তুই আমার হারিয়ে যাওয়া অঞ্জন রে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

গিয়াস আহমেদ

আনিসের কথা আমার মনে পড়ে। হঠাৎ মনে পড়ে। মনে পড়ে যায়। ওর মুখটা মনে পড়ে… কী সরল! গোলগাল কচি মুখ! আতা ফলের গায়ে মেখে থাকে যেমন সাদা সাদা আস্তর, তেমন নিষ্পাপ মুখ…। আর কলাপাতায় বৃষ্টির টলমলে জলের মতো সরল চোখ। সরল এবং ভীত।

আনিস আমার প্রথম বন্ধু। বন্ধু বলতে, সেই শৈশবের প্রথম যে মুখটি আমার চোখে ভেসে ওঠে, সে আনিস। আমরা একই সাথে স্কুলে যেতাম, একই সাথে ফিরতাম। কখনো ওর বাড়ি আমি, কখনো আমার বাড়ি ও খেয়ে নিত। দুপুরে আব্বা যখন ভাতঘুম, আম্মার একটু জিরনোর ফুসরত, তখন আমরা খেলার মাঠে। আমাদের খেলাও ছিল নীরবে, নিভৃতে। চুপচাপ খেলা- কখনো আমি বাসের কন্ডাক্টর তো ও যাত্রী- ‘এই যে ভাই, টিকেট দ্যান।’ আমাদের পকেট ভর্তি থাকত বাস স্টপেজে মানুষের ফেলে যাওয়া টিকেট। কিংবা সিগারেটের খালি প্যাকেট। ওগুলোর ছিল বিরাট দাম। ওসব যে ছিল আমাদের টাকা।
কখনো আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম গুদারা ঘাট। এখন যেটা বাড্ডা লিংক রোড। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেয়া ঘাটে বসে, নৌকায় লোকের এপার-ওপার করা দেখতাম।
দুঃসাহস করে কখনো চলে যেতাম টিঅ্যান্ডটি মাঠে। এখন যেখানে করাইল বস্তি। তখন সেটা বিরান বিশাল বিরান। শিয়াল দৌড়ত। ছোটরা একা ওই মাঠে যেত না ভয়ে।
সেই বিরান ভূমির ঘাসের বিছানায় শুয়ে আমরা আকাশ দেখতাম। আমাদের মাথার ওপর দিয়ে প্লেন উড়ে যেত। তার গায়ে লেগে রোদ্দুরের চিক এসে লাগত আমাদের শিশু চোখে। দাতৈগোটা নামের এক ধরনের বুনো-কষ ফল চিবোতে চিবোতে আমি আর আনিস কত দার্শনিক ভাবনায় যে ভাসতাম।
‘তুই আমার বন্ধু, আমি তোকে ভালোবাসি’ জাতীয় কথা তখন ছিল কেমন যেন লজ্জার। আনিসকে কখনো বলা হয়নি, ‘বন্ধু, তোকে অনেক ভালোবাসি’। বলেনি আনিসও। আমাদের কথা ছিল কম, কাছাকাছি থাকাটাই বেশি। বড় বেশি।

আমাদের বাসা মহাখালী ওয়্যারলেস গেট। আনিসরা থাকত টিবি গেটে। হাঁটাহাঁটির দূরত্ব মাত্র। আমার আম্মা ওকে খুব আদর করতেন। আমার পাশে বসিয়ে যত্ন করে খাওয়াতেন। মাছের বড় টুকরোটা আনিসের পাতেই বেশি পড়ত। আনিসের আম্মাও খুব ভালোবাসতেন আমাকে। ওদের ঘরে কত খেয়েছি! টুপ করে বসে পড়লেই হলো। ওদের ছিল টানাটানির সংসার। তবু খালাম্মার ভালোবাসায় কমতি ছিল না এতটুকু।
আনিসের আব্বা ছিলেন আমাদের পাড়ার নাইট গার্ড। এ নিয়ে আমাদের দু’ পরিবারে সমস্যা ছিল না কোনো। সমস্যা ছিল আব্বার কর্মচারীদের। তাদের প্রবল আপত্তি এবং অপছন্দ ছিল আমাদের বন্ধুতায়। আমাদের ছেলেবেলায় কাজের লোকেরাও ছিল এক ধরনের শাসনকর্তা। তোদের কথা হলো, তোমার বন্ধু হবে ডাক্তারের পোলা, ইঞ্জিয়ারের ছেলে। নাইট গার্ডের ছেলে কেন?
(ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া বড় কিছু বহুদিন এদেশের মানুষ ভাবতে পারত না)

বড় হয়ে এক জমিদারপুত্রের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হলো। অঞ্জন। অঞ্জনের সাথে আমার প্রতিদিন কথা হয়। ফোনে, ফেসবুকে। কথা হবেই। নাহলে আমাদের পেটের ভাত হজম হয় না। আমার এমন কিছু নেই যে অঞ্জন জানে না। কিংবা ওর। এক জীবনে আমরা এত কথা বললাম- তবু কি কখনো বলতে পেরেছি, তোকে দেখলে আমার আনিসের কথা মনে পড়ে! তুই আমার হারিয়ে যাওয়া আনিস রে, অঞ্জন! কখনো কি বলা হলো- বন্ধু, তোকে অনেক ভালোবাসি!

[দুইদিন আগে, মানে ৬ ফেব্রুয়ারি ছিল অঞ্জনের জন্মদিন। ওই দিন আমার বিয়ে বার্ষিকীও। অঞ্জন্যা হারামিটা আমার সব জায়গায় ঢুকে যাচ্ছে, কী মুসিবত!
তার চেয়েও বড় মুশকিল, আমি আমার অ্যানিভার্সারি এবং অঞ্জনের বার্থ ডে দুটোই ভুল মেরে গেছিলাম। বউয়ের কাছে মাফ চেয়ে এ যাত্রা বাঁচছি। ঘরের মধ্যে কাহিনি হইছে। ঘরের কথা পরে জানে নাই।
অঞ্জন্যা, তোর কাছে সরি-টরি কইতে পারুম না। মাফ করে দিস, দোস্ত…]

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com