তোমার শান্তি নাই মেয়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জেসিকা ইরফান

জন্মের পর থেকে প্রাই ৯৫ % পরিবিবারে একটা মেয়ের মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় ‘তুমি মেয়ে ‘ তুমি মেয়ে তাই তোমাকে পুরুষশাসিত সমাজের সমস্ত অনুশাসন মেনে নিতেই হবে । তুমি মেয়ে তাই তোমার পড়ালেখা, পোশাক , আরাম বা অন্য কিছুর জন্য বেশি খরচ করা যাবে না । তোমার জন্য বরাদ্দ মিনিম্যাম মেক্সিম্যাম নয় । তুমি মেয়ে তাই জন্মের প্রথম থেকেই তোমার জন্য একটা অনেক বড় উপহার সমাজের পক্ষ থেকে ‘অ্যা বিগ নো ‘ তুমি একটু বড় হচ্ছ ‘নো’ এর পরিধি বাড়তেই থাকছে … নিজেকে ঢাকো , গলা নামাও, চুপ চুপ , ফিস ফিসিয়ে কদম দাও । তুমি যদি সুন্দরী হও তাও জ্বালা । মা বাবার মনের মধ্যে কি আশঙ্কা ! কি ভীতি …! একা স্কুলে কি করে যাবে ? একা মার্কেটে কি করে যাবে ? একা বা বান্ধবীদের নিয়ে ছাদে ওঠা , বাইরে যাওয়া সব সব দুশ্চিন্তার কারন । অর্থাৎ তুমি এক মাথার ওপর চেপে থাকা ভার যা শুধু বাড়তেই থাকে । বাইরে তখন শুরু হয়ে গেছে রসালো বর্ণনা তোমাকে নিয়ে । যার তোমাকে ভালোলেগেছে বা ব্যর্থ প্রেমিক পুরুষদের মুখে মুখে তোমার নষ্ট হয়ে যাওয়ার কাল্পনিক গল্প । কখনো তোমাকে তারা তাদের বিছানা থেকে প্রত্যাখ্যান করার রসালো বানোয়াট গল্প ( যা যেকোনো চটি বইকেও হার মানায় )বা কখনো বিয়ে ভেঙ্গে দেওয়া… তোমার মুখে এসিড ছুড়ে দেওয়া । চাইত তোমাকে নাগালে পেলে ধর্ষণ করে হত্যা । তোমার পরিবার এর বিচার পাবেনা কখনো । হায় সমাজ আমার ! আর যদি তুমি কালো হও ? সারাক্ষন তোমাকে উপরের সবগুলোর সাথে অতিরক্ত শুনতে হবে তুমি কালো .. তুমি কালো । বিয়ের বাজারে তুমি অচল । শুনতে শুনতে একসময় তোমার মনে হবে আসলেই আমি মেয়ে, আমি কালো আমি অচল যদি কোন ভাবে সচল হই তাহলে আমার কাজ শুধু স্বামী সংসারের ‘জী হুজুর’ করা । তোমার মা অষ্টপ্রহর তোমার খুঁত ঢাকতে ব্যাস্ত । বিউটি পার্লার , ফেয়ার এন্ড লাভলি বা কাঁচা হলুদ / বেসন তোমার নিত্য সঙ্গি । তোমার মাথায় শুধু ‘তুমি মেয়ে তুমি মেয়ে’ এই কথাটা ঢুকানো হয় না তুমি নিজের চোখেই দেখতে দেখতে বড় হও তোমার মা খালা চাচি দাদী নানীর গোপন বেহাল দশা । তাঁদের নীরব চোখের জল । খুব ধীরে তোমার মাথার থেকে পায়ের আঙ্গুলের অনুতে পরমাণুতে মিশে যায় ‘তুমি মেয়ে ,এই সমাজকে মানতে তুমি বাধ্য ।’ সারা জীবন আর তোমার এ থেকে মুক্তি নেই । তুমি তখন যে কোন উপায়ে মুক্তির পথ খোঁজ … অপাত্রে প্রেম বা যার-তার সঙ্গে পালিয়ে বা মা বাবার ঠিক করা বিয়ে । তোমার পরিবার তথা সমাজের চোখে তোমার একটা গতি হয় । শান্তি কি তুমি পাবে বা পাও মেয়ে ? হল্প করে বলো তো … না পাবেনা বা পাও না । সেখানেও নানান ভয়াবহ যুদ্ধ । কখনো যৌতূকের, কখনো পরকীয়ার , কখনো অভাবের , কখনো সন্তান না হওয়ার , কখনো ছেলে বা সন্তান জন্মদিতে না পারার , কখনো তোমার অসুন্দর হওয়ার … শেষ নেই । সব সয়েও তুমি চুপ করে সংসার ধর্ম পালন করো । তুমি বাড়ির বউ থেকে ডোর ম্যাট হয়ে যাও । তবুও কাউকে কিছু বুঝতে দাওনা । তোমাকে শৈশব থেকে মাথার ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে শ্বশুরবাড়ির বদনাম বাইরে বলতে হয়না । তোমার মা খালাও মুখ খোলেনি তাই তুমিও চুপ করে সহ্য করতেই থাকো কোন এক আলোকিত দিনের আশায় । তোমার সহ্যের প্রান্ত সীমায় এসে তুমি তোমার আপন লোকদের কাছে একটা দুটো কথা বল । উনারা অবাক হয়ে যান কারন এতদিন তুমি কিছু বলনি …কারন এতো দিন তারা তোমার একটা সুখী সুখী দাম্পত্য ছবির ফ্রেমে অভ্যস্ত হয়ে হাফ ছেড়ে বেঁচেছেন, কারন ওরা এর সমাধান দিতে পারেন না কারন এর যে সমাধান তা সমাজ সংসারের চোখে অসম্মানের । আবার তোমাকে নানান উদাহরণ সহ সব ঠিক হয়ে যাবে বলে সান্ত্বনা দিয়ে একটু সহ্য করতে বলা হয় । কিন্তু কিছুই ঠিক হয়না । ,অসহ্য হয়ে তোমার সামনে তিনটা পথ খোলা থাকে ।

