জাহাজ তাকে টানছে..

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস,সঞ্চালক ও বাচিক শিল্পী

সে এক কান্ড বটে! শুধু কি কান্ড! এক বি শা ল কান্ড! এ যাবৎ কেবলমাত্র বইয়ে, ছবিতে বা টেলিভিশনের পর্দায় দেখার সুযোগ হয়েছিল; এ বার এক্কেবারে চাক্ষুস করা! তোড়জোর শুরু হল আগে থেকে। তবে শুধুই মানসিক তোড়জোর। বাকিটুকু যেমন কবে কিভাবে ইত্যাদি জানা গেল শেষমুহূর্তে, তাই আগে থেকে তৈরি হওয়ার সুযোগ ছিলনা! আজ জানা গেল কালই যাওয়া। একদম ভোর ভোর বেরোনো। বেশ খানিকটা পথ গাড়িতে যেতে হবে। পৌঁছনোর পরে বেশকিছু দরকারি সরকারি কাজ সারতে হবে! তাড়াতাড়ি পারমিশন করানো হলে হাতে খানিকটা সময় পাওয়া যাবে, ঘুরেফিরে দেখার! ভোর ৫:৩০টায় পুত্রসহ কর্তাগিন্নী রেডি! গাড়ি এলেই ‘যাত্রা হল শুরু’ গান গাওয়া যায়! একে একে আরো তিন জোড়া কর্তাগিন্নীকে তাদের ছানাপোনাসহ গাড়িতে তুলতে হবে!

আনন্দ যাত্রা

এদের মধ্যেই আছেন সেই বিশেষ ব্যক্তি, যাঁর দৌলতে এই অভাবনীয় সুযোগ মিলেছে! একটু খুলে বলি! হল কি, রিনুর কর্তার এক ছোটবেলার বন্ধুর ‘বরবাবাজী’, জাহাজের এক হোমরাচোমরা কর্তাব্যক্তি! তিনি বছরে ছ’মাস জলে ভাসেন; বাকি সময়টুকু আত্মীয় বন্ধুর সঙ্গে ডাঙায়; অসম্ভব দিলদরিয়া-প্রাণখোলা এই বন্ধু গত কয়েকমাস রয়েছেন জাহাজেই! তো তিনি বার্তা দিলেন তাঁর জাহাজ এই সমুদ্র ঘুরে, সেই সমুদ্র পেরিয়ে, দু চারটে দেশকে ছুঁয়ে, হাতের কাছে হলদিয়ায় নোঙর করতে চলেছে কয়েকদিনের জন্য! কার্গো শিপ। ভাইজ্যাগে আনলোডিং এর পর হলদিয়ায় আসবে সেই শিপ; খবরটা বন্ধুদের জানানোর যা দেরি, অত্যুৎসাহী জনগণ দুপায়ে খাড়া, হাত নেড়ে পা বাড়িয়ে তারা জাহাজ দেখতে যাবেই পণ করে বসলো! মিস্টার বসুরও উৎসাহে কমতি নেই! তিনি বলেইদিলেন সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে, মানে জরুরি সব পারমিশন ইত্যাদি প্রভৃতি; শুধুমাত্র হলদিয়া অবধি পৌঁছনোর কাজটুকু করতে হবে বাকিদের! কিন্তু তিনি যেটা নিশ্চিত করে বলতে পারলেন না, তা হল কবে জাহাজ হলদিয়ায় আসবে! একেক জায়গায় থেমে জিনিষ তোলা নামানোর কাজ করতে যে ঠিক কতটা সময় লাগবে তা কোনমতেই আগে থেকে বলতে পারা যায়না! অগত্যা রিনু ও বাকি অত্যুৎসাহী জনতা রোজই জিগ্যেস করে ‘কবে কবে?’ অতঃপর সেই দিন আসিলো! মিস্টার বসু ঘোষনা করলেন ‘কাল তোরা আয়’; ব্যস্, উত্তেজনা চরমে! ছানাপোনারা ‘তাহলে কখন যাওয়া? পারমিশন কে দেবে? সকলেরই আধার কার্ড দরকার? ব্যাগ গোছাতে হবে কি? ইত্যাকার নানা প্রশ্নে বাবা মাদের অস্থির করে তুলে

