টরেন্টোর স্মলটাউনে একদিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
আঞ্জুমান রোজী

আঞ্জুমান রোজী

শরতের শুরুতে বেরিয়ে পড়ি সবুজের শেষ ছোঁয়াটুকু পেতে। অনেকটা উদ্দেশ্যহীন। হঠাৎ করেই মাথায় চেপে বসলো কোনো এক ছোট্ট শহর অর্থাৎ স্মলটাউনে যাবো। স্মলটাউন এই জন্য বললাম যে,কিছুকিছু শব্দ তার নিজস্ব দ্যোতনায় ও ব্যঞ্জনায় বাজতে থাকে; তা সে যে ভাষারই হোক না কেন! স্মলটাউন ধ্বনিটিতে শহর এবং গ্রামের  নিবিড় সংমিশ্রণে ছবির মত এক ক্যানভাস ভেসে ওঠে। পাহাড় কেটেকেটে কানাডা দেশটা বানানো প্রায়। উঁচুনিচু পাহাড়ের কোলবেয়ে ঢেউয়ের মতো দুলতেদুলতে গাড়ি নিয়ে ছুটে চলেছি টরন্টো থেকে পূর্বে ১০৯ কিলোমিটার দূরে পোর্ট হোপ নামে এক স্মলটাউনে। সাথে আছেন কবি ফেরদৌস নাহার। কবি পাশে থাকা মানেই সবকিছু কাব্যময় হয়ে ওঠা। স্মলটাউনে যাওয়ার প্রস্তাবটাও আসে কবির কাছথেকেই।  কখনও গান কখনও গল্পের ছলে চারদিক চোখ বুলিয়ে দেখি। আহা! কী অপরূপ সাজে সেজেছে প্রকৃতি! সে তার রঙ বদলাতে শুর করেছেমাত্র। পথের দু’ধারে সবুজের বুকচিরে কখনও হলুদ, কখনও কমলা, আবার কখনও লাল রঙের আঁচড় লেগে আছে। যতদূর চোখ যায়, এমনই রঙের বাহার canada-1দেখতে দেখতে ছুটেযাচ্ছি পোর্ট হোপের দিকে। মধ্যদুপুরের  রোদেলা দিন আর মৃদুমন্দ  ঠাণ্ডা বাতাস গায়েমেখে পোর্ট হোপে ঢুকেপড়ি।

পোর্টহোপ টাউনটি মূলত গানারাসকা নামে এক নদীর গাঘেঁষে গড়েওঠা  শহর, যা নর্দান অন্টারিও লেকের  সাথে  সংযুক্ত। গানারাসকা  অঞ্চলের আদিবাসীরা হলো ব্রিটিশ, যারা আমেরিকান বিপ্লবের পর  ১৭৭৯ সালে নিউইয়র্ক থেকে আসে । তখন এর প্রথম নামকরণ হয়েছিল  স্মিথস ক্রিক। পশুলোম ব্যবসায়ী স্মিথ ক্রিকের নামে ছিল শহরটির নাম। পরে ১৭৯৩ সালে  ইউরোপিয়ান  হ্যারিটেজরা আসার পর আরো ভালো নাম পার্লামেন্টে উপস্থাপন করে ১৮১৭ সালে কুইবেকের ল্যাফটেনেন্ট গভর্নর  কর্নেল হেনরি হোপের নামে পোর্টহোপ নামকরণ করা হয়। স্মলটাউনটি সেই আড়াই শতবছরের পুরনো আদলেই আছে। অনেক  ইতিহাস বিজড়িত টাউনও বটে।

