জীবনযাপনেও ‘অতি’ জিনিষটা দিকবদল করে দেয় মানুষকে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেখ রানা (এডিনবরা, স্কটল্যান্ড থেকে)

এক.

লেখালেখির প্রতি একাগ্রতা আর নির্মোহ হয়ে লেখা-দুটোই লেখকের সম্পদ। অনেক বড় সম্পদ। যারা নির্মোহ হয়ে লিখতে পারেন, তাদের সম্মান করি। তাদের লেখাগুলোকে ভালোবাসি। সেই লেখাগুলো চমৎকার দৃশ্যকল্প ফুটিয়ে তোলে।

লেখায় অতি আবেগ, অতি বিরহ, অতি উপমা, অতি নার্সিসিজম- ক্লিশে লাগে। জীবনানন্দ দাশের উপর একটা লেখা পড়ছিলাম। জীবনানন্দ বাবু নিজের লেখা অনেকবার কাঁটা-ছেড়া করতেন । গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের লেখা নিজে বারবার পড়তেন। তারপর সন্তুষ্ট হলেই সেই লেখা প্রকাশ করতেন। লেখকের নিজের সন্তুষ্টি জরুরী বিষয়।

শুধু লেখায় নয়, জীবনযাপনেও আসলে ‘অতি’ জিনিষটা দিকবদল করে দেয় মানুষকে। হয়তো সে টেরও পায়না।

পরিমিতি বোধ। ভালো লেখকের জন্য পরিমিতি বোধ জরুরি। মানুষের জন্যও। জীবন যাপনে পরিমিতি বোধ স্থিরতা দেয়। জানি, এই গতিময় ধারাপাতের জীবনে স্থিরতা মহার্ঘ্য। তবু, স্থিরতা কাম্য। শান্ত বিকেল কাম্য। পাশের স্বজনের সঙ্গে হাসি বিনিময় কাম্য। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে হাত ধরে একটা বিকেল কাটানো কাম্য।

ভাবনা। ভাবনার অলিগলি লেখককে চিনিয়ে দেয়। কিছু শব্দ লেখকের মধ্যে চলে আসে শুধু শুধুই। লেখক সেই শব্দ ধরেন কেবল। কিন্তু ভাবনার ব্যাপ্তিই আসলে লেখককে প্রতিভাত করে, উদ্ভাসিত করে।

মানুষকেও। একদিন। কোনো একদিন…খুব করে চিনিয়ে দেয়। আপাত নিভৃতচারী, রেসে পিছিয়ে পরা মানুষও একদিন সামনে এসে দাঁড়ায়। ভাবনার সৌন্দর্যে। ভাবনার শক্তিতে। ভাবনার মহানুভবতায়।

লন্ডনের সেন্ট জেমস পার্ক

কেউ জীবনে শুধু চাষ করে। কেউ একজীবন পার করে ঘৃনার বিষবাষ্প ছড়িয়ে আর কেউ চাষ করে, সঙ্গে আবাদ ও করে নিবির মমতায়।

দুই.

সেদিন প্রিন্সেস স্ট্রিট ধরে হাঁটছিলাম। সেন্ট জেমস পার্ক এর দিকে আসতেই একদল স্ট্রিট মিউজিশিয়ান চোখে পড়ে। এরা বাসকার নামেও পরিচিত। কাছে এগিয়ে যাই। সঙ্গীতটা আমার খুব চেনা লাগে।

কাছে গিয়ে দাড়াতেই নিমিষে সাত বছর আগে ফিরে যাই। লন্ডনে এক সন্ধায় পেপার বিলি করে ফিরছিলাম। অক্সফোর্ড স্ট্রিটে জোর কদমে হেটে ফিরছিলাম বাস ধরবো বলে। হঠাৎ প্যানফ্লুটের একটা অতীন্দ্রিয় বাদ্য শুনতে পাই। সঙ্গে হামিং। দুইয়ে মিলে কি এক আবেশ ছড়িয়ে দিচ্ছে বাতাসে। বাস ধরার কথা ভুলে আমি। সেই সুর ধরে এগোই। তারপর কাছে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ শুনি সেই বাসকারদের বাজনা। মন্ত্রমুগ্ধ হই।

প্যানফ্লুটের এই কম্পোজিশন ধরণটাকে এন্ডিয়ান (ইংরেজিতে music from andes) মিউজিক বলে। পেরু, বলিভিয়া অঞ্চলের সঙ্গীত। আরো নির্দিষ্ট করে বললে সাউথ আমেরিকান মিউজিক। প্যানফ্লুট কে সামনে রেখে গিটার, ড্রামস সঙ্গতে এক ধরণের ফিউশন। এই মিউজিশিয়ানদের গেট আপ একদম রেড ইন্ডিয়ানদের মত। মাথায় বড় বড় পাখির পালকের টুপি, গায়ে চামড়ার আলখেল্লা আর আকর্ণবিস্তৃত হাসি। ।

সেদিন প্রিন্সেস স্ট্রিটে দাড়িয়ে এন্ডেজ মিউজিক শুনতে শুনতে কোথায় যে হারিয়ে গেলাম। মনে হল আমি দূর পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আছি যেন। বাতাস বইছে সুন্দর, অপার্থিব। তারপর ফিরে এসে দেখি, আমি এখানে!

একদম একা। নিজের সঙ্গে নিজেই একা!

অক্সফোর্ড স্ট্রিটে

তিন.

নতুন বাসায় উঠেছি। ওয়ার্ডল প্লেস। এপিন টেরাস এর আগের বাসার মত জানালা ভর্তি আকাশ আর নেই। জানালা দিয়ে নাগরিক দালান আর হেঁটে চলা মানুষ দেখি। সন্ধা হতেই ঘর ফেরা মানুষ আর সকাল বেলা দিন শুরু করা মানুষ। কেমন বদলে যায় একই মানুষ দিন শেষে। ক্লান্ত আর একটা দিন শেষ করার যুগপৎ অনুভূতি ধরা পরে চেহারায়।

আশেপাশে প্রচুর এশিয়ান চোখে পড়ে। মুল সড়কে হেঁটে এলেই গোর্গি স্টেডিয়াম। স্কটিশ লীগ এর জৌলুষ নেই তেমন একটা।

‘ঐ গ্যালারী, গ্যালারী’…আমি স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে ঢাকা স্টেডিয়াম কল্পনা করি। ভিড়, কালাবাজারী টিকেট, লাইনে ধাক্কা-ধাক্কি আর অন্ধকার সিড়ি ভেঙে পপাত ধরণীতল হতে হতে চোখের সামনে সবুজ মাঠ। তারপর মোহামেডান-আবাহনী দ্বৈরথ।

সে সব কিছু নেই এখানে। খেলা শুরু হবার আগে দর্শকরা দল বেঁধে সুড়িখানায় ঢোকে । বিয়ার খেয়ে চনমনে হাসিহাসি মুখ করে গ্যালারীতে প্রবেশ করে। তারপর খেলা শেষে দলবেঁধে ফিরে আসে।

একটা ব্যাপার দেখে মজা পাই। এডিনবরায় পরিবারের সবাই মিলে খেলা দেখতে আসে। বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে। সেল্টিক বা রেঞ্জার্স এর স্কার্ফ আর টুপি পড়ে ঘুরে বেড়ায়। গোর্গি এলাকায় সেদিন রাজ্যের জ্যাম লেগে যায়। বেশিক্ষণ থাকে না যদিও।

ঢাকার জ্যাম যদি দেখত এডিনবরা! আর দেখত ৯০ এর সেই সময়ের গ্যালারীর উন্মাদনা!!

ছবি:গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com