ত্বকের সেলুলাইটিস হলে কি করবেন…

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল

ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল

সেলুলাইটিস হলো খুব সাধারণ এবং বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়াজনিত ত্বকের সংক্রমণ। এ ক্ষেত্রে ত্বক ফুলে যায়, লাল হয়, লাল স্থানটিতে গরম অনুভূত হয় এবং চাপ দিলে ব্যথা লাগে, আর এটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
যদিও সেলুলাইটিস আপনার শরীরের যেকোনো স্থানে বা মুখে হতে পারে, তবু একটা সবচেয়ে বেশি হয় আপনার পায়ের ত্বকে। মুখে সবচেয়ে বেশি হয় শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে। সেলুলাইটিস কেবলমাত্র আপনার ত্বকের ওপরের স্তরকে আক্রান্ত করতে পারেÑ অথবা ত্বকের নিচের স্তরকেও আক্রান্ত করতে পারে, এমনকি এটা আপনার লিম্ফনোড ও রক্তধারায় ছড়িয়ে যেতে পারে।
চিকিৎসা না করলে সংক্রমণ এত দ্রুত ছড়াতে পারে যে তা আপনার জন্য জীবন মরণ সমস্যা হতে পারে। এ জন্য সেলুলাইটিসের উপসর্গ দেখা দেয়া মাত্র চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

উপসর্গ
সেলুলাইটিসের ক্ষেত্রে আপনার ত্বকে নি¤œলিখিত উপসর্গ দেখা দিয়ে থাকে
০ ত্বক লাল হওয়া
০ ত্বক ফুলে যাওয়া
০ ত্বকে চাপ দিলে ব্যথা করা
০ ত্বক গরম হওয়া।
ত্বকের এই পরিবর্তনের সাথে জ্বর থাকতে পারে। সময় বেশি অতিবাহিত হলে লাল স্থানটি আরো সম্প্রসারিত হয়। লাল হয়ে যাওয়া ত্বকের উপরিভাগে অনেক ছোট ছোট লাল দাগ দেখা দিতে পারে, ছোট ছোট ফোস্কা দেখা দিতে পারে এবং সেগুলো ফেটে যেতে পারে।

কারণ
আপনার ত্বকের ফাটল বা চিড় দিয়ে একটি বা অধিক ধরনের ব্যাকটেরিয়া ঢুকলে সেলুলাইটিস ঘটে। যে দুই ধরনের অতিসাধারণ ব্যাকটেরিয়া সেলুলাইটিস ঘটায় তারা হলো স্ট্রেপটোকক্কাস এবং স্ট্যাফাইলোকক্কাস। তবে অধিক বিপজ্জনক স্ট্যাফাইলোকক্কাসের সংক্রমণÑ যাকে বলে মেথিসিলিনÑ রেজিস্ট্যান্ট স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস (গজঝঅ)Ñ সেটা দিন দিন বাড়ছে।
যদিও সেলুলাইটিস আপনার শরীরের যেকোনো স্থানে হতে পারে, তবে সবচেয়ে বেশি হয় পায়ে, বিশেষ করে পায়ের সম্মুখভাগ ও গোঁড়ালির গাঁটে। ত্বকের কোনো অংশ ছড়ে গেলে, বিশেষ করে সম্প্রতি অপারেশন করা হলে, কেটে গেলে কিংবা ক্ষত হলে অথবা ত্বকে প্রদাহ হলে সেখানে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশের সুযোগ পায়।
কিছু ধরনের পোকামাকড় কিংবা মাকড়সার কামড়েও ব্যাকটেরিয়া ঢুকে সংক্রামণ ঘটাতে পারে। শুষ্ক, ঝুর ঝুরে ত্বকেও ব্যাকটেরিয়া সহজে ঢুকতে পারে এবং এর ফলে ত্বক ফুলে যেতে পারে।

ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়
বিভিন্ন বিষয় আপনার সেলুলাইটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে :
ক্স বয়স : আপনার বয়স যত বাড়ে তত আপনার রক্তপরিসঞ্চালন ব্যবস্থার অবনতি ঘটে। ফলস্বরূপ যেখানে রক্তপরিসঞ্চালন ব্যবস্থা দুর্বল থাকে, সেখানকার ত্বকে ক্ষত হতে পারে।
ক্স শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া : বিভিন্ন অসুখে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এরকম হলে ত্বকে ইনফেকশন হয়ে সেলুলাইটিসের আশঙ্কা বেড়ে যায়।top-10-home-remedies-for-cellulitis-infection-on-legs-other-body-parts-e1429706921610
যে সব অসুখে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় সেসব অসুখের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ক্রনিক লিম্ফোসাইটিক লিউকেমিয়া এবং এইচ আইভি ইনফেকশন। কিছু ওষুধ যেমন প্রেডনিসোন কিংবা সাইক্লোসপরিন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
ক্স ডায়াবেটিস : ডায়াবেটিস কেবল আপনার রক্তে চিনির মাত্রাকেই বাড়ায় না, এটা আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয় এবং আপনার ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ায়। শরীরের যেকোনো স্থানের ত্বকে ইনফেকশন হতে পারে। ডায়াবেটিসের কারণে আপনার দুই পায়ের রক্তসঞ্চালন কমে যায় এবং এর ফলে আপনার পায়ের পাতায় দীর্ঘস্থায়ী ঘা হয়। এসব ঘা বা ক্ষতের মধ্য দিয়ে ব্যাকটেরিয়া ঢুকে সংক্রমণ ঘটায়।
ক্স চিকেনপক্স এবং শিঙগলজ : এসব সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ ত্বকে ফোস্কা তৈরি করে এবং সেই ফোস্কা ফেটে যায়। এর ফলে এসব স্থান দিয়ে ব্যাকটেরিয়া ঢুকে সংক্রমণ ঘটায়।
ক্স হাত বা পা ফুলে যাওয়া : টিস্যু ফুলে গেলে তা ফেটে যেতে পারে এবং সেখান দিয়ে ব্যাকটেরিয়া ঢুকে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
ক্স পায়ের পাতায় বা আঙুলে দীর্ঘস্থায়ী ছত্রাক সংক্রমণ : আপনার পায়ের পাতা বা আঙুলে বারবার ছত্রাক সংক্রমণ হলে আপনার ত্বক ফেটে যেতে পারে এবং এর ফলে বেড়ে যেতে পারে আপনার ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ঝুঁকি।
ক্স শিরাপথে ওষুধের ব্যবহার : যে সব লোক ইনজেকশনের মাধ্যমে অবৈধ মাদক ব্যবহার করে তাদের সেলুলাইটিসের ঝুঁকি বেশি থাকে।

কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন
যদি আপনার ত্বক লাল হয়, ফুলে যায়, চাপ দিলে ব্যথা করে এবং গরম অনুভূত হয়Ñ তা হলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। যদি আপনার ফুসকুড়ির সাথে জ্বর বা ব্যথা থাকে, অথবা ফুসকুড়ি দ্রুত পরিবর্তন হয় তা হলে অতি সত্বর চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সেলুলাইটিসি দ্রুত নির্ণয় করা ও তার চিকিৎসা দেয়া জরুরি, কেননা এই অবস্থা শরীরজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রোগ নির্ণয়
আপনার ত্বক দেখে চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করতে পারেন। আপনার চিকিৎসক আপনাকে রক্ত পরীক্ষা, ক্ষতের স্থানের কালচার এবং আরো বেশ কিছু পরীক্ষা করতে দিতে পারেন। আপনার পায়ের শিরাতে রক্ত জমাট হয়ে আছে কি না তা দেখার জন্য চিকিৎসক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন। কারণ শিরায় রক্ত জমাট বেঁধে থাকলে পা গরম হতে পারে, ব্যথা হতে পারে এবং ফুলে যেতে পারে।

জটিলতা
এই লাল ত্বক বা র‌্যাশ আপনার ত্বকের ভেতরের স্তরের মারাত্মক সংক্রমণের সঙ্কেত হতে পারে। একবার আপনার ত্বকের নিচে ব্যাকটেরিয়া ঢুকে পড়লে তা দ্রুত ছড়াতে পারে। ব্যাকটেরিয়া আপনার লিম্ফনোড ও রক্তধারায় ঢুকে সব শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ টিস্যুর গভীর স্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। টিস্যু পচে যেতে পারে।

চিকিৎসা
সেলুলাইটিসের চিকিৎসায় প্রথমে অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হয়। দু-একদিন পর চিকিৎসকের কাছে গিয়ে নিশ্চিত হতে হবে অ্যান্টিবায়োটিক ঠিকমতো কাজ করছে কিনা। ১০-১৪ দিন অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, কয়েকদিন পরে সেলুলাইটিসের উপসর্গ মিলিয়ে যায়। যদি তা না হয়, যদি সেলুলাইটিস আরো বাড়ে কিংবা আপনার উচ্চমাত্রার জ্বর থাকে তা হলে আপনাকে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হতে পারে। তখন আপনাকে শিরাপথে অ্যান্টিবায়োটিক নিতে হবে।
সাধারণত চিকিৎসকেরা স্ট্রেপটোকক্কাই এবং স্ট্যাফাইলোকক্কাইÑ এ দুটোর বিরুদ্ধেই কার্যকর ওষুধ দিয়ে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ সেফালেক্সিন। আপনার চিকিৎসক আপনার অবস্থা বুঝে অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন করবেন।
আপনার চিকিৎসক কোন অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছেন, সেটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ওই অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্সটি শেষ করাÑ এমনকি আপনি ভালোবোধ করলেও।
পুঁজ অনুভব করা গেলে অপারেশন করে পুঁজ বের করতে হবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমাটোলজি বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।
চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিঃ, ২ ইংলিশ রোড, ঢাকা।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com