তিনি থাকবেন শিল্পীর আরাধনায়, উপাস্য হয়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শবনম ফেরদৌসী

আমি নিজেকে প্রায়শই প্রশ্ন করি, আমি কী খুঁজি? কিসের অন্বেষণ করি? আমি খুব সহসা প্রশ্নের উত্তর লাভ করি-‘একজন সৎ মানুষের।’ আর যদি সেই মানুষ হন সৎ শিল্পী, তবে আমার বুঝি চাইবার নেই আর কিছু এ জীবনের কাছে।

আমি এই মধ্যবর্তী জীবনে খুব কিঞ্চিৎ, ভীষণ অপ্রতুল তাঁদের দু‘একজনের দর্শন লাভ করেছি। তাঁদেরই একজন সুধীন দাশ।

শৈশব থেকে তাঁর গান শোনা হয়। তাঁকে দেখেছি বিটিভির ঝাপসা পর্দায়, ম্রিয়মান আলোয়, হারমোনিয়ামের সামনে একজন বর্ষীয়ান ব্যক্তি। নির্লিপ্ত তাঁর অবয়ব,প্রখর তাঁর গায়কী। শৈশব-কৈশোরে  সে অবয়ব আর দশটা ছবির মতোই ছিলো আমার কাছে, রেখাপাতহীন। বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকে বয়েসী মানুষের মরযাদা বোঝে। আমারও বয়েস হবার প্রাক্কালে সে উপলব্ধি হলো। আরো অনেকের মতো আমি সুধীন দাশের মূল্য বুঝতে শিখলাম। সেও নিজের ছবির কাজের প্রয়োজনে। যখন অকস্মাৎ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমার মনে নাকাড়া বাজালো তখন কবির অর্বতমানে আমি একজনকে আমার চিত্রকল্পে স্থান দিলাম। তিনি সুধীন দাশ। একজন নিরীহ শিল্পী। একাগ্রতা যার শক্তি। ভক্তি যার মূল্যবোধ। আমি তাঁর অন্বেষণে নামলাম। আরেক জনের অন্বেষণে নেমেছিলাম তখন। তিনি ফিরোজা বেগম। তাঁর পুত্র হামিন ভাইয়ের সঙ্গে তিনবার শ্যুটিং শিডিউল ঠিক করেও ফিরোজা বেগমের সাক্ষাৎ মেলেনি। প্রতিবার তিনি জানালেন, ফিরোজা বেগম অসুস্থ। শেষতক তিনি আমার কাছে অবগুন্ঠিতই থাকলেন। তাঁকে ছোঁয়ার সুযোগ পেলাম না। তখন মরিয়া হলাম সুধীন দাশের জন্য। গত বছর নজরুল জন্মজয়ন্তীর প্রাক্কালে তাঁর দেখা মিললো। আমি তাঁর সান্নিধ্য লাভ করলাম এবং তা অপার আনন্দে।

শ্যুটিংয়ে গেলাম একাত্তর টিভির শো ‘ক্ষণকাল’ এর জন্য। মীরপুরের এক গাছপালায় ছাওয়া ঝুম একটি ফ্ল্যাট বাড়িতে তিনি বাস করেন। বৌদি নীলিমা দাশ আমাদের বরণ করলেন। আমরা ক্যামেরা পেতে ড্রইংরুমে অপেক্ষমান। শরীরটা ভালো নেই তাঁর বহুদিন। আমরা সে কথা মনে রেখে অপেক্ষা করি। একজন শিল্পীর জন্য অপেক্ষা। অবশেষে আসেন তিনি। সফেদ, সুদর্শন এক শিশু। আমি মনে মনে নতজানু হয়ে পড়ি। তাঁকে কী করে পীড়া না দিয়ে শ্যুটিং করা চলে তা ভাবি।শুরুতেই ক্যামেরার আলো নিতে পারেন না তিনি। আমরা আলো কমাই। তিনি কথা বলা শুরু করেন ধীরে, সময় নিয়ে। আমরা আবিষ্কার করি ক্যামেরার সামনের আর নেপথ্যের এক সুধীন দাশকে।

আমি এ সময়ে কী অন্বেষণ করি? একজন মানুষের সরলতা, উদার নৈতিকতা ও তার নিজের সততা। সে যে আদর্শেরই হোক না কেনো আমি ব্যক্তির সততার খোঁজ করি। আমি সেই মুহূর্তে অনুভব করতে থাকি আমি একজন সৎ মানুষের সামনে। যিনি জন্মগত ভাবে শিল্পী। যিনি তাঁর নীতির কাছে কোনদিন নতজানু হননি। তিনি তাঁর আদর্শকে এখনো অক্ষুন্ন রেখেছেন হাজারো ডামাডোলে।

আমি ক্রমশ উদঘাটনে আপ্লুত হই। শুদ্ধতায় স্নান করতে থাকি। শিল্পী তো এমনই। সহজ ও অকপট। তাঁর আলোকময় সান্নিধ্য অন্যের মাঝে সঞ্চারিত হয়। এক সময়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। আমরা থামাই। সে থামার কালে তিনি অনেক কিছু বলে ফেলেন। আমি ক্যামেরা অন করে পুনরায় শুনতে চাই। কানে ভালো করে শুনতে পান না। আমি তখন তাঁর সঙ্গে একটা মানসিক যোগাযোগ স্থাপন করি। আমার আগ্রহে তিনি নিজে থেকেই সাড়া দিতে থাকেন। মাঝে মাঝে গান করেন। আমি অবাক হই এই বয়সে একজন মানুষ কি করে এমন দরদ দিয়ে গাইতে জানেন, পারেন! এ তো আত্নার আত্নীয়। নইলে এ কি করে সম্ভব! শিল্প বাহ্যিকে নয়, অন্তরে- তা তিনি আরেকবার আমায় আত্নস্থ করিয়ে দেন। ফিরিয়ে দেন প্রাচীন, অক্ষয় মূল্যবোধে।ক্ষুদ্র আমি নুয়ে থাকি একজন সৎ শিল্পীর নৈকট্যে।

মৃত্যু আমি সেলিব্রেট করি না। জন্ম আমার কাছে বিশাল একটি ঘটনা। একজন শিল্পী সুধীন দাশ এ বাংলায় জন্মেছিলেন। বৃটিশ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনে যার স্ফূরণ, সেই তিনি তাঁর দীর্ঘ যাত্রায় একজন প্রকৃত শিল্পী হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। আমার প্রাপ্তি তা অবলোকন করা।

কাজেই তাঁর আজকের মৃত্যু আমার কাছে মূল্যহীন। তিনি আছেন এই জীর্ণ বাংলার প্রতাপশালী সময়ের পুরোধা হয়ে। তিনি থাকবেন শিল্পীর আরাধনায়, উপাস্য হয়ে।

ছবি: গুগল ও একাত্তর টেলিভিশন সৌজন্যে

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com