ঝড়ের পরে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নীনা হাসেল (ভ্যাঙ্কুভার থেকে)

ডেভিড ওর গাড়ী থেকে নেমে এসে জড়িয়ে ধরলো আমাকে। সুসানের সঙ্গেও করমর্দন করলো। ও আমাদের পেছনে পেছনে এলো আমাদের কিছু বোচকা পেটরা বয়ে নিয়ে ভিতরে। গাড়ীর হেড লাইটের আলোতে দেখা যাচ্ছে ঝড় ভাঙ্গা গাছটা ঘরে যাবার পথটা অধিকার করে আছে তখনো । সাবধানে এগুলাম সবাই । ঘরে ঢোকার সঙ্গে, সঙ্গে সদ্য জ্বালানো গনগনে আগুনের উষ্ণ অভ্যর্থনা ডিসেম্বরের শীতলতাকে মুহূর্তে ঘুচিয়ে দিল। আহা আগুন, মিষ্টি, উষ্ণ আগুন। সেই আদিম ,গুহা বাসী মানুষের জীবনের প্রথম রেনেসাঁ। চকমকির ঘর্ষণে চকিতে জ্বলে ওঠা সেই প্রথম আগুনের শিখাতে অসীম ও অনন্ত সম্ভাবনা দেখেছিলো মানব জাতি সেদিন। এক অনন্য সাধারণ বিপ্লবের সূচনা । মানুষের চৈতন্যে জ্বলে উঠেছিল হাউই বাতি। কে জানত সেদিন, সে-ই ছিল মানব জাতির নতুন দিগন্তে অন্বেষণের প্রথম পদক্ষেপ !
চুল্লীতে শব্দ করে পুড়ছে কাঠ। সু’র মন ভালো হয়ে গেল। ডেভিড রাতের জন্য আরও কিছু শুকনো কাঠ এনে দিয়ে বিদায় নিলো। ওর গাড়ীর হেড লাইট এক রাশ আলো ছড়িয়ে চলে গেল শীতল অন্ধকার কেটে ।
সু ভালবাসে আগুন। গভীর রাত অব্দি গল্প করলাম আমরা। ওর চোখ দুটোতেও জ্বলে রইল আগুনের শিখা। ওর হালকা সোনালী চুলে আর মুখের একপাশে আগুনের শিখার কম্পিত প্রতিফলন থেকে থেকে জ্বলছিল। রেডিওতে বেজে যাচ্ছে কখনও জাজ কখনও ক্রিসমাস ক্যারলস, পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গ যন্ত্র সঙ্গীত।

সু’র উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা স্বাভাবিকতার একটু উপরে। বাইরে একটু শব্দ হলেই লাফ দিয়ে ওঠে। আমি ওকে আশ্বাস দেই, “ও কিছু না, একটা হরিণ ছুটে গেল মাত্র।”। নীরবতার মধ্যে সামান্যতম  শব্দ হঠাৎ লক্ষ্য না করে পারা যায় না । বাইরে ঘুট ঘুটে অন্ধকার । দীর্ঘ চির সবুজ গাছের ঘন অবস্থিতি এক গহীন রহস্যময়তার মোরকে জড়িয়ে নিয়েছে ছোট কুড়ে ঘর খানি। নৈঃশব্দ, অরণ্যের অন্ধকার, অতল কালাপানির আবেস্টনী আমাদের ক্ষুদ্র মানব জীবনকে গভীরতর অর্থ দেয়। আমাদের উদাসীনতার দেয়ালে বাঁধা পেয়ে ফিরে যায়। ব্যর্থ হয়ে প্রকৃতিতেই মিশে থাকে। সে অর্থ আমরা অনেক সময় বুঝে উঠতে পারিনা। আমরা প্রকৃতির অংশ মাত্র, আমাদের আলাদা অস্তিত্ব নেই । আমরা প্রকৃতিকে ব্যবহার করেই সুখী নই। আমরা প্রকৃতিকে শোষণ ও অত্যাচার করি, সীমা লঙ্ঘন করি।
রাতের আহার সারলাম রুটি, ফেটা চিজ, দই, ফল দিয়ে। যারা ঝড়ের পরে বিদ্যুৎ , ছাদ ঠিক করেছে, যে লোক তিনজন পরিণত গাছ কেটে নামিয়েছে তাঁদের সঙ্গে কথা বলা পে করা ইত্যাদি অনেক কাজ । বৃষ্টি চলতে থাকলে বাইরের কাজগুলি শেষ না করেই ভ্যাঙ্কুভারে ফিরে যেতে হতে পারে। একটু দমে গেলাম। কি আর করা । আগামীকাল বাজার করতে হবে। মনে মনে একটা ফর্দ বানালাম ঘুমাবার আগে। মনে থাকবেত?(চলবে)

ছবি:গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com