তাহলে শুরু করা যাক গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

সর্ষের তেলের ঝাঁজ চোখে এসে লাগে। তবে, পেঁয়াজ দেয় না কিন্তু। এর পরে আছে সরপুঁটির মরিচ পোড়া ঝোল। পাতলা সোনালি তার রঙ। গরমের দিনে শেষবেলায় থাকে আমড়ার ডাল। খেলেই মুখ পরিষ্কার…
কলকাতা থেকে প্রাণের বাংলার জন্য নতুন একটি ধারাবাহিক লিখতে শুরু করলেন অধ্যাপক অমৃতা ভট্টাচার্য। তিনি বলছেন, এই গল্পের নানা পরিসর। আসলে গল্প তো নয়, গল্পের মতো যে জীবন তারই আখ্যান। আপনারা একে ছাপোষা বাঙালির ভাত ডাল মাছের ঝোলের গল্প বলতে পারেন, সে আপনাদের অভিপ্রায়। লেখা পড়তে পড়তে আমাদেরও মনে হয়েছে তেল-ঝাল-ঝোলের জগত নিয়ে নতুন আস্বাদের এই লেখা প্রাণের বাংলার পাঠকদের রসনাকেও তৃপ্ত করবে।

একেকদিন কাজে যেন মন বসে না। অভ্যস্ত হাত অভ্যাসের দায়ে পড়ে কাজ করে চলে সময়ের পরিমাপে। তবু সেই কাজে মনের ছোঁয়া থাকে না। ভেবে ভেবে মানুষ অবাক হয়, মন ছাড়া কি কাজ হয়! মন দিয়েই তো মানুষ তার পরিশ্রমের ক্লান্তিকে ভোলে! নয়তো এই জগৎ সংসার কি টিকে থাকতো? কে জানে! মৃণালের কিন্তু এর উলটো কথাই মনে হয়েছে বার বার। এই যে ধরো না, আর কদিন পরেই শেফালি গাছখানি ফুলে ভরে যাবে। মৃণাল আর ইন্দু সেই বিকেলে কাপড় বিছিয়ে আসবে গাছতলায়। ভোর না হতেই ভুলের ভুলে ভরে যাবে কাপড়খানি। সেই ফুল ঘরে ঘরে রেকাবি ভরে গন্ধ ছড়াবে কী অপূর্ব সৌরভে। মানুষ সেই সৌরভে আমোদিত হবে বটে কিন্তু সে কি জানতে চাইবে, ওই শেফালি গাছের কি ফুল ফুল ফোটেতে আদৌ ইচ্ছে করে, নাকি সে অভ্যাসের দাসত্বে ফুল ফোটায়, ফুল ঝরায়, বুকের ভিতরের নির্যাস দিয়ে গন্ধ বিলোয় প্রত্যেক শরৎ সকালে! মৃণাল এর কোনো উত্তর জানে না। তবু ওর এইসব আবোল তাবোল ভাবতে ভালোলাগে মাঝে মাঝে।
ওই যে শিউলির মতো নরম দিদিশাশুড়ি, যার গল্প বলতে বসলে গল্প আর ফুরোতেই চায় না, তাঁকে যত দেখে তত যেন মৃণালের এই প্রত্যয়খানি দৃঢ় হয়। দিদিশাশুড়ি মাঝে মধ্যে গল্প বলেন। তাঁর ছোটবেলার সংসার জীবনের গল্প। যার রান্না করার চেয়ে সেলাই করতে ঢের ঢের বাশি ভালো লাগতো। ভালো লাগতো ছবি আঁকতে, মেঝে জুড়ে আলপনা আঁকতে। তবু ফুরসৎ মেলে কই? বাড়ি সুদ্ধু সক্কলে তার রান্নার প্রসংশায় পঞ্চমুখ। শাউড়ি থেকে শুরু করে ভাসুর ভাজ সকলেই বলে, অমন ছেচকি, অমন সূক্তো নাকি আর কারো হাতে খোলে না। কী আর করে তখন দিদিশাশুড়ি! সকলের ভালোলাগা মেটাতেই দিন কাবার। রান্না করতে তার ভালো লাগতো না মোটেও। তবু ওই যে অভ্যাসে কত কী-ই যে হয়! দেখো না কেন, অভ্যাসেই তো ওই মাদারির খেলা দেখানো মেয়েটা দড়ির উপর হেঁটে যায়। তোমরা কি ভেবেছো দড়ির উপর হাঁটতে ওর ভারী ভালো লাগে রোজ রোজ! সংসার মেয়ে মানুষের এই দিনযাপনের ক্রমাগত অভ্যাসকে খুব স্বাভাবিক সহজাত বৃত্তি বলেই ধরে নিয়েছে। তাই কত শত আবদারে আদরে এই পাকঘর এই হেঁশেল আর বাঁধানো উঠোনেই তারা সারা সারা বেলা কাটিয়ে দেবে এমনটাই যেন দস্তুর। এই নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো বিরোধ নেই কোনো মতান্তর নেই। মৃণালের তাই একেকদিন ভালো না লাগলেও অভ্যাস ওকে দিয়ে অনেক কাজই করিয়ে নেয়। যেমন ধরোই না কেন আজ সকালে জলখাবারের পালা মিটতেই মৃণাল মাছ ধুতে গিয়েছিল খিড়কির পুকুরের ঘাটে। বর্ষার ভেজা সিঁড়ির ধারে ধারে জলজ শ্যাওলার আলপনা। বিলাতি আমড়ার ছায়া ওই শ্যাওলাদের বাড়তে দিয়েছে রোজ। কাদের বাড়িতে যেন মালপোয়া ভাজা হচ্ছে মৌরী দিয়ে, বাতাসে তার গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে সকাল সকাল। মৃণালের দিদিমাও ক্ষীরের মালপোয়া ভেজে গোপালকে দিতেন। আজ অনেকদিন পর সেই মালপোয়ার স্বাদ, সেই চন্দন কর্পূরের গন্ধ স্মৃতি হয়ে ফিরে এলো। আপনারা যাকে নস্টালজিয়া বলেন, তার মধ্যে আসলে এক রকমের বিষাদতন্তু মিলেমিশে থাকে। সেই তন্তুবায় মন তখন মাকুখানি গড়িয়ে দেয় গল্প-সদৃশ জীবনের প্রান্তরে। নিজেরাই ভেবে বলুন দেখি, এমন সকালে পুঁই, কুমড়ো আর পটল কুচিয়ে সুপুরির খোল ভরতে ভালো লাগে মানুষের!
তবু, মৃণাল মাথা নীচু করে কাজ করে যায়। কড়াই বসিয়ে বাগাড় দেয়। সেই বাগাড়ের বাস ছড়িয়ে পড়তে পড়তে রান্না শেষ হয় এক সময়ে। দুপুরে ভাত খেতে বসে যারা তারা বলে, কুমড়োর ঘণ্টর কী স্বাদ হয়েছে! আরেকটু দাও গো। অভ্যস্ত হাত তখন তরকারি বেড়ে দেয় আড় ঘোমটার ফাঁকে। আর অনেক দূরে ঘোমটা খসানো মন তখন মাঠ পেরিয়ে বিল পেরিয়ে ফিরে গেছে তার কৈশোরের কাছে। সেই যেখানে গল্পের মাকু গড়িয়েই চলেছে কেবল!

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com