ঝকঝকে শহরের যুদ্ধের গল্পটা বেশ কঠিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

স্মৃতি সাহা

জেগে থাকা নিউইয়র্ক শহর। কবি লোরকার ভাষায় স্লিপলেস সিটি। সেই শহরে স্বপ্নও যেন নির্ঘুম। এই শহরের দিনরাত্রির রোজনামচা স্মৃতি সাহার কলমে প্রাণের বাংলায় নিউইয়র্ক থেকে ধারাবাহিক ভাবে।

নাগরিক সকাল নিউইয়র্কে শুরু হয় পূব আকাশ রাঙিয়ে ওঠার আগেই। আয়েশ করে চা হাতে দিবাকরের শুদ্ধ প্রথম স্পর্শে গা এলিয়ে দেওয়া এখানে রীতিমতো বিলাস! দু’দন্ড আকাশে চোখ মেলে মেঘের রাজ্যে কল্পনার আঁচড়ের ফুরসত নেই এখানে! হয়ত সবাই ভাবছেন নিউইয়র্কের কথা লিখতে বসে আমি কি সব হেয়ালী কথার সূত্রপাত করছি! আসলে আমি আজ এই প্রাচুর্যের শহরের সদা ব্যস্ত আর কঠিন জীবনের একটি ছবি আঁকতে যাচ্ছি। না ঘুমানোর শহরটিতেও সকাল আসে নিয়ম করে। শেষ রাতের দিকে একটু থিতিয়ে আসা শহরের প্রাণচাঞ্চল্য শুরু হয় কিন্তু আবার সেই অন্ধকার থাকতেই। আলো ফুটতে না ফুটতেই স্ট্রিটগুলো মুখর হয়ে ওঠে ছুটে চলা মানুষের পদচারণায়। সবাই ছুটতে থাকে তাদের নির্ধারিত গন্তব্যে। কেউ স্কুলে, কেউ কলেজে, কেউ অফিসে। এখানকার বাচ্চাদের স্কুলগুলো নির্ধারিত হয় বাসস্থানের ঠিকানা অনুযায়ী। অর্থাৎ স্কুলগুলোর নির্দিষ্ট এলাকা ভিত্তিক। তাই অধিকাংশ স্কুল যার যার বাসস্থান থেকে হাঁটা পথ দূরত্বে। সকালের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাবা-মার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া বাচ্চাদের প্রাধান্য থাকে রাস্তাগুলোতে। আর বাচ্চাদের স্কুলে পৌছে দিয়েই বাবা-মা ছুটতে থাকে সাবওয়ে স্টেশন আর বাস স্টপেজের দিকে। এখানে বলে রাখা ভাল, নিউইয়র্ক শহরের যাতায়াত ব্যবস্থা পুরোটাই সাবওয়ে নির্ভর। সত্যি বলতে নিউইয়র্ক সিটি বাসের তুলনায় সাবওয়ের ট্রেনের উপর নির্ভরতা এই শহরের নাগরিকদের অনেক বেশি। মাটির নীচে মাকড়সার জালের মতো বিছানো রয়েছে রেলপথ। ১৯০৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এই সাবওয়ে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন আর বহুল ব্যবহৃত মেট্রো সিস্টেম। সপ্তাহের সাতদিন ২৪ ঘন্টা এই সাবওয়ে ব্যবহৃত হয়। প্রায় ৪৭২ টির মতো স্টেশন রয়েছে এই সাবওয়ে সিস্টেমে। প্রতিদিন প্রায় ছয় লক্ষ নিউইয়র্কার সেবা নিয়ে থাকে এই মেট্রো সিস্টেমের। আর এ থেকেই বোঝা যায় এই ব্যস্ত শহরের নাগরিকেরা হরদম ছুটছে! এখানকার স্কুলগুলো হয় সাধারণত ৬ ঘন্টার। এরপর অতিরিক্ত সময় যদি স্কুলে বাচ্চাদের রাখতে চায় বাবা-মা, তবে তাদেরকে আফটার স্কুল প্রোগ্রামের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আফটার স্কুল দেড় ঘন্টা থেকে তিন ঘন্টার হয়ে থেকে। অনেক কর্মজীবী মা-বাবা তাদের সন্তানদের আফটার স্কুলে দিয়ে থাকেন। আফটার স্কুল প্রোগ্রামে হোমওয়ার্ক হেল্প, খেলাধুলা আর স্ন্যাকের ব্যবস্থা থাকে। এখানে উল্লেখ করে রাখি, নিউইয়র্কে ১২ গ্রেড পর্যন্ত বিনামূল্যে পড়ানো হয় বাচ্চাদের। তবে আফটার স্কুলে অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে পে করতে হয় বা মূল্য দিতে হয়। সব নিউইয়র্কবাসী যে অফিসে ছোটে তা কিন্তু ঠিক নয়। নিউইয়র্কারদের একটি বৃহৎ অংশ কাজ করে বিভিন্ন খাবারের দোকান, গ্রোসারী, রেস্টুরেন্ট। মেক্সিকান আর এশিয়ান অভিবাসীরা অধিকাংশই এ ধরণের কাজগুলো করে থাকে। সাধারণত ৮ ঘন্টা ঠায় দাঁড়িয়ে কাজ করে যেতে হয় এমন জায়গাগুলোতে। তাই কাজ শেষে বেশ শ্রান্ত হয়ে যায় শরীর। এখানে আরোও একটা কথা উল্লেখ করতে চাই, এই ৮ ঘন্টা কাজে ১/২ ঘন্টা থাক ব্রেক। এই আধঘণ্টাতেই সবাইকে লাঞ্চ,স্ন্যাক্স এমনকি ফোনে কিছু জরুরী কাজ সেরে নিতে হয়। এই সময়টুকু ব্যতিত ফোন ব্যবহারের অনুমতি থাকে না। আর কায়িক শ্রমের এই দিন শেষে বাবা-মা স্কুল থেকে সন্তানদের হাত ধরে আবার ঘরে ফেরে। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, মা-বাবা, সন্তান সবাই মিলেই জীবনের যুদ্ধে সামিল। আলো আর প্রাচুর্যের এই শহরে আসলে অভিবাসী সকল প্রথম জেনারেশনকে অনেক শ্রম আর কষ্ট দিয়েই ঘাঁটি গাড়তে হয়। দূর থেকে যতই ঝকঝকে আর সুন্দর মনে হোক না কেন ভিতরের যুদ্ধের গল্পটা কিন্তু বেশ কঠিন।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com