ডাকনামে ডাকার মানুষগুলোকে হারিয়ে ফেলি আমরা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস,সঞ্চালক ও বাচিক শিল্পী

একটা ডাকনামের বড্ড দরকার.. ভালো নাম যদি নাও থাকে, তেমন কি আর অসুবিধে! ভালোনামের দরকার তো কাজের প্রয়োজনে! ‘মিস্টার অমুক’ বা ‘ মিস্ তমুক’ বলেও তো কাজ চালানো যেতে পারে; কিন্তু ডাকনাম না থাকলে, কাছের নাম না থাকলে ভালোবাসার শব্দরা কাছে আসবে কি করে! আদুরে ডাকনামেই তো আদর আসে, তবেই তো ভালোবাসায় বাস করা যায়… ছোট থেকে বড় হবার বিভিন্ন ধাপে বিবিধ ডাক আসে, ভালোবেসে কত নাম আসে; তারপর একসময় তা দূরেও চলে যায়… ডাকনামে ডাকার মানুষগুলোকে হারিয়ে ফেলি আমরা… ডাকগুলোকে হারিয়ে ফেলি… ডাকনামগুলোও হারিয়ে যায়…যতই বলি না কেন পোশাকী নামে কি আসে যায়, একটা সময় দেখা যায় শুধু পোশাকী নাম-কাজের নামটুকুই সম্বল… কাছেরটুকু কবেই দূরের হয়ে গেছে! আগে অনেকসময়েই পরিবারের নিজস্ব পরিচয় মিলতো নামের মধ্যে; পারিবারিক নাম ব্যবহারের চল ছিল তখন; ছেলেদের ক্ষেত্রে প্রসাদ, প্রকাশ, রঞ্জন, কুমার বসতো নাম এবং পদবীর মাঝে; এখনও হয়ত কিছুক্ষেত্রে এর চল আছে; তখন নাম নিয়ে বিস্তর মাথা ঘামানো বা সময় ব্যয়ের চল তেমন ছিলনা বললেই চলে! এখন, যে আসতে চলেছে তার নাম নিয়ে বহু আগে থেকেই শুরু হয় জল্পনা কল্পনা; নামের পর নামের ভিড়; কোনটা ছেড়ে কোনটা বাছি! নানাভাষার অভিধানের পাতা উল্টোনো, গুগুলের সার্চ ইঞ্জিনের অক্লান্ত পরিশ্রম আর বহু গোলটেবিল বৈঠকের পর বিপুল ভোটে জয়ী হয় নাম-ভালো এবং ভালোবাসার-ডাকনাম… ছোট থেকেই বড়সড় নামের দিকেই রিনুর ঝোঁক! বেশ বড় একটা নাম। বড়সড় তার অর্থ! সঙ্গে মানানসই ছোট নাম! ডাকনাম আর কি! নিজের নামের দুঃখ ভুলতে রিনু তার ছেলের নাম ঠিক করতে বসে সে আসার বহুদিন (বছর) আগেই! ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ই মনে মনে ঠিক হয়ে যায়, যদি ছেলে হয় নাম হবে ‘রৌণক’… ছেলে মানেই মায়ের নামঘেঁষা নাম হবে-এমনটাই ভাবতো (ভাবে) রিনু! পরে ‘রৌণক’ এর আগে বসে ‘ঋক’.. গোর্কির ‘মাদার’ পড়ে মনে মনে সেই কবে ছেলের ডাকনামও ভেবে ফেলে রিনু! ‘পাভেল’… ঘুরে ফিরে ‘পাভেল’কে তার বড় আপন মনে হয়! বাস্তবে অবশ্য ‘পাভেল’ নয়, পুত্রের ডাকনাম হয় ‘পাবলো’… ঠিকই আন্দাজ করেছেন,এ নামটিও পূর্ব নির্ধারিত! এবং এরও নির্দিষ্ট অনুসঙ্গ আছে! মায়ের ঠিক করা ভালোনাম-ডাকনামের পরেও রিনুর পুত্রের ‘অষ্টোত্তর শতনাম’ !!! দিয়া(দিদা)র মহারাজ, দাদাই(দাদু)-এর দাদাই, গোলুয়া(মামা)র গোলুয়া, ঘন্টা, তাতা(কাকা)র ঋষ, মেজদিদি-দাদানের প্রিন্স, সোনাদাদা(ছোটদাদু)র পাবলোদাদা, সোনাদিদি(ছোটদিদা)র দাদুভাই, ঠাম্মার দাদুভাই, দাদুভাই (ঠাকুরদাদা)-এর বালক, বড়মামা-মানির গুবলু, দোলমিম্মিম-মেসোমণির গুন্ডা, ছোড়দিভাইয়ের ভাইয়ু, বড়দিভাইয়ের ভাইটু, বাপির বাবাসোনা, বাপিসোনা, মায়ের পাবলো, সোনাবাবা, গজ, মিঠাই, পুটুলি, পটাশ, বাবুলাল, পুটুলাল, গুটুলিয়া ইত্যাদি ইত্যাদি এবং ইত্যাদি! সবার তো এমন সৌভাগ্য হয়না, কখনও কখনও ভালোনামকেই কাটছাঁট করে ডাকা শুরু হয়; তাই হয়ে যায় ডাকনাম! রিনুর ক্ষেত্রে তেমনই ঘটেছিল! ভালো নামকেই একটু বদলে হয়েছিল ডাকনাম! একটা ‘ই-কার’ বদলে ‘উ-কার’..