তাহলে শুরু করা যাক গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

সর্ষের তেলের ঝাঁজ চোখে এসে লাগে। তবে, পেঁয়াজ দেয় না কিন্তু। এর পরে আছে সরপুঁটির মরিচ পোড়া ঝোল। পাতলা সোনালি তার রঙ। গরমের দিনে শেষবেলায় থাকে আমড়ার ডাল। খেলেই মুখ পরিষ্কার…
কলকাতা থেকে প্রাণের বাংলার জন্য নতুন একটি ধারাবাহিক লিখতে শুরু করলেন অধ্যাপক অমৃতা ভট্টাচার্য। তিনি বলছেন, এই গল্পের নানা পরিসর। আসলে গল্প তো নয়, গল্পের মতো যে জীবন তারই আখ্যান। আপনারা একে ছাপোষা বাঙালির ভাত ডাল মাছের ঝোলের গল্প বলতে পারেন, সে আপনাদের অভিপ্রায়। লেখা পড়তে পড়তে আমাদেরও মনে হয়েছে তেল-ঝাল-ঝোলের জগত নিয়ে নতুন আস্বাদের এই লেখা প্রাণের বাংলার পাঠকদের রসনাকেও তৃপ্ত করবে।

মৃণাল আজ সেই কোন ভোরে উঠে শিউলি ফুল কুড়িয়েছে কোচড় ভরে। একেকদিন হয় না, অকারণেই ঘুম ভেঙে যায়! তখন আর বিছানায় পড়ে থাকতে ইচ্ছে করে না বাসি রাতের মায়ায় জড়িয়ে। দরজার খিল খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল মৃণাল। এই ভোরে আকাশ জানি কেমন কুমারী বেলার মতো নরম পেলব হয়ে থাকে। বিশেষত শরতে। এমন সকালে কাপড় ছেড়ে উনুনের ছাই তুলতে বয়েই গেছে মৃণালের। ঠাণ্ডা নিস্তেজ হয়ে যাওয়া ছাই যেন কোন বিগত জন্মের শোকের মতো বড় বেশি নিষ্প্রাণ। নারিকেলের মালা ভরে ছাই তুলে নিয়ে তবে না উনুন লেপা হবে! ঘর দোর ছাটপাট হবে, জল ছড়া দেওয়া হবে এদিক সেদিকে। তবে সে হবে আরও খানিক পরে। এ বাড়ির গায়ে এখনও ঘুমের ঘোর জড়িয়ে আছে নিদালি মন্তরের মতো। মৃণাল তাই চুপটি করে খিড়কির দরজা খুলে পুকুর পাড়ে গিয়ে বসে। পুকুরের জল এখন অল্প অল্প শিশির মাখে রাতভোর। তাই তার গায়ে হাত ছোঁয়ালে শরীর ওঠে শিরশিরিয়ে। মৃণালের ইচ্ছে করে একবার ডুব দিয়ে ওই মধ্যিখানে গিয়ে গায়ের কাপড় আলগা করে দিয়ে চিত সাঁতার দিতে। জলে ভাসতে ভাসতে কেমন আকাশ দেখা যায়। আহা! এই জীবনে আর কিছু না হোক শরীর নিয়ে কত মায়া আর মোহ দেখে নিলো মৃণাল তার ইয়ত্তা নেই। তবু এই শরীরের ছোঁয়ায় নাকি শরীর কলুষ হয়। তাই না, সক্কাল সক্কাল চান করে কাপড় ছাড়ার নিয়ম! এঁটো শরীরে উনুন ধরলে পাপ হয় কিনা মৃণাল ঠিক জানেনা তবে ও এইটুকু জানে পাপ পুণ্যির হিসেব কষে মন। সেই অঙ্কের নিয়ম মানুষ ভেদে বদলে বদলে যায়। যাক গে, এমন একটা সকালে ছাইচাপা ব্যথাদের খুঁচিয়ে আগুন খুঁজে আর কাজ কী! তার চেয়ে বরং শরীর ডুবিয়ে জলে ভাসাই ভালো। মৃণাল তাই ওর পাছাপেড়ে শাড়িখানি ছড়িয়ে দেয় ভোরের ঠাণ্ডা জলে। আকাশের দিকে মুখ তুলে সাদা মেঘ দেখে, সূর্যের প্রথম আশনাই দেখে। দেখতে দেখতে ওর মনে হয়, মানুষের ভালোলাগা খারাপলাগা নিয়ে এই পুরনো পৃথিবীটার এতটুকু মাথাব্যথা নেই। মানুষেরই হয়তো বা পৃথিবীকে নিয়ে ভাবলে খানিক লাভ আছে। আকাশের রঙটুকু যদি মনেই না লাগলো, তবে আর এই সাতসকালে ঘুম ভেঙে লাভ কী বলো! মৃণাল তাই এবার জল টুপটুপিয়ে ঘরে ফেরে। কাপড় ছাড়ে। দেরাজের নীচ থেকে নরম একখানা শান্তিপুরী শাড়ি বের করে। এই শাড়িখানা দিয়েছিলেন বড়’দি। সেই যে সেবার শরতের এক শিশির ভেজা সকালে তার মৃত্যু খবর এলো! সেদিনও এমন শিউলি ফুটেছিলো গাছ আলো করে। বড়দির কথা মনে পড়ে প্রায়ই। পুজোর সময়ে কত আনন্দ করে মোয়া বানাতেন, নাড়ু বানাতেন। এই সব ভাবতে ভাবতে শিউলি গাছে ডাল ধরে মৃণাল আরেকবার ঝাঁকায়। শিউলিরা ঝরে পড়ে সকালের আলোয়। কোচড় ভরে গেলে মৃণাল খান কতক শিউলি পাতা তোলে পুরুষ্টু দেখে। বিন্তিটার জ্বর ছাড়ছে না ক’দিন ভর। শিউলি পাতার রস করে দেবেখন ওকে। পুরনো জ্বর সারিয়ে দেবে শিউলি। দেবে না কি? মানুষের সাহচর্য জোটে না যাদের গাছেরা তাদের ডেকে নেয় এমন আশ্চর্য সকালে। মৃণাল তাই দাওয়ায় বসে শিউলির বোটা ছাড়ায় বেছে বেছে। মায়ের দেওয়া একখানি পুরনো সাদা কাপড় আজ শিউলির রঙে রাঙিয়ে নেবে সারাদিনের কাজের ফাঁকে। গাছেরা কেমন দেখো, হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের বে-রঙিণ কাপড়ে আলো হয়ে ফুটে থাকতে পারে শরতের এমন নির্ভার একটা সকাল জুড়ে। ফুল বাছতে বাছতে মৃণালের শরীর জুড়ে শিউলির গন্ধ ঘোরে ফেরে মায়ের আদর হয়ে। তা বেশ, এই স্থবির সংসার জীবনের মধ্যে আর কিছু না পারুক ওরা অন্তত কিছু জঙ্গম স্নেহ এনে দিতে পেরেছে রোদ্দুরের উত্তাপে, মেঘেদের স্নিগ্ধতায়। এ জীবনে এই ঢের। মৃণাল তাই শিউলির বোঁটা ছাড়ায় মন দিয়ে।
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com