাকবে। সেই সঙ্গে হঠাৎ হঠাৎ লাফিয়ে ওঠা তো আছেই। বিনা খরচায় অ্যারোবিকস ব্যায়ামের এত সুব্দর ব্যবস্থা দেখে ড্রাইভার বিকাশকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে পাহাড় ধ্বস হয়? গাড়ির গিয়ার বদলাতে বদলাতে নির্বিকার কন্ঠে উত্তর এলোঃ “হয় তো। অ্যাকসিডেন্ট হয়। রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়।” যেন আবহাওয়ার বুলেটিন শোনাচ্ছে। আমি চুপ মেরে গেলাম। এরপর হয়তো শোনাবে যে গাড়ি রেগুলার খাদে ছিটকে পড়ে।

এইসব ছাড়া পথের দু’পাশের সিনিক বিউটি অসাধারণ। আঁকাবাঁকা পথ ধরে গাড়িটা যখন ছুটে চলে তখন আপনা থেকেই মন হারাই একটা অনুভূতি হবে। কখনও যেন পাহাড় হাত বাড়িয়ে আপনাকে উপহার দিতে চাইবে তার একদম নিজস্ব ফুলের গোছা। বাতাসে দুলছে রঙবেরঙের নানা ধরণের ফুল। গাড়িগুলো এগিয়ে যায় আর ফুলের গুচ্ছ দোল খেতে থাকে বাতাসের ঝাপটায়। আরেকপাশের নিবিড় ঝোপ খাদটাকে আড়াল করে রাখলেও মাঝে মাঝে সে ফাঁক দিয়ে ঠিকই আপনাকে এক ঝলক দর্শন দেবে। যাত্রাটা লম্বা কিন্তু বেশ উপভোগ্য। সেটা দেখার মত চোখ আর উপভোগ করার মত মন থাকা চাই। অবশ্য এর জন্য আপনাকে কবি হতে হবে না। স্রেফ চোখদুটো মেলে রাখুন। তাহলেই হবে।

আমরা পান্ডো ড্যামে পৌঁছালাম। ছোটখাট আকার। এইখানেই সালতুজের সঙ্গে বিয়াস মিলেছে আর এরপর এগিয়েছে বিয়াসের নামেই সেই মানালি পর্যন্ত। আমার আন্তরিক অনুরোধ, এই ত্রিবেনী সঙ্গমে অবশ্যই একবার থামবেন। স্বচ্ছ মালাকাইট-রঙা বিয়াসের জল, তার কোল ঘেঁসে পাহাড়ের সারি আর সবার ওপরে ঝকঝকে নীলাভ সাদা আকাশ – এই কম্পোজিসনকে পুরো হৃদয় দিয়ে শুষে না নেয়াটা মহা অন্যায় আর এই দৃশ্যকে ফ্রেমবন্দী না করাটা হবে মহা বোকামো। শুধু আপনার ড্রাইভারকে বলুন আপনি ছবি তুলতে চান। পান্ডো ড্যাম পেরিয়ে একটা মোড়ে সে গাড়ি সাইড করবে। আপনি সময় নিন। প্রকৃতির অপার, অকৃত্রিম সৌন্দর্য উপভোগ করুন।

পান্ডো থেকে বেশ অনেকদূর পর্যন্ত রাস্তা এবড়োথেবড়ো। প্রচন্ড ধুলো। এই জায়গাটুকুতে বেশ গরম লাগছিল আর গাড়ির গতিও অনেক কম। মাঝখানে পাঁচ কিলোমিটার একটা টানেল পড়বে। টানেলিটা পেরিয়ে রাস্তা ভাল হওয়া শুরু করবে আর হঠাৎ আপনি খেয়াল করবেন যে পৌঁছে গেছেন কুল্লুতে। আর এই পুরোটা পথ আপনাকে সঙ্গ দিয়ে যাবে শান্ত, স্নিগ্ধ, সুন্দরী বিয়াস।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com