জুলিয়ার সঙ্গে দেখা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নীনা হাসেল (ভ্যাঙ্কুভার থেকে)

অজানা ও অপরিচয়ের প্রতি আমাদের সহজাত ভয় ও দ্বিধা থাকে। বিশেষ করে আমরা যারা বদ্ধ সমাজে বড় হয়েছি সেই ভয়ের শেকড়টা থাকে মনের অনেক গভীরে। এই ভয় আমাদের নতুন আর অজানাকে জানতে ও যাচাই করে দেখতে দেয় না। পিছনে টেনে রাখে। আমরা বদলাতে চাই পারি না।
যখন আমি মেইনে বাড়ি কিনেছিলাম আমার আপনজনেরা একটু অবাক হয়েছিল।ওদের চোখে আমি চিরদিন এক একসেনট্রিক। আমি অবশ্য কারো অনুমোদন পাবার জন্য কিছু করা বাদ দিয়েছলাম অনেক আগেই। যখন আমরা জীবনের মুখমুখি হই আমরা নিজেদের আবিষ্কার করি। আমাদের সমাজ সে সুযোগটা আমাদের দিতে অক্ষম। তবু কেউ কেউ বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে নিজের মানুষ হয়ে ওঠে তারও অনেক দৃষ্টান্ত আছে।
জুলিয়ার সঙ্গে এবার দেখা হল ফার্মগেট অর্গানিক গ্রসারি স্টোর ও ডেলিতে। ডেলি সেকশনে থাকে গরম ও ঠান্ডা খাবার যেমন স্যুপ ও স্যানডউইচ আর কফি চা। ওখানে আমি নিয়মিত যাই দুপুর পার করে ওদের অর্গানিক কফি পান করতে।এই সময়টাতে তেমন ভীড় থাকে না।

জুলিয়া

নিরিবিলি একটি কোণ বেছে নিয়ে বসে কফি পান করি, বই পড়ি। কখনো লেখালেখি করি। সঙ্গী তখন কাগজ কিংবা ল্যাপটপ। কোন পরিচিত বন্ধু ও মাঝে মাঝে এসে যোগ দেয় তখন আড্ডা দেই জমিয়ে। ও আমার সঙ্গে গল্প করে সময় কাটাতে পছন্দ করে। তাই কফি মগটা নিয়ে এসে আমার টেবিলে বসলো। মধ্য তিরিশের ঘরে ওর বয়স। জার্মানিতে জন্ম।বাবা মায়ের প্রথম সন্তান। বাবা মা ভাই আর ছোট বোন। অবস্থাপন্ন পরিবারে বড় হয়েছে। যা হয় এই পশ্চিমের দেশে, একটা বয়সে সব দেশের ছেলে মেয়েরাই কম বেশী বিদ্রোহ করে।
কফি আর আড্ডায় সময় কাটাতে গিয়ে জানলাম, বারো বছর আগে জুলিয়া ভ্যাঙ্কুভার ক্যানাডায় এসেছিল পড়াশুনা করতে। ইউ বি সি থেকে এম এ করেছে। বাবা মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। তবে মেয়েটা এখনো বেশ খানিকটা সাইকোলজিক্যাল ব্যাগেজ বয়ে নিয়ে ফিরছে। ওর মনে অনেক অভিমান, নালিশ ও ক্ষোভ আছে। পচিশ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে, দেশ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল সাহসী জুলিয়া।
কাউন্টার থেকে কর্তব্যরত মহিলা বলল, “আমি ফ্রেস কফি বানাচ্ছি। রেডি হলে নিয়ে আসছি তোমার জন্যে। জুলিয়া ওর মেইন আয়ল্যানড সম্পর্কে অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করলো।জমে উঠলো আড্ডা। ওর সব সময়েই কিছু কাউন্সিলিং টাইপ প্রশ্ন থাকে। আজ আমি ওদিকে গেলাম না। হাঁটতে শুরু করলাম অন্য পথে। এখন ক্যানেডিয়ান অধিকাংশ কিশোরী ও তরুণী মহিলারা নারীবাদ নিয়ে ভাবে, বুঝতে চেষ্টা করে। নারীবাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের আছে নানা চিন্তা। জুলিয়া প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে আমাকে গভীর ভাবে জড়িয়ে নিচ্ছিল। কৌতুহল আর জানার আগ্রহ ওর মধ্যে গভীর।

