ঠিকানা খুঁজছিলেন আবদুল জব্বার!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান: বাংলাদেশের ইতিহাস চেনে তাকে। তার নাম জানে সময়। বন্ধু রেজা ঘটকের লেখা থেকে  পেলাম, বিগত শতাব্দীর শেষ প্রান্তে তিনি `সবুজ সড়ক’ গ্রীন রোডের এক বাড়িতে ভাড়ায় থাকতেন। সেই বাড়ির তিনতলার দরজায় তিনি লিখে রেখেছিলেন- ‘জাতীয় কণ্ঠশিল্পী’। ইয়েস, তার নামের সঙ্গে আর কোনো পরিচয় লাগে না। তিনি জাতীয় কণ্ঠশিল্পী। তিনি বাংলা গানের কিংবদন্তী। তিনি আবদুল জব্বার।

এই শহরে আমরা যারা এখন গড় আয়ুর তিনভাগের শেষ ভাগে পড়েছি, তারা রূপালী পর্দায় নায়ক রাজ্জাক, ফারুককে পেয়েছি অন্য ভালোলাগায়। আমরা তখন জেনেছি, পর্দায় আনন্দের গান মানে মোহাম্মদ খুরশিদ আলম। আর বেদনার গান মানে মোহাম্মদ আবদুল জব্বার।

একটা দেশের জন্মের সঙ্গে কী নিবীড় হয়ে জড়িয়ে আছে আবদুল জব্বারের নাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। কী ইতিহাস মেশানো এক নাম, কতগুলো  মেধাবী দেশপ্রেমিক মুখ! সেই মুখের একজন আবদুল জব্বার। কী অসাধারণ গান আছে তার নদীর মতো উদার কণ্ঠে; ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’। ফজল-এ খোদার  লেখা এই গানটিতে একটি অসাধারণ সমাধান দেয়া আছে আমাদের পরিচয় পর্বের। আমরা বাঙালি না বাংলাদেশি এ নিয়ে যখন  রাজনৈতিক তর্ক হানাহানিতে গড়ায় তখন ওই গানের কথা স্মরণ করি‘বাংলাদেশের লাখো বাঙালি/ জয়ের নেশায় দিলো রক্ত ঢালি।’ তার মানে আমরা বাঙালি এবং বাংলাদেশি, এটা মীমাংসিত সত্য। যতদিন আমরা থাকবো, বাঙালি-বাংলাদেশ থাকবে ততোদিন আবদুল জব্বারের এই গান থাকবে নিশ্চয়!

এই শহরের পানশালায়, আড্ডায়, গানের আসরে, গণমাধ্যমে আবদুল জব্বার বার বার একটা কথা বলতেন, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র একটাই এবং একবারই হয়। সেই কেন্দ্রের শিল্পীরা কে কোথায় আছেন, তাদের খোঁজ নেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। প্রশ্ন, রাষ্ট্র কি সেই দায়িত্ব পালন করেছে, করছে? আবদুল জব্বারের প্রতি কি আমরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছি?

১. তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়
২. ওরে নীল দরিয়া
৩. পিচঢালা এই পথটাকে ভালোবেসেছি
৪. আমিতো বন্ধু মাতাল নই
৫. তারাভরা রাতে তোমার কথাটি মনে পড়ে বেদনায়
৬. সাথী আমার হলো না তো কেউ
৭. শত্রু তুমি বন্ধু তুমি, তুমি আমার সাধনা
৮. বিদায় দাও গো বন্ধু তোমরা এবার দাও বিদায়/মায়ের ছেলে মায়ের কোলে ফিরে যেতে চাই

এমন অনেক, অনেক গান, শ্রোতাপ্রিয় গান ছড়িয়ে আছে এদেশের সিনেমায়, সেই সাদা-কালো যুগ থেকে আবদুল জব্বারের কণ্ঠ বেজেছে বাংলাদেশ বেতারে। আর ঘুরে ফিরে বাজতেই থাকবে। ভাদ্রমাসের চিটচিটে গরমের দিনে, শোকের মাস আগস্টে তার এই চলে যাওয়া আমাদের নতুন করে আরো একটু শূন্যতায় ফেলে দিলো। কদিন আগে চলে গেলেন ঢাকাই সিনেমার সত্যিকারের নায়ক রাজ্জাক। তার শোকের ছায়া শহর থেকে সরতে না সরতেই আরেক কিংবদন্তীর এই চলে যাওয়া; দিনে দিনে কেবল বেদনার বোঝাটাই ভারি হচ্ছে এই শহরের। আবদুল জব্বার গেলেন, এই শহরে এখনো আছেন মোহাম্মদ খুরশিদ আলম। আছে তার সোনাঝরা কণ্ঠ। আবদুল জব্বার সম্পর্কে তিনি বলছেন,‘তার হাত ধরেই চলচ্চিত্রে গান করি।’ সাবিনা ইয়াসমিন; যার কণ্ঠে স্বয়ং স্বরস্বতী  অধিষ্ঠিত, তিনি বলছেন, ‘তিনি(আবদুল জব্বার) আমাকে অনেক স্নেহ করতেন।’ আরেক জনপ্রিয় শিল্পী রফিকুল আলম বলেন, ‘আমরা তাকে গুরু বলে ডাকতাম।’

সত্যিই তো একটা সময় ছিলো যখন এ শহরের সময়কে শাসন করেছেন আবদুল জব্বার। তিনি সত্যিই ‘গুরু’ ছিলেন। তিনি গেয়েছিলেন, ‘পথ চিরদিন সাথী হয়ে রয়েছে আমার/ জানি না এই পথ কোনোদিন দেবে না কি ঠিকানা তোমার?’

আবদুল জব্বার আমৃত্যু পথ চলেছেন, তার ছেলের জবানীতে দেশবাসী জানলো নতুন করে যে আবদুল জব্বার ভীষণ ফাইটার ছিলেন। এতো তাড়াড়াড়ি মৃত্যুর কাছে হার মানতে চাইছিলেন না তিনি। তারপরও..।

তবে আমার আপাতত শেষ প্রশ্ন, পথ কি আবদুল জব্বারকে কোনো ঠিকানা দিয়েছিলো?

লেখক: গল্পকার

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com