ঠোঁট দিয়ে প্রথমবার রিনু স্পর্শ করলো তার ভবিষ্যতকে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস,সঞ্চালক ও বাচিক শিল্পী

গাঢ় সবজে রঙের পিঠকাটা একটা জামা। পিঠে ফিতে বাঁধা। কোমর থেকে পেঁচানো আরেকটা কাপড়। খানিকটা স্কার্টেরই মত; সেটার রঙও একই! রিনু পোশাক পরে তৈরি.. স্ট্রেচার এলো কেবিনে! যারা এসেছে সবার মুখে ভয়ের ছাপ! তবু মুখটা হাসিহাসি করার আপ্রাণ চেষ্টা! ভয়টুকু রিনুকে দেখাতে কেউই চায়না! পাছে রিনুও ভয় পায়! এতক্ষণে রিনুও ভয় পেতে শুরু করেছে! ইঞ্জেকশনে রিনুর আজন্ম ভয়! সূঁচ ফোটাবে ভাবলেই তার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে! রিনু শুনেছে শুধু অনেক ইঞ্জেকশনই নয়, স্যালাইনও দেবে চ্যানেল করে! হাতে একটা সূঁচ নাকি আটকানো থাকবে দিন কয়েক! এবার ভয়ে রিনুর আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হবার উপক্রম! পাশের কেবিনের মেয়েটির হাতে কোন সক্কালবেলা চ্যানেল করা হয়ে গেছে! রিনু সাহস করে সিস্টারকে জিগ্যেস করলো ‘এখনই কি চ্যানেল করবে?’ সে ঝটপট উত্তরে বললো ‘ম্যাডাম( মানে ইলোরাদি) বলেছেন যা কান্নাকাটি ও টি-তেই হবে!’ এই সেরেছে! কান্নাকাটি! মানে যতটা রিনু ভাবছে তার চেয়েও ভীতিপ্রদ কিছু ওই ওটিতে অপেক্ষা করছে! ভয়ে রিনু বেশি বেশি বকবক করতে শুরু করলো! একবার মেসোমশাই, একবার মামা তো একবার মায়ের সঙ্গে বকরং বকরং! মামা বললেন ‘রিনুর ভয় করছে বুঝি! হুম্, ঠিক বুঝেছি, নার্ভাসনেস কাটাতেই এত কথা!’ রিনুকে কেবিন থেক বের করে নিয়ে যাওয়া হল ‘রিকভারি রুমে’.. সার বেঁধে হবু মায়ের দল সেখানে অপেক্ষায়.. নির্দিষ্টি ওটিতে নির্দিষ্ট ডাক্তারবাবুর সঙ্গে তাদের নিয়ে যাওয়া হবে! চারপাশে চোখ বুলিয়ে রিনু টের পেল সে কত সুখী! সব্বার হাতে সূঁচ ফুটিয়ে চ্যানেল করা! স্যালাইন চলছে! একা রিনুর হাত তখনও খালি! রিনু জুলজুল করে সেসব দেখতে লাগলো… পাশে বসে ওটি-র সিস্টাররা.. নিজেদের মধ্যে টুকটাক গল্প-হাসিঠাট্টা করছেন! ফিসফিস করে ওঁদের মধ্যে কে যেন বললেন ‘এই মেয়েটিকে ঠিক “খাসখবর”-এর রিনির মত দেখতে না?’ তৎক্ষণাৎ পাশ ফিরে একগাল হেসে রিনু জানালো সে-ই সেই সংবাদ পাঠিকা…. এতক্ষণ চুপটি করে ভয়ভয় মুখে শুয়ে ছিল রিনু, এবার সব সিস্টাররা কাছে এসে তার সঙ্গে গপ্পো করতে লাগলো.. রিনু তো মহাখুশি! যতক্ষণ বাজে পচা বিচ্ছিরি ভয়টাকে দূরে রাখা যায়! ওটি-র মেট্রনদিদি বললেন এমন হাসিখুশি হবু মা নাকি ওঁরা আগে দেখেননি! বললেন ‘দেখো, তোমার বাচ্চা খুব হাসিখুশি হবে!’ এসে গেলেন ইলোরাদি! ওটি-র পোশাক পরে দিদি তৈরি! আদর করলেন! জানতে চাইলেন কে কে এসেছে! তারপর রিনুকে নিয়ে চললেন ওটি-র দিকে! ততক্ষণে সেই ‘লাল পিংপং বল’টা গলার কাছে লাফাতে শুরু করেছে! নিজের বুক ধুকপুক রিনু নিজেই শুনতে পাচ্ছে! কতজন রয়েছেন ওটিতে! ইলোরাদি, জুনিয়র ডাক্তাররা, ডঃ বসুঠাকুর-যিনি অ্যানেস্থেশিয়া করবেন(তাঁর এ বিষয়ে দারুণ খ্যাতি), ডঃ আচার্য্য (তিনি সদ্যোজাতর ডাক্তার) আর আছেন সিস্টাররা! প্রথমে বাঁ হাতে চ্যানেল করলেন ডঃ বসুঠাকুর… আগে থেকেই রিনু ‘লাগবে? লাগবে?’ করছিল.. চ্যানেল করেই বললেন ‘লাগেনি তো?’ রিনু যেই না বলেছে ‘লাগলো তো একটু!’ বলেন কি না ‘বেশ, আরেকবার ফোটাই তাহলে!’ এবার দিদির দিকে পাশ ফিরে শোয় রিনু; রিনুর মুখটা দিদির পেটের মধ্যে.. দিদি মাথার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে.. আর ডঃ বসুঠাকুর পিঠে কুট্ করে দিচ্ছেন ইঞ্জেকশন! যখন ঠিক হল ‘সিজার’ই করা হবে, দিদি জানতে চেয়েছিলেন ‘ফুল অ্যানেস্থেশিয়া না লোকাল’ চায় রিনু! লোকাল অ্যানেস্থেশিয়া করলে রিনু তার সন্তান জন্মের সময়ও সজাগ থাকবে, টের পাবে তার ‘আসা’… অবশ্যই ‘লোকাল’ বলেছিল রিনু… তারজন্যই পিঠের ইঞ্জেকশন! একটু পরেই রিনুর মনে হতে লাগলো পা টা তার নয়! খালি মনে হচ্ছিল একটা পা বোধহয় ভাঁজ করে রেখেছে রিনু। সমানে বলছিল ‘দিদি আমার পা টা লম্বা করে দাওনা!’ আসলে দুটো পা-ই টানটান.. কিন্তু অসাড়… হাত দুটোকে কেমন একটা স্ট্র্যাপ দিয়ে যীশুখ্রীষ্টর মত করে আটকে দেওয়া হল.. নাকে সরু অক্সিজেনের নল… লাগানো হল প্রেশার মাপার যন্ত্রও! সবেতেই রিনুর বক্তব্য ‘আমি তো নিশ্বাস নিতে পারছি, এটা লাগবেনা’.. ‘আমার তো লো প্রেশার, তাহলে এটা কেন দিলে’… ইত্যাদি ইত্যাদি!!! তারপর তো জোর চিৎকারই করে ফেললো রিনু, যখন হঠাৎ-ই সবুজ একটা কাপড় বুকের মাঝখানে আড়াআড়ি পর্দার মত করে টাঙানো হল ‘এ বাবা! এটা দিলে তো আমি কিছুই দেখতে পাবোনা!’ দিদি মাথায় হাত বুলিয়ে বললো ‘তোকে ঠিক দেখানো হবে..’ হঠাৎই কি এক অস্থিরতা শুরু হয়ে গেল ওটি-র মধ্যে! দিদির উত্তেজিত গলা! কাকে যেন বকুনি দিল! সবাই হঠাৎই বেদম ব্যস্ত হয়ে পড়লো! আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই রিনু দেখলো দিদির জুনিয়র ডাক্তার (নাম সম্ভবত অর্পিতা) রিনুর বুকের নীচ থেকে পেটের দিকে চাপ দিচ্ছে! উফ্! মনে হল দম বন্ধ হয়ে যাবে রিনুর! কয়েক সেকেন্ড বোধহয় জ্ঞানও হারালো সে! ঘোর ভাঙলো সিস্টারের ডাকে ‘ছেলেকে আদর করবেনা রিনি?’ ঘাড় নাড়লো রিনু.. এই কুট্টি কুট্টি দুটো পা তখন রিনুর মুখের সামনে… প্রথমবার সন্তানকে আদর করলো সে… হাতদুটো বাঁধা তাই ঠোঁট দিয়ে প্রথমবার রিনু স্পর্শ করলো তার ভবিষ্যতকে…আর সঙ্গে সঙ্গে এক অন্যরকম আনন্দে তার দুটো চোখ উপচে এলো! রিকভারি রুমে আবার আনা হল রিনুকে.. আশেপাশে শুধুই ব্যথার গোঙানি.. রিনুর তখনও ব্যথার অনুভূতি শুরু হয়নি; জলতেষ্টায় তার প্রাণ যায় যায়! এদিকে ডাকলেও কেউ এগিয়ে আসছেনা! যিনি এলেন- গম্ভীর মুখে বললেন আজ সারাদিন নাকি জলটুকুও দেওয়া হবেনা ! কি সাংঘাতিক কথা! রিনু অবশ্য আগেই শুনেছিল অপারেশনের দিন একদম কিছুই খেতে দেওয়া হবেনা, তাবলে জলও নয়!!! ও রে বাবা! এবার নির্ঘাত মরেই যাবে রিনু! আশেপাশের সদ্য মায়েরা যখন যন্ত্রণায় কাতর, রিনু বারবার ডেকে চললো সিস্টারদের! ‘দাও না একটু জল’ ডঃ বসুঠাকুর এগিয়ে এলেন। চা খাবার ছোট্ট প্লাস্টিকের কাপে করে জলও দিলেন রিনুকে… আহ্-শান্তি! রিনুর মনে হল এ যাত্রায় সে টিঁকে গেলেও যেতে পারে! এক এক করে সিস্টাররা আসছেন, নির্দিষ্ট নতুন মাকে নির্দিষ্ট কেবিনে পৌঁছে দিচ্ছেন! রিনুর সিস্টার আর আসেনা! এদিকে রিনু ছটফট করছে একবার মা-বাবাই-বরের মুখটা দেখবে বলে! কতক্ষণে ওদের সঙ্গে একবার কথা বলবে ভেবে রিনুর আর তর সইছেনা! বেশ খানিক পরে এলো ‘নিবেদিতা’, ঠিক ‘সিস্টার নিবেদিতা’… রিনু চললো তার কেবিনে! কিন্তু কেউই তো আর রিনুর কেবিনে আসেনা! সবাই কি তাহলে বাড়ি চলে গেল? মনটা একটু খারাপ হতে না হতেই হইহই করে সবাই ঢুকলো কেবিনে! তাঁরা সবাই ততক্ষণে নার্সারিতে ‘পাবলো’কুমারকে দেখে এসেছেন! সবাই খুশি! মামি রিনুর বাবাইকে জিগ্যেস করলো ‘কি দয়াময়, নাতির নাক সুন্দর হয়েছে তো?’ প্রসঙ্গত রিনুর বাবার নাকটি বড়ই টিকোলো.. তাঁর সুন্দর নাকের প্রতি কিঞ্চিত পক্ষপাতিত্ব সবার জানা! বাবাইয়ের উত্তর ছিল ‘ভালো হয়েছে তবে আমার মেয়ের নাকের মত নয়!’ সবাই চলে যাওয়ার পর শুরু হল রিনুর যন্ত্রণা! অসহ্য অবশ করা ব্যথায় রিনু ছটফট করতে লাগলো! বারবার সিস্টাররা এসে ইঞ্জেকশন দিয়ে যায়; বলে ব্যথা কমবে। কিন্তু ব্যথা বেড়েই চলে! অপারেশনের পরের যন্ত্রণা যে কি তা রিনু টের পায়! যন্ত্রণায়-জল পিপাসায় রিনু মূহ্যমান; ইলোরাদি আসেন.. দুপুর সাড়ে তিনটে নাগাদ.. ‘এভাবে শুয়ে আছিস কেন? পাশ ফিরে শো’ হাঁ হাঁ করে ওঠে রিনু! সকাল ৯:৩০টায় সিজার হয়েছে, এখনই পাশ ফিরে শোবে!!! দিদিই কিভাবে যেন পাশ ফিরিয়ে দেন রিনুকে… আরাম পায় সে! নালিশ করে রিনু ‘সিস্টার তো জলও দিচ্ছেনা আমাকে!’ দিদি লিখে দিয়ে যান ‘কোল্ড ড্রিংক’ দিতে। বিকেলে হরলিকস্ আর রসগোল্লা! সিস্টার তো মানবেইনা এমনও হতে পারে! সে এযাবৎ কোন নতুন মাকে সেদিন কিচ্ছুটি খেতে দেখেনি। ডাক্তাররা দেননা! পরে ডঃ চক্রবর্তীর লিখিত নির্দেশ পড়ে সে রিনুকে স্প্রাইট এনে দিতে বাধ্য হয়! শুয়ে শুয়ে কাত হয়ে খানিকটা খাবার পর খানিকটা রিনু বাঁচিয়ে রাখছে দেখে বেশ অবাক হয়ে সে প্রশ্ন করে ‘এই যে বললে জল পিপাসা পেয়েছে, পুরোটা খেলে না কেন?’ ‘যদি আজ সারাদিনে আর তোমরা না দাও, বাকিটা থাক। পরে খাবো’… বিকেলেও ভিড় হয়.. যদিও তখন রিনু যন্ত্রণায় কুঁই কুঁই করছে! পরদিন ভোরবেলা সিস্টার জানতে চায় ‘টয়লেট যেতে পারবে উঠে?’ ‘চেষ্টা তো করি’… ক্যাথেটার লাগানো তখনও.. সেটা খোলা হয়.. উফ্ তার যে কি টনটনে ব্যথা! এরপর আসল লড়াই! বেড থেকে নামা তো নয়! এ যেন গিরি লঙ্ঘন! উঠে বসেই রিনুর মনে হয় সবটুকু শক্তি শেষ! নামতে বোধহয় আর পারবেনা! তবু আস্তে আস্তে সময় নিয়ে মাটিতে পা রাখে রিনু! কোমরের নীচ থেকে ঝিনঝিনে যন্ত্রণা চড়াৎ করে ওঠে! ব্যথায় কেঁপে উঠতে থাকে সে! মনে পড়ে ইলোরাদি বলেছেন ‘যত তাড়াতাড়ি হাঁটবি, তত তাড়াতাড়ি সুস্থ হবি’.. বলেছিলেন ‘মায়ের প্রথম হলদেটে দুধটুকু সন্তানকে দেওয়া জরুরি-তাতে সন্তানের উপকার’… দাঁড়াতে পারে রিনু… কেবিনের টয়লেটটা মনে হয় অনেক দূরের পথ! পারবে কি যেতে?! যেতে পারে সে.. টয়লেটে গিয়ে তার সাহস বাড়ে; বলে ‘নার্সারিতে যাই? পাবলোকে দেখে আসি?’ হাত ধরে সিস্টার… পা পা করে রিনু পৌঁছয় তার সন্তানের কাছে… কাপড়ের পুঁটলির মধ্যে এইটুকু এক পুতুলকে তার কোলে এনে দেন মেট্রন-কৌশল্যাদি…পুতুলের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে রিনু… টের পায় এ এক নতুন সূচনা… শুরু হয় রিনুর ‘মা হওয়া’ – শুরু হয় তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায়।।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com