লেখক ও জুলিয়া

ও আমাকে জিজ্ঞেস করলো আমি ফেমিনিস্ট কিনা। উত্তরে বললাম অবশ্যই।।ও নিবিষ্ট চিত্তে আরও শুনতে চাইলো হিউম্যানিসম আর ফেমিনিজমের মধ্যে মিল আর অমিলটা কোথায়? নারীবাদের ভবিষ্যৎ কি ইত্যাদি। মোটামুটি থট প্রভোকিং। এই স্বল্প পরিসরে এইসব জটিল প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। আজ জুলিয়ার সঙ্গে আমার দেখা হওয়াটা ছিল অপ্রত্যাশিত, অভাবনীয় ও চমকপ্রদ ।
সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখে ফেরী টার্মিনালে গাড়ী পার্ক করে সাত সকালে ফেরী ধরে ভ্যাঙ্কুভার গিয়েছিলাম। সারা দিনের জন্য। সারাটা দিন বিভিন্ন কাজ, অন্যতম ছিল আমার এমডির সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। অল্প সময়ের জন্য এক বন্ধু এসে যোগ দিয়েছিল। দরকারি সব কাজ শেষ করতে করতে ফেরির সময় কাছিয়ে এলো। ভ্যাঙ্কুভার থেকে টোইয়াসন টার্মিনালে যেতে কমপক্ষে দেড় ঘন্টার ড্রাইভ। রাশ আওয়ারে আরও বেশী। সৌভাগ্য যে আমি ড্রাইভ করছিলাম না। ক্যানাডা লাইন নিয়ে ব্রিজপোর্টে নেমে ৬২০ নম্বর ফেরীর বাস নিয়ে ফেরী টার্মিনালে পৌঁছালাম। সময় মতই পৌছেছিলাম। সারে সাতটায় ফেরী ছাড়লো। নিশ্চিত হয়ে ক্যাফেটেরিয়াতে গিয়ে ক্ল্যামচওডার স্যুপ নিয়ে জলের দিকে মুখ করা একটি টেবিলে গিয়ে বসলাম। ধীরেসুস্থে স্যুপে চামচ ডুবিয়ে স্যুপ খেতে খেতে এলিস মানরোর ছোট গল্পের বইটি খুলে বসলাম।ফেরী পুরো ভর্তি ছিল। ট্যুরিসট সিজন এখনো শেষ হয়নি যদিও ছেলে মেয়েরা স্কুলে ফিরে গেছে। গন্তব্যে ৮:৪৫মিঃ পৌঁছাবার কথা, পৌঁছালো ৯:২০এর দিকে।
পায়ে হেটে নিচু ফেরী ঘাটে নেমে তারপর আবার বেশ উচুতে পার্কিং লটে এসে পৌঁছাতে আমার দম বেরিয়ে যাবার জোগাড়। ততক্ষনে অন্যান্য যাত্রীরা চলে গেছে। গাড়ীর জোড়ালো আলো মিলিয়ে যেতে চারিদিক নেমে এলো অন্ধকার। হাঁফাতে হাঁফাতে গাড়ি খুঁজে নিয়ে স্টার্ট দিতেই চোখে পড়ল বেশ ক’টা গাড়ীর দূরত্বে বেশ লম্বা সুন্দর এক তরুণী এক বিশাল স্যুটকেস নিয়ে দাঁড়িয়ে। কেউ হয়তো তাকে নিতে আসবার কথা। কিন্তু কেউ তাকে নিতে আসেনি। ওর দেহ ভঙ্গিমায়, চোখে মুখে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা স্পষ্ট। আমি জানালার কাচ নামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম ওর রাইড লাগবে কিনা। ও বলল,“আমার রাইড হয়তো পথে, এসে যাবে যে কোন মুহূর্তে।“ আমার মন সায় দিলো না এত রাতে এই নিঃসঙ্গ ফেরীঘাটে ওকে একা রেখে যেতে। নিজের মেয়ের মুখ চকিতে ভেসে উঠল মনে। আমি বললাম “তুমি যদি জান কোথায় যাবে তাহলে আমি তোমাকে পৌঁছে দিতে পারি। ওদের এত দেরী হবার যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ নেই।’’ ‘‘আমি নিশ্চিত কোথাও হয়তো সময় বা তারিখ নিয়ে ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে।’’
ও উদগ্রীব কণ্ঠে বলল “সত্যি তুমি আমাকে পৌঁছে দেবে, তোমার যদি অসুবিধা না হয়। প্লিজ!” আরও বলল “আমিতো ঠিকানা জানিনা তবে যায়গাটার নাম ‘স্প্রিং ওয়াটার লজ”। ভাবলাম, আমি চলে গেলে কি অবস্থা হতো মেয়েটির এত রাতে হিচহাইক করে যেতে হবে এতটা পথ। আমি বললাম, ‘‘আমি চিনি। আমার পথেই পরবে স্প্রিং ওয়াটার লজ। তোমাকে নামিয়ে দিতে কোন অসুবিধা হবেনা।’’ জুলিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ধন্যবাদ জানালো। আমি গাড়ী থেকে নেমে পেছনের ট্রাঙ্ক খুলে দিলাম। ওর বিশাল সুটকেস রাখার জন্য। হাত বাড়ালাম সাহায্য করার জন্য। ও বলল আমি একাই পারব তাছাড়া এটা খুব ভারি’। ওরই নাম জুলিয়া। যার সঙ্গে আমি কফি খেতে খেতে গল্প করছি।