১। ডিভোর্স দেওয়া ।

 ২। আত্মহত্যা করা ।

৩। নিজেকে ডোর ম্যাট করে বেঁচে থাকা ।( বেশি ভাগ তাই বেঁচে থাকে)

হায়রে মেয়ে তুমি জানোনা, এই তিনটার মধ্যেও তোমার মুক্তি নেই । তুমি যদি তালাকও দাও তবুও এই পচাগলা সমাজ তোমার পিছু ছাড়বে না । হয়তো তোমাকে এসিডে ঝলসে দেবে নয়তো যা নয় তা নর্দমা থেকে নরক পর্যন্ত যতো বাজে কথা তোমার সম্পর্কে বলা যায় তাই বলতে বলতে দুর্বিষহ করবে তুমি ও তোমার সন্তান / পরিবারের জীবন । ‘ওই ডিভোর্সিটা না’ চলতে ফিরতে শুনতে হবে । তোমার পিঠে নষ্ট মেয়ের স্থায়ি উল্কি এঁকে দেবে সমাজ । আর যদি তুমি আত্মহত্যা করো ১০ মিনিটের মধ্যে এই সমাজ তোমার মৃত দেহের ওপর রাবার ষ্ট্যাম্প দিয়ে দেবে নষ্ট মেয়ের, পরকীয়া থেকে পতিতা পর্যন্ত সমস্ত উপাধিতে সজ্জিত হবে তোমার শান্তির জন্য অনন্তের যাত্রার দেহ । যদি তুমি ডোর ম্যাট হয়ে পরে থাকো স্বামী সংসারে তোমার জীবন চলে যাবে এক ভারবাহী গাধার মতো । অবসাদ বা ডিপ্রেশন তোমার মাথায় স্থায়ী বাসা বেঁধে নেবে । তুমি যা চেয়েছিলে তা হয়তো তুমি একদিন পাবে কিন্তু তা উপভোগ করার মতো মন ততদিনে তোমার মরে গেছে । একজন খিটখিটে মা বা শাশুড়ি হয়ে বা সম্পূর্ণ সব কিছু থেকে ইমিউন হয়ে তুমি অপেক্ষা করছ পরপারের হয়তো নিজের বাড়িতে বা সন্তানের বাড়ি বা বৃদ্ধা আশ্রমে । একদিন এমনি করে জীবনের আলো নিভে যাবে তোমার । মাটি চাপা পরবে তোমার যতো হতাশা অপমান অপূর্ণ ইচ্ছে বা এক করুন ইতিহাসের । যদি তুমি বুক ফুলানো তথাকথিত দামী স্বামী ও সন্তান রেখে যেতে পারো সমাজ আসবে তখন বত্রিশ দাত কেলিয়ে ফুলের মালা নিয়ে , তার হাতে থাকবে ভালো মেয়ের সার্টিফিকেট । তোমার লিভিং রুমে তোমার সুখী সুখী একটা দাম্পত্য ছবির ফ্রেমের উপর পরবে ভালো মেয়ের ‘পার্মানেন্ট সিল মোহর’ । তারপর দিন খবরের কাগজে ছাপা হবে ছোট হরফে তোমার নাম বড় হরফে থাকবে তোমার সো কলড বুক ফোলানো দুনিয়া কাঁপানো স্বামী বা ছেলের নাম যাদের হয়তো জিবৎদশায় তোমার ইচ্ছে অনিচ্ছে ভালোলাগা মন্দ লাগা এসবের খোঁজ খবর নেওয়ার প্রয়োজনই হয়নি । হায় আমার সমাজ ! হায় আমার ভালো মেয়ের সার্টিফিকেট !

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com