তাহলে শুরু করা যাক গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

সর্ষের তেলের ঝাঁজ চোখে এসে লাগে। তবে, পেঁয়াজ দেয় না কিন্তু। এর পরে আছে সরপুঁটির মরিচ পোড়া ঝোল। পাতলা সোনালি তার রঙ। গরমের দিনে শেষবেলায় থাকে আমড়ার ডাল। খেলেই মুখ পরিষ্কার…
কলকাতা থেকে প্রাণের বাংলার জন্য নতুন একটি ধারাবাহিক লিখতে শুরু করলেন অধ্যাপক অমৃতা ভট্টাচার্য। তিনি বলছেন, এই গল্পের নানা পরিসর। আসলে গল্প তো নয়, গল্পের মতো যে জীবন তারই আখ্যান। আপনারা একে ছাপোষা বাঙালির ভাত ডাল মাছের ঝোলের গল্প বলতে পারেন, সে আপনাদের অভিপ্রায়। লেখা পড়তে পড়তে আমাদেরও মনে হয়েছে তেল-ঝাল-ঝোলের জগত নিয়ে নতুন আস্বাদের এই লেখা প্রাণের বাংলার পাঠকদের রসনাকেও তৃপ্ত করবে।

আজ আবার হরিদাসী বোষ্টমী এসেছে সকাল সকাল। খঞ্জনী বাজিয়ে গান গাইছে। সবে তো জন্মাষ্টমী গেল, এখনও এবাড়ি-সেবাড়ি ঘুরলে দেখা যাবে গোপালের শয্যায় নতুন চাদর, গোপালের গায়ে নতুন জামা। মানুষের এই যে বাৎসল্য রসের পূজা, এ ভারী ভালো লাগে মৃণালের। তবে তার চেয়েও ভালো লাগে হরিদাসীর গান। দিদি শাশুড়ি বলেছেন আজ রসকীর্তন শুনবেন সারা দিনভর। হরিদসীর আজ এখানেই সেবা হবে। উনুনে তাই আতপ চালের ভাত ফুটছে, মটরের ডাল বাটা দলা করে করে ভাতে ছেড়ে দিচ্ছে মৃণাল। ভাতের পাতে তেল নুন মরিচ দিয়ে মেখে নিলে যেন অমৃত। ওদিকে বিন্তি দাওয়ায় বসে থোড় কুচিয়ে দিচ্ছে। থোড়ের আঁশ জড়িয়ে নিচ্ছে আঙুলের ফাঁকে। এইসব যেন মানুষের পাক প্রণালীর হাজারো সব বিস্ময় তন্তু। বৈষ্ণবীর সাধন প্রণালীর মতো এইসব নেহাত আটপৌঢ়ে ক্রিয়াকর্মেরও কত যে সব গভীর সাধন প্রণালী আছে, তার খোঁজই বা রাখে ক’জন! গুরু শিষ্য পরম্পরায় সেই গুপ্ত মন্ত্রসমূহ সঞ্চারিত হয়ে যায় পল্লবিত শাখার মতো। হরিদাসীর খঞ্জনী বাজিয়ে গানের মতো সেই রান্নার সুবাসও তখন ছড়িয়ে পড়ে ঘরের আনাচে কানাচে।
ওই যে খাটো শাড়ি পরা কিশোরী, ও কী জানে ঋতুতে ঋতুতে কেমন করে জিভের স্বাদে বদল আসে! কেমন করে গাছেরাই চিনিয়ে দেয় হেঁশেলের গতিধারা! চিতই পিঠের জন্য সময়ের মাপ কত, সে কি আর লোকে ঘড়ি ধরে শেখে! কবজির ঘড়ি ধরে রান্নার সময় মেপেছে কবে আর মা, মাসিরা! এই সময়ের মাপ তারা শেখে মন দিয়ে। মনে মনে তখন হিসেবের কাঁটা ঘুরিয়ে তারা হাতঘড়িকে টেক্কা দিতে পারে অনায়াসে। বর্ষার রান্না শিখে নিতে তাকে গাছেদের সঙ্গ করতে হয়। ঠিক যেমন ওই সাধু সঙ্গ! এও যেন তেমনই। কী আশ্চর্য না? কাগজি লেবুর গায়ে কেমন করে বর্ষার গন্ধ লেগে থাকে, থানকুনি পাতারা কেমন নতুন মেঘের জলে তরতরিয়ে বাড়ে, আর ওই যে পুঁইমাচা ওরও কেমন মেঘের মতো ডানা মেলে দিতে ইচ্ছে করে এই শ্রাবণ বিকেলে এসবই তো আত্মস্থ করতে হয়। সাধকের সাধ্য-সাধন তত্ত্বের মতোই এই পরিক্রমণও গভীর অধ্যাবসায়ে আয়ত্ত্ব করে মানুষ। লতা গুল্ম চিনে নিতে হয় শরীরের রোগ ব্যাধির মতো করেই ।
কত দিন ধরে মানুষ এই গাছ লতা গুল্মদের চিনছে, এর যেন শেষ নেই। পাতাল ফোঁড়ের চেহারা দেখে যারা বলে দিতে পারেন বিষক্রিয়ার সম্ভাবনা আছে কি নেই, তারা কি শিক্ষিত সাধক নন? তেমন কত সাধন ভজন বড় নিভৃতে নিরালায় একটেড়ে পড়েই থাকে। তত্ত্বকে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে দিতেই কখন যেন তাকে আর সাধক বলে চেনাই যায় না। উনুনের উত্তাপে যেমন করে কাঠ পোড়ে,কয়লা পোড়ে! এ জীবনও তেমনই। রাঁধুনি বউ ঝি দের তাই আর সাধন ধনে ধনী হওয়া হলো না। কেউ তাদের বললো না, তোমার সাধ্য আর তোমার সাধন বড় চমৎকার। নাহ্ এইসব আবোল তাবোল ভেবে তো আর সমাজ উদ্ধার হবে না, তার চেয়ে বরং কালোজিরা শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে থোড় ছেচকি রাঁধা ভালো। ছেঁচকি নেমে গেলে থানকুনি পাতা বেটে নেবে মৃণাল। মুখিকচুর ডালনা রাঁধবে স্মৃতি আর শিক্ষা মিলিয়ে। যার মধ্যে মিলেমিশে থাকবে সহজানন্দের সুখ। নির্মোহ এই যে সাধন চর্যা এ বড় আনন্দ দেয় মৃণালকে। বোষ্টমীর আধ্যাত্মিক সুখের চেয়ে এ কিছু কম নয় গো! তবু সকলেই কী আর সাধন পথের পথিক হতে পারে? যারা পারে তারা জানে হেঁশেলের এই নিভু আঁচের উনুন, এই লবন মরিচ মাখা ভর্তার স্বাদে মানব সভ্যতার দীর্ঘ সাধনতন্তু জড়িয়ে আছে পাকে পাকে। প্রতিদিনের জীবনে তাকে খুলে নিয়ে হয়, আঙুলে জড়িয়ে নিতে হয় থোড়ের আঁশের মতো করে। রান্না প্রায় শেষ, এবারে থোড় ছেঁচকি নামিয়ে নেবে মৃণাল। ওদিকে হরিদাসী গাইছে, গেয়েই চলেছে। গাও হরিদাসী, গাও। তোমার গান আজ সকালের ছন্দটিকে কোন নতুন তারে বেঁধে দিলো, সে তুমি টেরও পেলে না!
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com