রিনু এযাবৎ এ নিয়ে বারবার ঠোঁট ফুলিয়েছে! কেন এ কার্পণ্য! একে তো এইটুকু একটা নাম! শুরু হওয়ার আগেই শেষ! তার উপরে সেটাই ঘুরেফিরে ডাকনামও! এ আফশোস রিনু কোথায় রাখে! ছোট থেকে বড় হওয়ার মধ্যে ঘুরেফিরে এই নামকাহিনী (দুঃখের কাহিনী) রিনু সুযোগ পেলেই শুনিয়েছে তার আশপাশের সকলকে! কেউ কেউ তা শুনে নিজের মত করে নাম দিয়েছেন রিনুকে… ডেকেছেন সেই নতুন নামে… এভাবেই ‘রিনু’ কখন যেন ‘রাই’ হয়ে গেছে ভালোবাসার মানুষটার ডাকে… প্রাপ্তির পাল্লা ভারী হয়েছে কিঞ্চিৎ; নাম নিয়ে হু হু মনকেমন অল্প হলেও কমেছে এরপরে! যেমন নতুন কিছু নাম যোগ হয়েছে জীবনে, তেমন কত নাম হারিয়েও গেছে সময়ের সঙ্গেই! বাবার আদরের ডাক ‘মামাই’ এখন আছে কেবল ছোটবেলায় বাবারই উপহার দেওয়া বইয়ের প্রথম পাতায়… নামটা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি যদিও, বড় মেসোমশাই আজও মামাই বলেই ডাকেন রিনুকে… রিনু কারুর ‘মহারানী’ ছিল কখনও… দিদা, যাঁকে রিনু ডাকতো মাম্মাম-তিনি রিনুকে ডাকতেন মহারানী বলে; ক’বছর আগে সব ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন মাম্মাম, চলে গেছে মহারানী ডাকটাও! পুঁচকি ডাকটাও কতদিন শোনেনি রিনু; খুব ভালোবেসে কোন এক মা রিনুকে পুঁচকি ডাকতেন… এখন সেই ডাকটা নেই, নৈকট্যও নয়… নাম নিয়ে একটা মজার ঘটনা মনে পড়ে রিনুর .. তার স্কুলজীবনের এক অমূল্য সময় কেটেছিল বাবার প্রিয় বাংলার মাস্টারমশাই-সাহিত্যিক শ্রী নীরেন্দ্র গুপ্তর সান্নিধ্যে… বাবা বরাবর চেয়েছেন মেয়ে নিজের ভাষা শিখুক ভালো করে;তাই নিজের মাস্টারমশাইয়ের কাছে গিয়ে, রীতিমত অনুরোধ করে তাঁকে রাজি করিয়েছিলেন মেয়েকে বাংলা পড়াতে… (প্রসঙ্গত, অন্যান্য সব বিষয় মা এবং বাবার কাছেই পড়তো রিনু; ক্লাস এইটে ‘ভাস্করদা’র কাছে বছরখানেক অঙ্ক করা বাদে সেভাবে আর কোন টিউটর রিনুর ছিলনা!) স্যর বাড়িতে আসতেন। ঘন্টাখানেক থাকতেন.. কোথা দিয়ে যে সেই একঘন্টা কেটে যেত! টকটকে ফর্সা, সৌম্যদর্শন মাস্টারমশাই; ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবী পরতেন সবসময়; ইতিহাসের বইয়ের পাতার বুদ্ধদেবের কথা মনে পড়তো স্যরকে দেখলেই! অমন মহাপুরুষদের ছবির মত আঁকা প্রশস্ত কান রিনু আর কখনও দেখেনি! শুধু বাংলাই নয়, মাধ্যমিকের পরের তিনমাস স্যরের কাছে সংস্কৃত পড়েছে রিনু; রিনুর এহেন কাহিনী শুনে স্যর বলেছিলেন ‘ছোট নাম পছন্দ না তোমার? বেশ তো এবার থেকে তোমাকে ‘লবঙ্কলতিকা শতদলবাসিনী’ বলেই ডাকবো তবে’!! বলাই বাহুল্য স্যরের সামনে ভুলেও কোনদিন আর নাম নিয়ে টুঁ শব্দটিও করেনি রিনু! আত্মীয়বন্ধুদের ভালোবেসে নিজের মত নাম দিয়ে ডাকতে রিনু ভালোবাসে; তাই দিদিভাইয়ের মেয়ে তার কাছে মুনিয়া; দাদামণির মেয়ে রানীয়া; তাই সে ছেলেকে শেখায় পিসিদের পিয়া, মাসিদের মিমি ডাকতে; কাকা হয় তাতা; মামারা হয় মামুন; মামী হয় মানি… পিসির ডাকনাম মাম্পি, ছেলেকে রিনু শেখায় তাকে মাম্পিয়া ডাকতে; পিসান হয় পিসেমশাই; ভাইয়ু হয় পিসতুতো ভাই উপমন্যু! মিম্মিম হয় পারমিতা মিমির মেয়ে আদিরা…এখন কেবল পোশাকী ডাকের বাইরেও কিছু ডাককে জাপটে রাখার লোভেই সামনে তাকানো… কে না জানে ওইসব ডাকের জন্যই তো বেঁচে থাকি আমরা… ডাকনামের জন্যই যে বাঁচার ইচ্ছে হয় রোজ…ডাকনামের যে বড্ড দরকার… নাই বা থাকলো কোন ভালোনাম, গোটাজীবনে একটাও যদি মনের মতো ভালোবেসে ডাকার নাম পাওয়া যায়, তাহলে আর কিসের অপূর্ণতা….

 ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com