তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বর্ষা তাঁর কবিতা, গান আর লেখায় অসংখ্যবার নানাভাবে উপস্থিত হয়েছে। আর সেই বর্ষাকে সঙ্গী করেই তিনি এই পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছিলেন আজ থেকে ৭৬ বছর আগে। চলে গিয়েছেন আমাদের দৃষ্টিসীমানার ওপারে।আজ সেই বাইশে শ্রাবণ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই দিবসে প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

রবীন্দ্রনাথ জন্ম আর মৃত্যুর মাঝে তফাৎ দেখেছেন খুব সামান্যই। সৃষ্টিই যে এই নশ্বর জীবনকে অবিনশ্বরতা দেয়, সে কথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন বলেই তিনি অমন দৃঢ়তায় বলতে পেরেছেন_ ‘তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি/ সকল খেলায় করবে খেলা এই আমি… আহা,/ নতুন নামে ডাকবে মোরে, বাঁধবে নতুন বাহু-ডোরে,/ আসব যাব চিরদিনের সেই আমি।’

এই পৃথিবীর সঙ্গে তিনি যখন সম্পর্ক ছিন্ন করলেন তিনি তখন ঘড়িতে দুপুর ১২টা বেজে ১০ মিনিট। পৃথিবীর বাতাসে শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন তিনি। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল গভীর শোকের কান্নামথিত বার্তা।

বাইশে শ্রাবণ শিরোনামে অসাধারণ একটা গ্রন্থ লিখেছেন নির্মল কুমারী মহালনবিশ। বাইশে শ্রাবণের আনুপূর্বিক ঘটনার বিস্তৃত এবং বিশ্বস্ত বর্ণনা রয়েছে এই গ্রন্থে। অসুস্থ অবস্থায় রবীন্দ্রনাথের পরিচর্যার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত ছিলেন, নির্মল কুমারী তাদেরই একজন। বাইশে শ্রাবণের সেই বেদনামথিত মুহূর্তগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন ‘জোড়াসাঁকোর আঙিনায় নেমে দেখি জনসমুদ্র পার হয়ে ওপরে যাওয়া অসম্ভব। ওই বাড়ির অন্যান্য অংশও চিনি বলে অন্য রাস্তায় সহজেই ওপরে উঠতে পারলাম। কিন্তু ঘরের ভেতরে পৌঁছার কয়েক সেকেন্ড আগেই শেষ নিঃশ্বাস থেমে গেছে। ভাগ্যের এ কী নিদারুণ চক্রান্ত। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার কাছে থাকব বলে যে সত্য করেছিলেন এত প্রাণপণ চেষ্টা করেও তা রক্ষা করতে পারলাম না।…

অমিতা আমাকে বলল, আর একটু আগে এসেও যদি আপনি পৌঁছতে পারতেন। ঠিক শেষ মুহূর্তের আগে ডান হাতখানা কাঁপতে কাঁপতে ওপরে তুলে কপালে ঠেকাতেই হাত পড়ে গেল।

একটু পরে সেবক-সেবিকারা ছাড়া আর সবাইকে ঘর ছেড়ে চলে যেতে বলা হলো। গুরুদেবকে স্নান করানো, সাজিয়ে দেবার কাজ এখনো তো বাকি আছে। সেবা তো সমাপ্ত হয়নি।…’

নির্মল কুমারী মহালনবিশের মতো মৈত্রেয়ী দেবীও ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অতি কাছের মানুষ। তবে রবীন্দ্রনাথের শেষের দিনগুলোর পুরোটা সময় তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছাকাছি থাকতে পারেননি। এমনকি পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীও পারেননি।জোড়াসাঁকোর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের যখন অপারেশন হয় সেই সময়টাতে মৈত্রেয়ী দেবী ছিলেন হিমালয় পাহাড়ের নিভৃত অঞ্চল মংপুতে। তার স্বামীর সংসারে। তখন বর্ষাকাল। পাহাড়ি রাস্তায় প্রচণ্ড ধ্বস নেমেছিল। তাই যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল।কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তিনি পাহাড় থেকে নামতে পারছিলেন না। রেডিও, টেলিফোন, টেলিগ্রাম ও চিঠিপত্রের মাধ্যমে তিনি রবীন্দ্রনাথের খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এই অবস্থায় তিনি কলকাতা থেকে লেখা তার এক মাসির চিঠি পান। চিঠিটি এ রকম,