হাইওয়ে থেকে বের হয়েই পোর্টহোপ এর ডাউনটাউনে চলে যাই। খুবই নীরব একটি শহর। পাহাড়ের ঢালবেয়ে নিচে নামতে নামতে পুরো ডাউনটাউন দেখা যায়। অনেক ঐতিহাসিক ভবন মাথাউঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কানাডার জাতীয় পতাকা দিয়ে ভবনগুলো সাজানো। এখানে সেখানে দু’একটি গাড়ি পার্ক করা। মানুষের আনাগোনা তেমন ছিল না। স্মলটাউনের আবহ বুঝি এমনই হয়! গাড়ি থেকে না নেমে শহরটাকে ঘুরে দেখার অভিপ্রায়ে অলিগলি পেরিয়ে চলে গেলাম  অন্টারিও লেকের ইস্ট বীচে। বীচটা যেন পাখিদের অভয়ারণ্য, যা টরন্টোতে সচরাচর দেখা যায় না। জলথেকে মাcanada-7ছ ধরে এনে দলবেঁধে খাচ্ছে। মাছপঁচা গন্ধ নাকে এসে বাড়ি খেলেও প্রকৃতির এমন সৌম্য শান্ত সৌন্দর্যে মন বিবস হয়ে গেলো। গাড়ি পার্ক করে জলের গা ঘেঁষেঘেঁষে হাঁটতে লাগলাম। একপাশে অবারিত জলের দিগন্ত, অন্যপাশে লাল কমলা হলুদ রঙের ছোঁয়ানিয়ে সবুজের সমারোহ। পাখিদের কাছে গেলেই পাখিগুলো দৌড়েপালায়। বালুর উপর শামুক বিছানো। হাঁটতে গিয়ে বারবার থমকে যেতে হয়। জলের দিগন্তে চোখ তুললেই মনটা কেমন উদাস হয়ে যায়। ধীরেধীরে ফিরে আসি গাড়ির কাছে। এবার শহর ছেড়ে শহরতলীতে চলে যাই। সুনসান নীরবতা চারদিক। এতো নীরব জায়গায় মানুষ কীভাবে বাস করে! এমন কিছু নিয়ে আমরা দুজন কথা বলতে বলতে এগিয়ে যাই। পথিমধ্যে প্রচণ্ডরকমের কফিতেষ্টা পেলো। কফিশপ খুঁজতে গিয়ে অন্যএক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। চারটার মধ্যেই সব কফিশপ এবং অন্যান্য পসরা বন্ধ হয়ে যায়। তখনও সূর্য মাথার উপর গনগন করছে। হালকা বসতিপূর্ণ এলাকা। এদিকওদিক বাড়িঘর দেখা গেলেও মানুষ দেখতে পাইনি। যেন কোথাও কেউ নেই। এভাবে এলোমেলো ঘুরতেঘুরতে শহরতলী থেকে বেরিয়ে চলেযাই পাহাড়ের ঢালবেয়ে গড়েওঠা পেরি টাউনে। প্রকৃতির আশ্চর্য সৌন্দর্যের এক অপরূপ ক্যানভাস। দৃষ্টির সীমানায় পাহাড়ের উঁচুনিচু ঢাল আর দিগন্তজোড়া সবুজের মুগ্ধতা, যেখানে শরতের রঙ এসে ভিড় করেছে। এমন দৃশ্য থেকে চোখ ফেরানো দায়। কবির হাতদিয়ে ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক চলছে। মুগ্ধতা বন্দী হলো ছবির পটে।পাহাড়ের বুকে কালো পিচঢালা পথবেয়ে আমরা আবার ফিরে আসি ডাউনটাউনে।  তখন সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে। গাড়ি এক জায়গায় পার্ক করে হাঁটতে থাকি। কবি বন্ধু ফেরদৌস নাহার পোর্ট হোপের কিছু স্যুভেনিয়র কেনার জন্য কিছু পথচারীকে জিজ্ঞেস করে হতাশ হয়ে যান।  কোনো দোকানপাট যে খোলা নেই, আমরা তা বেমালুম ভুলে যাই।দূরথেকে গিটারের সুর ভেসে আসছিল। মোহাচ্ছন্ন হয়ে সুরের নেশায় হাঁটতেহাঁটতে চলে আসি ঐতহাসিক নদী গানারসকার কাছে।  শীর্ণ স্রোতস্বিনী, মৃদুমন্দ কলধ্বনি। স্বচ্ছ জলের ধারায় নদীতল দেখা যায়। এমন নদীর রূপ দেখে বাংলাদেশের ছোটছোট খালের ছবি মননে ভেসে উঠলো। আমার বাংলার খালের রূপেই যেন কানাডার প্রতিটি নদীর রূপ।

canada-3-copy

কোথায় আমার উন্মত্ত উত্তাল ঢেউঢেউ পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র  আর কোথায় এই গানারাসকা নদী! এতে কি আর প্রাণের ক্ষুধা মিটে, নাকি ভরে মন! দীর্ঘ নিঃশ্বাসটা বুকেচেপে, ফিরে তাকাই বিস্তীর্ণ  আকাশের দিকে। ভাবি, আমার বাংলা আর এই বিভূঁই কানাডার তো একই আকাশ!

সন্ধ্যা নেমে আসছে, এবার ফিরে যাবার পালা। পথজুড়ে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। ফিরতে ফিরতে  ভাবনায় দোলখায়,

“হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন; –
তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,
পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ
পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।
কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি।
অনিদ্রায়, নিরাহারে সঁপি কায়, মনঃ
মজিনু বিফল তপে অবরেণ্যে বরি; –
কেলিনু শৈবালে; ভুলি কমল-কানন!
স্বপ্নে তব কুললক্ষ্মী কয়ে দিলা পরে –
“ওরে বাছা, মাতৃকোষে রতনের রাজি,
এ ভিখারী-দশা তবে কেন তোর আজি?
যা ফিরি, অজ্ঞান তুই, যা রে ফিরি ঘরে!”
পালিলাম আজ্ঞা সুখে; পাইলাম কালে
মাতৃ-ভাষা-রূপে খনি, পূর্ণ মণিজালে।”
(‘বঙ্গভাষা’ মাইকেল মধুসূদন দত্ত)

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com