ডায়রিয়া ও তার প্রতিকার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল

আমাদের দেশে ডায়রিয়া খুব সাধারণ এক স্বাস্থ্য সমস্যা।তবে ঋতু বদল আর বর্ষাকালে পানিবাহিত এই রোগ ঘরে ঘরে দেখা যায়।   সাধারণভাবে বারবার পায়খানা হলে এবং পায়খানা পানির মতো তরল হলে তাকে ডায়রিয়া বলে। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় দিনে তিনবারের বেশি পায়খানা হলে কিংবা পায়খানা তরল বা নরম হলে এবং বারবার পায়খানা হলে তাকে ডায়রিয়া বলে। পায়খানা করার ইচ্ছা এবং পায়খানা ধরে রাখতে না পারা যেকোনো ধরনের ডায়রিয়ার সাধারণ বৈশিষ্ট্য

ডায়রিয়া দু’ধরনের হয়। যেমন- তীব্র ডায়রিয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া।

কারণ হিসেবে

* সংক্রামক ডায়রিয়া
ভাইরাসজনিত, যেমন- রোটা ভাইরাস, এস্ট্রো ভাইরাস, এডেনোভাইরাস ইত্যাদি।
ব্যাকটেরিয়াজনিত যেমন-সালমোনেলা, শিগেলা, ই কলাই, ভিব্রিও কলেরি, ক্যামপাইলোব্যাকটর ইত্যাদি।
পরজীবীজনিত যেমন- জিয়ারডিয়া, ক্রিপটোসপরিডিয়াম, সাইক্লোসপরা ইত্যাদি।
* অসংক্রামক ডায়রিয়া
কিছু অসুখ যেমন-ডাইভার্টিকুলাইটিস, পায়ুপথে বা অন্ত্রে ক্যান্সার, আইবিএস, আলসারেটিভ কলাইটিস ইত্যাদি।
কিছু ওষুধ যেমন- ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ এন্টাসিড, বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক, জোলাপ ইত্যাদি।

দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া
জিয়ারডিয়া ইনটেসটিনাথিস
স্ট্রংগিলয়ডিয়াসিস
এনটারোপ্যাথিক ই. কলাই
খাদ্য হজম না হওয়া
অন্ত্রের কৃমি ইত্যাদি।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা
তীব্র ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে-
-পায়খানার রুটিন ও কালচার পরীক্ষা
– সিরাম ইলেকট্রোলাইটস।
দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে-
-রক্তের রুটিন ও কালচার পরীক্ষা
-পায়খানার রুটিন ও কালচার পরীক্ষা
– বিশেষ ক্ষেত্রে সিগময়েডস্কপি।
চিকিৎসা ব্যবস্থা
তীব্র ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে-
-তীব্র এবং সম্ভাব্য সংক্রামক ডায়রিয়ার সব রোগীকে আলাদা ঘরে রাখতে হবে যাতে পরিবারের অন্য কারো মধ্যে এটা ছড়াতে না পারে।
-তীব্র ডায়রিয়ার চিকিৎসায় প্রধানত তিনটি ব্যবস্থা নেয়া হয়-
– তরল প্রতিস্থাপন
– অ্যান্টিবায়োটিক অথবা জীবাণুবিরোধী ওষুধ
-ডায়রিয়াবিরোধী ওষুধ।
তরল প্রতিস্থাপন
ডায়রিয়ার চিকিৎসার প্রধান লক্ষ্য হলো পানির ঘাটতি পূরণ করা এবং পুনরায় যাতে পনিশূন্যতার সৃষ্টি না হয় সে ব্যবস্থা করা। এ সামান্য ও মাঝারি ধরনের পানিশূন্যতার ক্ষেত্রে খাবার স্যালাইনের মাধ্যমে পানিশূন্যতা পূরণ করা সম্ভব। রোগীর যতবার পাতলা পায়খানা হবে, ততবার রোগীকে খাবার স্যালাইন খেতে হবে। খাবার স্যালাইনের পাশাপাশি রোগীকে অন্যান্য তরল ও পানীয় খেতে দিতে হবে।
মারাত্মক পানিশূন্যতার ক্ষেত্রে রোগীকে শিরাপথে স্যালাইন দিতে হবে।
অ্যান্টিবায়োটিক/জীবাণুবিরোধী ওষুধ
ডায়রিয়ার চিকিৎসায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগী তরল ও ইলেকট্রোলাইট প্রতিস্থাপনে ভালো হয়ে যায়, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের খুব একটা প্রয়োজন হয় না। তবে কলেরা সন্দেহ হলে, জ্বর থাকবে কিংবা পায়খানার সাথে রক্ত গেলে পায়খানা পরীক্ষা করে সঠিক জীবাণু নির্ণয় করে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা ভালো।
কলেরার ক্ষেত্রে টেট্রাসাইক্লিন দৈনিক প্রতিকেজি শারীরিক ওজনে ৫০ মিগ্রা বিভক্ত মাত্রায় ৩ দিন। অথবা ফুরাজোলিডন দৈনিক প্রতি কেজি শারীরিক ওজনে ৫ মিগ্রা চারবার বিভক্ত মাত্রায়Ñ ৩ দিন। অথবা ইরাইথ্রোমাইসিন দৈনিক প্রতি কেজি শারীরিক ওজনে ৩০ মিগ্রা চারবার বিভক্ত মাত্রায়Ñ ৩ দিন।
শিগেলোসিসের ক্ষেত্রে ন্যালিডিক্সিক এসিড দৈনিক প্রতি কেজি শারীরিক ওজনে ৫৫ মিগ্রা চারবার বিভক্ত মাত্রায় ৫-৭ দিন। অথবা কোট্রাইমক্সাজল দৈনিক দু’বার ৭ দিন। বিকল্প হিসেবে এমপিসিলিন অথবা পিভমেসিলিনাম ব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যামিবিয়াসিসের ক্ষেত্রে মেট্রোনিডাজল দৈনিক প্রতি কেজি শারীরিক ওজনে ৩০ মিগ্রা ৫-১০ দিন অথবা টিনিডাজল দৈনিক প্রতি কেজি শারীরিক ওজনে ৬০ মিগ্রাÑ ৩ দিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
জিয়ারডিয়ার ক্ষেত্রে মেট্রোনিডাজল দৈনিক প্রতি কেজি শারীরিক ওজনে ২০ মিগ্রাÑ ৫ দিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
ডায়রিয়াবিরোধী ওষুধ
ডায়রিয়াবিরোধী ওষুধ ব্যবহারে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। সংক্রামিত পাক-আন্ত্রিক প্রদাহ থাকলে এসব ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না। পায়খানার সাথে রক্ত গেলে অথবা শিশুদের আমাশয়ের ক্ষেত্রে এসব ওষুধ ব্যবহার করলে ক্ষতি হতে পারে।
সাধারণভাবে ডায়রিয়াবিরোধী ওষুধের মধ্যে লোপারামাইড (খড়ঢ়বৎধসরফব) বেশি ব্যবহৃত হয়। তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে প্রথমে ৪ মিগ্রা একত্রে, তারপর প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ২ মিগ্রা দেয়া যেতে পারে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে ওষুধটি দেয়া যাবে না।
দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে
ডায়রিয়ার সঠিক কারণ নির্ণয় করে তার চিকিৎসা প্রদান করতে হবে। যদি কোনো কারণ পাওয়া না যায় তাহলে জিয়ারডিয়া ল্যাম্বলিয়ার সংক্রমণের চিকিৎসা দিলে উপকার পাওয়া যায়।
ভ্রমণের সময় ডায়রিয়া হলে সিপ্রোফ্লোক্সাসিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রতিরোধ
ডায়রিয়া প্রতিরোধে স্বাস্থ্য সচেতনতাই প্রধান। ডায়রিয়া রোগের সাথে ঘনবসতি এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও দুর্বল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে। দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ডায়রিয়া ছড়ায়। মাছি ডায়রিয়ার জীবাণু ছড়াতে সাহায্য করে। তাই এসব ব্যাপারে সতর্ক থাকলে এবং কঠিনভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চললে ডায়রিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com