‘‘জোড়াসাঁকোতে রোজই ফোন করি। ওরা সর্বদা বলে ভালো আছেন। কিন্তু আমি জানতে পেরেছি কবির জ্বর আছে অস্থিরতা বেড়েছে। এখন তুই কী করবি? আমার মতে দার্জিলিং ঘুরে চলে আয়। আর যদি সে রাস্তাও বন্ধ থাকে, তবে আর কী করবি। ভগবানের নাম নিয়ে পড়ে থাক। … শুধু শেষ সময় যদি এসে থাকে। সে সময়ে কাছে না থাকলে তোর তো কষ্ট হবেই, আর ভালো হয়ে উঠলেও উনি কিন্তু মনে মনে খুব দুঃখ পাবেন।’’

এই চিঠি পাওয়ার পর মৈত্রেয়ী দেবী আর দেরি করেননি। সমস্ত দুর্যোগ মাথায় নিয়ে। সমস্ত প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ করে শিশুকন্যা মিস্টকে কোলে নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে এসেছিলেন। কিন্তু শিলিগুড়ি রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছেই জানতে পারলেন কবি আর বেঁচে নেই। সব শেষ হয়ে গেছে। সেই উন্মত্ত ও দিশেহারা অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে মৈত্রেয়ী লিখেছেন, ‘ট্রেন চলছে। আমার কোলের ওপর অভুক্ত কন্যশিশু ঘুমাচ্ছে। আমি বসে বসে আমার আবাল্য সুহৃদ মাসির কথা ভাবছি। সে লিখেছেন। উনি যদি জেগে ওঠেন, কষ্ট পাবেন। ভাবছি পেয়েছিলেন কি?’

রবীন্দ্রনাথের এসব কাছের মানুষের পাশাপাশি দূরের এক বিদেশী পণ্ডিত বাইশে শ্রাবণ ও তার আগে-পরের বেদনাবিধুর দিনগুলোর অভিজ্ঞতা আশ্চর্য নিষ্ঠার সঙ্গে আপন অন্তরে ধারণ করে রেখেছিলেন। তিনি জার্মান ইহুদি পণ্ডিত আলেকস আরনসন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমন্ত্রণে ১৯৩৭ সালে তিনি ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে শান্তিনিকেতনে যোগ দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর তিন বছর পর পর্যন্ত তিনি সেখানে কর্মরত ছিলেন। পরে ওই সময়ের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি কিছু চমৎকার লেখা লিখেছিলেন।

‘তার মৃত্যু যখন আসন্ন, তখন তাকে আশ্রম ত্যাগ করে কলকাতা যেতে হয়। সেই সময়ে গাড়িতে বসে ছাত্রদের উদ্দেশে যেভাবে তাকিয়েছিলেন, সেই সময়ের মুখের ছবিটি আমার মনে পড়ে। এটা হচ্ছে এমন এক মানুষের মুখ, যিনি জগতের সঙ্গে একটা শান্তির সম্পর্কে যুক্ত। এই জগৎ ত্যাগ করতে হচ্ছে বলে তার মনে দুঃখ আছে। তা সত্ত্বেও ভাগ্যের নির্দেশ শান্তভাবে তিনি গ্রহণ করেছেন। তার মুখমণ্ডলে করুণা এবং শান্তির একটি অপরূপ আভা বিকিরিত হচ্ছিল।

এক বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় তার ভস্মাধার আশ্রমে আনা হলো, তিনি কলকাতায় মারা গিয়েছিলেন। তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান একটি প্রকাণ্ড শোকের অনুষ্ঠান হিসেবে সম্পন্ন হয়েছিল। আমরা নীরবে ভস্মাধারটি গ্রহণ করেছিলাম। কোনো ভাষণ, বক্তৃতা ছিল না। ছিল না কোনো শোকোচ্ছ্বাস অথবা অতিরিক্ত দুঃখ প্রকাশের ফিরিস্তি। আমি আমার ছাত্রদের মধ্যে দাঁড়িয়ে এই অভিনব মৌনতার মধ্যে ডুবে গিয়েছিলাম।

সাহিত্য ডেস্ক

ছবিঃ গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com