তিন পাগলের মেলা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

হামিদ কায়সার

পাগলের ঘর দখল নিছিলাম। হাঁ হাঁ সত্যি, সাদুল্যাপুরে! তবে পাগলটারে আমরা দেখি নাই। দিনের বেলায়, বিশেষ কইরা দুইফর বেলা সে পই পই কইরা কই না কই ঘুইরা বেড়ায়। পাগল হইলে কী হইবো, পেটে চাইট্টা দানাপানি তো দিতে হয় নাকি? এই ফাঁকে আমরা চারজন ছবিতে এই যে ঘরটা দেখতেছেন; এটার মধ্যে নিশ্চিন্তে ঢুকে পড়লাম। ঢুকে পড়ার অধিকারতো আমাদের থাকতেই পারে! কোনো দরজা নাই, জানালা নাই। চারপাশ খোলা। নো এন্ট্রি জাতীয় কোনো নোটিশও নাই। পাগলের ঘরে কি আর এইসব লাগে, না দরকার হয়- বলেন? আমরা আরো মনে করছিলাম, এমনিই বুঝি রেস্ট নেওয়ার জন্য জমির মালিক ঘরটা বানাইয়া রাখছে। মাঝে মধ্যে পোলাপান নিয়া আইসা হয়তো রেস্টটেস্ট নেয়। রেস্ট না নিলে এতো সুন্দর একটা চৌকি পেতে রাখার মানে আছে কোনো। আমরা বেশ আরামসে সেই চৌকির মধ্যে কেউ বসে পড়ি কেউ শুয়ে নিই। শোবো না? আমাদের কি আর জানবার কথা যে, এখানে এক পাগল বাস করে। সেটা আমরা জানলাম এক মুরুব্বির কাছ থেইকা। ঘরের ভেতর আমাদের দেইখা পাশ দিয়া যাওনের সময় মুরব্বি ভালো মনে কইরাই আমাগো বইলা গেল, ‘পাগলের ঘরে কিন্তু বইছেন। সাবধান!’
‘তাই নাকি?’ আমাদের চারজনের মধ্যেই খানিকটা আতংক কাজ করে।
মুরব্বি ঘরে ঢুকে উঁকি দিয়ে উপরে রাখা ভাঙা সুটকেস দেখালো, তারপর দেখলাম একটা ভাঙাচুরা ‍লুঙিও রাখা। শুধু কি তাই? মুরব্বি সামনের এক কাঁঠাল গাছের মগডালের দিকে হাতের ইশারা করে দেখালো, ‘ওই যে দেখেন পাগলের টেলিভিশন!’ অবাক হয়ে দেখলাম, এ ঘরের দিকেই ফিট করে রাখা হয়েছে ভাঙা টেলিভিশনের একটা স্টিলের চৌকোনা খাপড়া। আরেকদিকে দেখি, একটা গাছের মধ্যে শার্ট ঝোলানো। পুরো এক বিঘা জমিতেই তিনি গাছে গাছে ডালে ডালে এভাবে নিজের মতো সংসার রচনা করে বসে আছেন। জায়গাটা কিন্তু বেশ নির্জন। আশেপাশে কোনো বাড়িঘর নাই। চারপাশটা ঘন গাছপালায় ঘেরা। প্রাইভেসি বেশ ভালোভাবেই রক্ষা করা যায়। একেবারে যাকে বলে একটা আলাদা জগত। এমন নির্জনতা, তারমধ্যে আবার ফুরফুরে হাওয়া। ভাতঘুমের বুঝি আর তর সয় না। আমার চোখের পাপড়িতে চুমু খেয়ে বলে, ওগো তুমি যে আমার…ওগো তুমি যে আমার। আমার চোখ ভরে ঘুম নেমে আসে। আমার তিন পার্টনার কবি ও সম্পাদক ফারুক আহমেদ, কথাশিল্পী রফিক হারিরি, পেইন্টার দেওয়ান আতিক তারা এখানে এসেছেন বেড়াতে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তো আর সময় নষ্ট করতে পারেন না, সেটার কোনো মানেও হয় না। ওরা ‘আচ্ছা আপনি ঘুমান’ বলে আমাকে একা ফেলেই চলে গেলো গ্রামখানা ঘুরে বেড়াতে। আর ওরা চলে যেতেই আমি আরো জুত হয়ে শুই ঘুমটাকে শক্তপোক্ত করার জন্য। কিন্তু ঘুম শক্তপোক্ত না হয়ে আমার চোখের দু’ পাপড়ি হঠাৎ কাঠ হয়ে যায়, আমি আর দু’ চোখ কিছুতেই এক করতে পারি না। আর তখনই সামনের কাঁঠাল গাছের মগডালে চোখ যেতেই আশ্চর্য হয়ে গেলাম। টিভিটা দেখি চলছে! হ্যাঁ, চলছেই তো! কোনো একটা ট্রাভেল-এর চ্যানেল। মালদ্বীপের ওপর কী সুন্দর একটা ডকুমেন্টারি দেখাচ্ছে। ধ্যাত! আমার কি মাথাটাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি! আমি চোখ রগড়াই। আবার ভালো করে তাকিয়ে দেখি চ্যানেল পাল্টে গেছে। ডিসকোভারি। ওরা ইন্দোনেশিয়ার বালিদ্বীপের হেরিটেজ দেখাচ্ছে। আমি গা হাত পা ঝাড়া দিয়ে বসি। আমার নাড়াচড়াতেই কিনা চ্যানেলটা আবার পাল্টে যায়, শাহরুখ খান দেখি ট্রেন থেকে হাত মেলে দিয়েছে, কাজল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছে, কিছুতেই শাহরুখের হাতটা আর ধরতে পারছে না, কিছুতেই না, আমি ছবিটার প্রতি এতোটাই একাত্ম হয়ে উঠি যে কাজলকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে উৎসাহিত করতে লাগলাম, দৌড়াও আপু দৌড়া, আরেকটু জোরে…আরো আরো…
‘আরে! অপু ভাই!’ কে দৌড়াবে?’ হঠাৎ কবি ফারুক আহমেদের ডাকে আমার সব মনোযোগ নষ্ট হয়ে যায়। আমি ওকে হাত ইশারায় থামিয়ে দেই, ‘কাজল, শাহরুখ!’ ফারুক ভীত স্বরে বললো, ‘আপনার কি মাথাটা খারাপ হয়ে গেল নাকি অপু ভাই! ভাঙা চার কোণা বক্সে কাজল আর শাহরুখকে দেখতেছেন?’ আমি ওর দিকে বিরক্তের ভঙ্গিতে বলি, ‘আরে! তাকিয়েই দেখেন না, ভালো করে!’ ফারুকও মগডালের টিভি স্ক্রিনের দিকে সিরিয়াস ভঙ্গিতে তাকায়। তারপর নিজের অজান্তেই চৌকিতে বসে পড়ে! খুব মনোযোগ দিয়ে টিভিটা দেখতে দেখতে শুধু বললো, ‘কাজল শাহরুখরে কই পাইলেন! এইটাতো ঈদসংখ্যা নিয়া গোল টেবিল বৈঠক চলতেছে। দাঁড়ান দাঁড়ান! একটু শুনি! আন্দালিব রাশদী ভাই কী বলে!’ আমি ফারুকের দিকে তাকিয়ে অবাক, ও গোল টেবিল বৈঠক কই পাইল! ওদিকে শাহরুখ খানকে মারতে মারতে রক্তটক্ত বের করে একাকার! আমি চেঁচিয়ে ওঠলাম, ‘আপনে গোল টেবিল বৈঠক কই পেলেন। এইটাতো দিলওয়ালে দুলহানিয়া চলতেছে!’ তখন দেওয়ান আতিক আমাদের কথাবার্তা শুনে টিভির দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকাল। ভালো লাগার আবেশে ও চেঁচিয়ে ওঠলো, ‘আরে! পিকাসোর ওপর ডকুমেন্টারিটা আবারো ছাড়ছে! এইটা আমার খুব ফেভারিট!’ ফারুক ওর দিকে তাকিয়ে চোখ কটমট করে বললো, ‘আপনি আবার দেখতাছেন পিকাসোরে! যত্তোসব মাথা খারাপের দল! আপনাদের জন্য ঈদসংখ্যার আলোচনাটা ঠিকমতো শুনতেও পারলাম না।’
আমার মাথাটা কেমন আউলাতে শুরু করেছে! আমি দেখছি সিনেমার চ্যানেল, ফারুক দেখছে সময় টিভি আর দেওয়ান আতিক ন্যাশনাল জিওগ্রাফি! আসলে কোনটা সঠিক! রফিক হারিরিকে অনুনয়ের ভঙ্গিতে বললাম, ‘ভাই! আপনি একটু দেখেন তো, আসলে কোন চ্যানেলটা চলছে!’ রফিক হারিরি প্রথমে খুব বিরক্ত হলো, ‘ধুর! আপনারা ওই মগডালের ভাঙা টিভির বাক্স নিয়ে কী সব ফালতু কাজকারবার করতেছেন বলেন তো!’ পরে আমার অনুনয়ে মগডালের টিভির দিকে তাকিয়ে ও হঠাই ধ্যানগম্ভীর হয়ে যায়, তারপর টিভির দিকে তাকিয়েই কোনোমত আমাকে ‘এটা মিউজিক চ্যানেল’ ইনফরমেশনটা পাস করে হঠাৎ টিভি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই কুদ্দুস বয়াতী স্টাইলে নাচতে নাচতে জোর গলায় গেয়ে ওঠলো, তিন পাগলের হলো মেলা নদে এসে, তোরা কেউ যাসনে পাগলের কাছে।

ছবি: দেওয়ান আতিকুর রহমান

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com