ডিনার উইথ জুলিয়া

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নীনা হাসেল (ভ্যাঙ্কুভার থেকে)

রোববারটা এত ব্যস্ততায় কেটেছে যে ভুলেই গিয়েছিলাম যে জুলিয়া কে বাড়িতে খেতে বলেছি। হাতের কাজগুলি শেষ করে ইমেইল খুলতেই ওর জবাব পেলাম। জানতে চেয়েছে ডিনার ক’টায়? ওকে ছ’টায় আসতে বলে বাজার করতে ছুটলাম। ও আবার নিরামিষভোজী। ফার্মগেট থেকে তাজা শাকসবজি কিনলাম। ফিরে দাড়াতেই দেখি জুলিয়া। দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল আমাকে। ও আমাকে জিজ্ঞেস করলো আমার সঙ্গে ও আসতে পারে কিনা? আমি বললাম চলো “আমি রান্না করবো আর তুমি দেখবে। ঘরে ঢুকে হাতের জিনিষ নামিয়ে রাখতেই ও মিষ্টি করে হেসে আমার কাছে দুটি বাটি চাইলো। ওকে একটি বড় ও ছোট বাটি দিলাম। ও একটি প্যাকেট খুলে বড় বাটিতে ঢাললো কর্ণ চিপস আর ছোট বাটিতে বৈয়ম খুলে ঢাললো মেক্সিকান সালসা। সালসা তৈরি করা হয় টমেটো পিয়াজ, ধনেপাতা ও লেবুর রস দিয়ে। চিপস ডুবিয়ে খানিকটা সালসা তুলে নিয়ে খেতে হয়।

এ দেশের এটাই নিয়ম। কেউ যদি কারো বাড়ীতে দাওয়াত পায় প্রথমেই জিজ্ঞেস করে, কি আনবো? সবাই নিজেদের ওয়াইন নিয়ে আসে।যদি মেন্যুতে মাছ থাকে তাহলে সাদা ওয়াইন আর মাংস থাকলে লাল ওয়াইন। নিরামিষের সঙ্গে লাল সাদা দুটোই চলতে পারে। জুলিয়া এনেছে চিপস আর সালসা।

রান্না করতে করতে দুজনে গল্প করছিলাম আর চিপস খাচ্ছিলাম। জুলিয়া তার রেস্টুরেন্টের কাজের অভিজ্ঞতার গল্প করছিলো। আয়ল্যান্ডের অধিকাংশ মানুষ এখন ওকে চেনে। কেউ কেউ ওর বন্ধু হবার বাসনা ব্যক্ত করেছে ইতিমধ্যে। তাদের মধ্যে আছে তরুণ ও মধ্য বয়সী লোকজন। এটাকে কেউ দোষের মনে করে না। জুলিয়া তাঁদের স্বচ্ছন্দে না বলে দিতে পারে। তাতে কেউ ওর প্রতি মনক্ষুন্ন হবে না। এসবে এখানকার পুরুষদের ইগোতে আঘাত লাগে না। জুলিয়ার আপাতত কোন সম্পর্কে জড়াবার ইচ্ছে নেই।  সে এখানে এসেছে ভাবতে। এসেছে নিজেকে জানতে ও বুঝতে।

একটু একটু করে স্বল্প কথায় জুলিয়া নিজেকে প্রকাশ করছিলো। আমার প্রতি ওর ইতিমধ্যে এক ধরনের বিশ্বাস গড়ে উঠেছে বুঝতে পারছিলাম। আমি নিজেও ওর সঙ্গে বেশ স্বচ্ছন্দ হয়ে গেছি। ও ক্যানাডায় এসেছিলো স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে। ভ্যাঙ্কুভার ব্রিটিশ কলাম্বিয়াতে এসে ওর খুব ভালো লেগে গিয়েছিলো। ইউবিসিতে পড়বার সময় একজনকে ভালো লাগে প্রেম হয় তারপর বিয়েও করেছিল। তখন ওর বয়স ছিল বাইশ।

রান্না শেষ হতে হতে প্রায় সাতটা বেজে গেলো। ও আমাকে টেবিল সেট করতে সাহায্য করলো। আমি ওকে গ্লাস থালা কাঁটা চামচ ও ছুড়ি এগিয়ে দিলাম। ও টেবিল থেকে আমার কাগজ কলম বই সরিয়ে প্লেস ম্যাট বিছিয়ে টেবিল সাজালো। খাবারের আয়োজন ছিল খুবই সাধারণ। ওর বাঙালি রান্নার সঙ্গে পরিচয় হলো। ভাতের সঙ্গে সব্জি দিয়ে রান্না করা ডাল,  ফুলকপি, আলু, বেগুন, মটরশুঁটি আর ডালের বড়ি দিয়ে নিরামিষ আর জুক্কিনি ভাজা। বাঙালি রান্নার সঙ্গে ও কখনো ডালের বড়ির তরকারী খায়নি। যদিও ভারতীয় খাবারের সঙ্গে ওর পরিচয় আছে। ছোটবোন সারা পাঠিয়েছিল খানিকটা ডালের বড়ি সেই কবে শেষ পর্যন্ত রত্না সেগুলো নিয়ে এসেছিল মাস খানেক আগে। ভুলেই গিয়েছিলাম ডালের বড়ির অস্তিত্ব। জুলিয়াকে নিরামিষ আমিষকে ঘনত্ব দেবার জন্য বেশ খানিকটা ডালের বড়ি দিলাম নিরামিষে। ও বেশ মজা করে খেলো বড়ির তরকারী। বাঙালী স্টাইলে একটু পাতলা করে রান্না করা সবজী ডাল ওর এই প্রথম খাওয়া। খাওয়া জমে উঠেছিল সেই সঙ্গে গল্প। ও ওয়াইনে ছোট ছোট চুমুক দিতে দিতে কথা বলছিল।

