জয়েসের তীব্র প্রেমপত্র

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডাবলিনের নাসাউ স্ট্রিট ধরে হাঁটছিলেন জেমস জয়েস। ১৯০৪ সালের ১০ জুন বিকেলে হঠাৎ করেই ভিড়ের মধ্যে তার চোখ আটকে গেলো ২০ বছর বয়সী নোরা বার্নিকেল নামে এক যুবতীর প্রতি। তখনও বিশ্বসাহিত্য তোলপাড় করা ‘ইউলিসিস’ উপন্যাস লেখেননি তিনি। নোরার মধ্যে অদ্ভুত একটা ঘোর হয়তো আবিষ্কার করেছিলো জয়েসের অস্পষ্ট দৃষ্টিশক্তি। ২২ বছর বয়েসেই চোখের সমস্যার জন্য চশমা পড়তে হতো তাকে।

নোরা বার্নিকেল

জয়েস এগিয়ে গিয়ে কথা বললেন নোরার সঙ্গে। প্রথম দর্শনেই নোরার কাছে একদিন একান্তে দেখা করার অনুমতি চাইলেন তিনি। রাজিও হলো নোরা। সময় মিলিয়ে উদগ্রীব জয়েস উপস্থিত হলেন নির্দিষ্ট জায়গায়। কিন্তু কোথায় নোরা? সেদিন কথা দিয়েও ধরা দিলো না নোরা। হতাশ হলেন জেমস জয়েস।

পরে স্মৃতিচারণে নাসাউ স্ট্রিটে প্রথম দেখা হওয়ার দিনের কথা বলতে গিয়ে নোরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিবরণ ‍দিয়েছেন। কখনো বলেছেন সেদিন জয়েসের মাথায় ছিলো নাবিকদের টুপি। আবার বলেছেন,জয়েস একটা চওড়া হ্যাট আর বেশ অনেক লম্বা একটা ওভারকোট পরা ছিলেন।একান্তে দেখা করার দিনটাতে নোরাকে না-পেয়ে তরুণ জয়েস কিন্তু কষ্ট পেয়েছিলেন। একটা ছোট চিঠিতে তিনি ভালোবেসে ফেলা মেয়েটিকে লিখেছিলেন,‘আমি অন্ধ হতে পারি, কিন্তু সেদিন আমি অনেকক্ষণ খয়েরি আর লাল চুলে ঢাকা একজন নারীর মাথার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকেছিলাম। পরে বুঝতে পারলাম, ওই মহিলা তুমি নও। যদি তুমি আমাকে ভুলে না-গিয়ে থাকো তাহলে আরেকদিন দয়া করে আমার সঙ্গে দেখা করবে?’

জেমস জয়েস

জেমস জয়েসের সেই ছোট্ট চিঠিতে সেদিন এমনই অনুনয় ঝরে পড়েছিলো। আর সেই অনুনয়কে পায়ে ঠেলতে পারেনি নোরা। সেই জুন মাসের ১৬ তারিখ নোরা শেষ পর্যন্ত দেখা করেছিলো জয়েসের সঙ্গে।ডাবলিন শহরের পূর্ব দিকে বন্দর ছাড়িয়ে রিংসোড নামে একটা নির্জন জায়গায় দেখা হলো তাদের। আর সেদিন শুধু দেখাতেই থেমে থাকেনি দুজনের সময়।

বেশ কয়েক বছর পরে ১৯০৯ সালের ৩ ডিসেম্বর নোরাকে লেখা জেমস জয়েসের একটি চিঠিতে রিংসোড নামে সেই নির্জন জায়গাটিতে দুজনের ঘনিষ্টতার বিবরণ পাওয়া যায়। জয়েস লিখছেন, ‘প্রথম দিন কিন্তু আমি  তোমাকে স্পর্শ করিনি লজ্জাহীনা, দুষ্টু মেয়ে। তুমিই আমাকে আদরে আদরে জাগিয়ে তুলেছিলে। শার্ট খুলে ফেলে তুমি আমার প্যান্টের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে স্পর্শ করেছিলে আমার যৌবনকে। তোমার চঞ্চল আর আদুরে আঙুলের খেলায় আমি পুরুষ হয়ে উঠেছিলাম’।

একই চিঠিতে জয়েস আরেক জায়গায় লিখেছেন,‘ প্রিয় নোরা, তুমি আমাকে বলো, এটা তো সত্যি যে তুমি-ই আমার সঙ্গে বিছানায় যেতে চেয়েছিলে? তাহলে আমার একটি প্রশ্নের উত্তর তুমি দাও,আমি ছাড়া আর কেউ তোমার সঙ্গে বিছানায় গিয়েছে কি না? আমাদের মধ্যে সততা আর সত্যি আবিষ্কারের জন্যই এটা জরুরি। তুমি সত্যি করে বলো, কোনো গহীন রাতে তোমার হাতের সেই আঙুলগুলো কি আর কারো প্যান্টের বোতাম অবারিত করে ভেতরে প্রবেশ করেছিলো ভেতরে? তারপর সেখানে তোমার আঙুল ইঁদুরের মতো ঘুমিয়ে ছিলো? বলো নোরা, বলো? আমার আগে তুমি কি আমার আগে আর কোনো পুরুষের সঙ্গে বিছানায় গেছো? তার পোশাক উন্মোচন করেছো? নোরা, তুমি আমাকে নির্ভয়ে উত্তর দিতে পারো। আজ রাতে আমি তোমার শরীরকে এমন ভাবে উপলব্ধি করতে চাই যে, তুমি যদি বলো আর কেউ এভাবে তোমার সঙ্গে আমার আগে সঙ্গম করেছে তবুও আমি তোমার দিকেই ধাবিত হবো তীব্র কামনায়’।

জেমস জয়েসের এই চিঠিগুলি ১৯৭৫ সালে প্রথম দুই মলাটে বাঁধাই হয়ে প্রকাশিত হয়। বইয়ের নাম ছিলো ‘সিলেকটেড লেটারস অফ জেমস জয়েস’। চিঠিগুলো সাহিত্য মহলে ঝড় তুলেছিলো। অবশ্য এই বইটি এখন আর মুদ্রিত অবস্থায় পাওয়া যায় না।

জুন মাসে দু’জনের সেই তীব্র প্রণয়ের সূচনা। অক্টোবর মাসেই তারা দু’জন পালিয়ে যান জুরিখ শহরে। সেই পলাতক জুটির জন্য সেটাই ছিলো মধুচন্দ্রিমা। পরে ১৯৩১ সালে জয়েস নোরাকে বিয়ে করেন। তবে এই চিঠিগুলো জয়েস নোরাকে লিখেছিলেন ১৯০৯ সালে। তখন তিনি ডাবলিন শহরে একা ছিলেন।

সবগুলো চিঠিতে জয়েস নোরাকে সম্বাধন করেছেন, ডার্লিং নোরা বা মিষ্টি কামুক নোরা বলে। চিঠিগুলোর শেষে নিজের নাম স্বাক্ষর করেছেন জিম লিখে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ প্যারিস রিভিউ
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com