সেদিন রাতের কথায় আবার ফিরে যাই। মানে আমার আর জুলিয়ার পরিচয় পর্বের সূচনায়। ভিলেজ বে রোড একেবারে ফাঁকা। হঠাৎ একটা গাড়ী আমাদের গাড়ীটাকে অতিক্রম করলো। জুলিয়া খুশি হয়ে বললো, ‘‘হয়তো এই গাড়ীটাই আমার জন্য যাচ্ছে।’’ ততক্ষণে রাত দশটা বেজে গেছে। স্প্রিং ওয়াটারের পার্কিং লটে গাড়ী পার্ক করলাম। সব আলো নেভানো। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। জুলিয়া গাড়ী থেকে নামে বেল বাজালো। কেউ এসে দরজা খুলে দিল না। ও গাড়ীতে ফিরে এসে ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল,“ কি আশ্চর্য দায়িত্বহীন ম্যানেজার। এখন আমি কি করি? আমি কালই ভ্যাঙ্কুভারে ফিরে যাব”। আমি ওকে আশ্বস্ত করে বলি, “তুমি রাতটা আমার বাড়ীতে ঘুমাও। কারণ এত রাতে রিজার্ভেশন ছাড়া কোথাও তুমি রুম পাবে না। তোমার ম্যানেজারকে আমার নাম আর ফোন নাম্বার লিখে দিয়ে যাও, তোমাকে যেন সকালে ফোন করে। সকালে নাস্তা খেয়ে ধীরেসুস্থে তোমাকে পৌঁছে দেব। রাজি হয়ে গেলো জুলিয়া আমার প্রস্তাবে।
রাতে বাসায় ফিরে ওকে খেতে বললাম। ও বলল ওর ক্ষিদে নেই।। ওকে ফুটনে বিছানা করে দিয়ে আমি ঘুমাতে গেলাম।
সকালে উঠে ওকে জিজ্ঞেস করলাম ডিম ও কিভাবে খেতে পছন্দ করে? জুলিয়া বলল স্ক্র্যাম্বল এগ, টোষ্ট আর দুধ ছাড়া চা। নাস্তা করার সময় ফোন বাজলো। ধরতে ধরতে আনসারিং মেসিনে চলে গেলো। মেসেজ চেক করলাম। স্প্রিং ওয়াটার লজের ম্যানেজার ক্রিস ফোন করে জুলিয়ার জন্য মেসেজ রেখেছে। জুলিয়াকে ফোন দিলাম।ও ফোনে হাতচাপা দিয়ে জিজ্ঞেস করল কখন আমি ওকে নামিয়ে দিতে পারবো? বললাম আধঘন্টার মধ্যে।
নাস্তার প্লেট ধুয়ে আমি তৈরি হয়ে নিলাম। আমি জুলিয়াকে বললাম ক্রিসের সঙ্গে রাগ না করতে। যদিও ওকে আনতে না যাওয়াটা মারাত্মক একটা ভুল হয়েছে তার পক্ষে। কিন্তু কিছু করার নেই। ও বলল, “ তুমি না থাকলে কি হত? তারপর একটু খুশী খুশী গলায় বলল “ ইয়ু আর মাই গার্ডিয়ান এঞ্জেল। ইট ওয়াজ এ ডিভাইন ইন্টারভেনশন।’’
জুলিয়াকে নিয়ে পৌঁছে দিলাম স্প্রিং ওয়াটার লজে। ক্রিস নামে ভদ্রলোক এসে আমাকেও অনেক ধন্যবাদ জানালো।
জুলিয়ার সঙ্গে আবার দেখা হল শনিবারের ফারমার্স মার্কেটে। মেয়েটি অনেক লম্বা তাই দূর থেকেই চোখে পড়ে। ও দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলো আমাকে। এক সপ্তাহের মধ্যেই ওকে অনেকেই চিনে ফেলেছে। ও খুব মিশুক মেয়ে। অনেক পড়াশুনা করেছে বলে চিন্তায় গভীরতা রয়েছে। ও বয়সে আমার ছেলে অয়নের চাইতে কয়েক বছরের বড় হবে হয়তো। আজকাল ওর সঙ্গে প্রতি শনিবারে দেখা হয় ফারমার্স মার্কেটে। এর মধ্যে একদিন স্প্রিং ওয়াটার লজে ডিনার করতে গেলাম। জুলিয়ার তখন কাজ শেষ হয়ে গেছে। গল্প করতে করতে বললো, খুব ভালো লাগছে ওর মেইন আয়ল্যান্ড। তবে থাকার ব্যবস্থাটা এখনো সুবিধাজনক নয়। তারপরেও জুলিয়া চায় দীর্ঘ সময় এখানেই থেকে যেতে।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com