ওর স্বামীর কথা বলতে গিয়ে মুহূর্তের জন্য চোখে একটু ম্লান ছায়া দেখা দিয়ে চকিতেই মিলিয়ে গেল। ও খুব সহজ ভাবেই ওর ডিভোর্সের কথা জানালো আমাকে। স্বামীকে কোন দোষারোপ করলো না। নিজের ভাগটুকুও অস্বীকার করলো না।। সম্পর্কের সংঘাত বা ডাইনামিকসটা অনেকটাই বুঝতে পারে দেখলাম।

পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে নারী ও পুরুষের  মধ্যে যে সংঘাত ঘটে তা শুধু পুরুষ ও নারীর পাওয়ার আনব্যালান্সের জন্যেই নয় তার অধিক আর একটা দিক আছে যা নারী পুরুষের রিলেশনশিপ ডাইনামিকস। এই দুইয়ের সম্পর্কের জটিলতার পেছনে শুধু পিতৃতন্ত্র একা নয় মানবিক মনস্তাত্বিক দিকটাও আমাদের অজ্ঞাতসারে ব্যাপকভাবে আকৃতি দিয়েছে যা ন্যাচারাল সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের ব্যবহার-আচরণ অনেক সময় আমাদের অজ্ঞাতসারেই কাজ করে। এবং এ বিষয়ে আমরা একেবারেই সচেতন নই। আমরা কেউই ক্লিন স্লেট নিয়ে জন্মাই না। এই স্লেটে অদৃশ্য চকখড়িতে অনেক কিছুই লেখা হয়ে গেছে। আমাদের মনস্তত্বও বিবর্তনের ফল।

আগেই উল্লেখ করেছি জুলিয়ার জন্ম জার্মানিতে। বড় হয়েছে স্বচ্ছল পরিবারে। মা অস্ট্রেলিয়ান বাবা জার্মান। যদিও দু’জনেই পশ্চিমা সংস্কৃতির মানুষ তবু দুজনের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে।যদি দুই পরিবারের ভিন্ন সংস্কৃতি অর্থ প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব কিছু স্বাতন্ত্র থাকে সে নিয়েও সংঘাত হতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বড় হওয়া। তাঁদের বাবা মায়ের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার জের টানা সংক্রমিত হয়েছিল স্বভাবতই জুলিয়ার বাবা মায়ের মধ্যেও।ভালবাসার মধ্যে সংঘাত থাকে। জুলিয়ার বাবামায়ের সংসারেও তা ছিল।দুজনেই প্রথাগত বিয়ে ও স্ংসারে বিশ্বাস রেখে সংসার ধর্ম পালন করেছেন। তাঁদের পারিবারিক ব্যবসাতে সাফল্য এসেছে। ছেলে মেয়েদের মানুষ করেছেন।

জুলিয়া বিয়ে করেছিল যখন ওর বয়স ছিল বিশের ঘরে। বিয়েটা টেকেনি। একজন আর একজনকে দোষ দিলেও জুলিয়া তা কাটিয়ে উঠেছে। ও ওর বাবা মার মত বিবাহিত জীবনের ধারায় পড়তে চায়নি। জুলিয়া পোস্ট মডার্ন সময়ের মেয়ে। সে তার মূল্যবোধে ট্রইয়াডিসনের চাইতে ফেয়ারনেস, আত্মসম্মান, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মুল্য আগে। এই মুল্যবোধ নিয়ে তার অন্তরঙ্গ সম্পর্কের মধ্যে সমঝোতা ও ব্যলান্স ঘটেনি বলেই ওরা দুজনে সমঝোতার মাধ্যমেই বিচ্ছেদ ঘটইয়েছে। দুজনে নিজ নিজ পথ বেছে নিয়েছে।

খাওয়া শেষ হবার পরও শূন্য প্লেট সামনে নিয়ে বসে বসে গল্প করলাম রাত দশটা অব্দি। জুলিয়ার সঙ্গে আমার পরিচয় এক মাসের মত।  দুজনের মধ্যে এক ধরণের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। সেই সম্পর্কে বিশ্বাস ও ভালবাসা রয়েছে কিন্তু কোন বন্ধনের ভার নেই। ও হয়তো মেইন আয়ল্যানডে খুব বেশীদিন থাকবে না অন্যকোন নতুন জায়গায় যাবে। কাজ করবে শিশুদের নিয়ে। বই লিখবে। ছেড়াখোরা কাপড়চোপড় আর মায়ের হাতে বোনা ভারি উলের কার্ডিগানের আরাম জড়িয়ে বিছানায় বসে টাইপ করবে। মাঝে মাঝে ভাববে তার ফেমিনিন আর্কিটাইপ নিয়ে। হয়তো নৃতাত্বিক ইতিহাসে নারীর অবস্থান নিয়ে।

ছবিঃ লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com