জাহাজের ডেকে

আগের রাতে ঘুমোতে গেল! বড় হয়ে গেলে নাকি ছেলেমানুষী করতে নেই! মানে তোমার মনে উত্তেজনার পারদ টগবগিয়ে ফুটলেও মুখে শান্তভাব বজায় রাখাই নিয়ম! রিনুর হয় বেজায় মুশকিল! যবে থেকে মিস্টার বসু বলেছেন ‘বছর দশেকের পরে হলদিয়ায় আসছি, আবার কবে হবে জানা নেই; তোরা যে যে জাহাজ ঘুরে দেখতে চাস, চলে আয়’, রিনু তৎক্ষণাৎ দু হাত তুলে জানিয়ে দিয়েছে ‘আছি’ , ‘যাবোই, আমি যাবোই’… এক এক করে বাকিরাও হ্যাঁ বলেছে; ইস্কুল কামাই করে, অফিসকাছারিতে manage করে, work from home করবে বলে সকলেই এবার রিনুর দলে! মিস্টার বসু, আগের রাতে হলদিয়া থেকে চলে এসেছেন কলকাতা; পরদিন ভোরবেলা গিন্নীসহ তিনিও যাবেন বন্ধুদের সঙ্গেই! সক্কালবেলা বেরিয়ে পড়ে হলদিয়া তো পৌঁছনো গেল। পারমিশন নিয়েও কোন ঝামেলা হলনা! মিস্টার বসু সব ব্যবস্থাই করে রেখেছিলেন; এরপর স্তুপীকৃত কয়লার মধ্যে দিয়ে জাহাজ অবধি যাওয়া; মানে যেখানে জাহাজ দাঁড়িয়েছে, সেই পয়েন্ট অবধি পৌঁছনো। সেখানে গিয়ে জাহাজে ওঠা; সার দিয়ে জাহাজ দাঁড়ানো। একটার পর একটা.. নির্দিষ্ট জাহাজের কাছে যাওয়ামাত্র সবার মুখ থেকে একটাই শব্দ শোনা গেল ‘আরেব্বাস’!!! গাড়ি থেকে নামার আগেই মিস্টার বসু মানে আমাদের কল্লোল স্যর, হাতে ধরিয়ে দিলেন গ্লাভস্! কেন? জাহাজে ওঠার সময় হাতে পরতে হবে! নাহলেই সিঁড়িতে যে কালি লাগা আছে তা হাতময় হয়ে যাবে! জাহাজে ওঠা কিভাবে? সে এক ইয়া লম্বা সিঁড়ি দিব্যি ঝুলে আছে ( আজ্ঞে, ঝুলেই আছে; দুপাশে মোটকা দড়ি দিয়ে সিঁড়িটি ঝুলছে!)ওই উপর থেকে এই নীচ অবধি! তা প্রায় তিনতলা বাড়ির ছাদ থেকে মাটি ছোঁয়া হাইট! রোজকার ওঠানামার চেনা সিঁড়ির সঙ্গে কিন্তু এর কোন মিল নেই! খাড়া একটা সিঁড়ি! ঘাড় উঁচু করে একবার দেখেছ কি মাথা ঘোরা শুরু! আগেই কল্লোল বলে দিয়েছে ‘একদম উপরের দিকে দেখবিনা, ঠিক তোর সামনের ধাপটাতে তাকাবি; নাহলেই কিন্তু কেলো!’

ইঞ্জিন রুম

কেলোই বটে! রিনুর কর্তামশাই কল্লোলের আনা মিষ্টির প্যাকেট হাতে নিয়ে মাঝ সিঁড়িতে গেলেন থমকে! মাথা নীচু করে স্থানুবৎ! রিনু তো টের পাচ্ছে কিছু একটা গন্ডগোল; বেশ খানিক থেমে থেমে তিনি ডেক-এ পৌঁছলেন! ততক্ষণে ডেক জমজমাট! জাহাজের লোকজনের সঙ্গে রিনুদের দলবল হাজির! সবার আগে পৌঁছেছে কুচোরা! তাদের মধ্যে ‘বুম’-এর উৎসাহ সবচেয়ে বেশি। ভোরবেলা গাড়িতে উঠে থেকে মিনিট দশ পনেরো পর পরেই তার জিজ্ঞাস্য ছিল ‘এসে গেছি?’ সত্যি সত্যি এসে গিয়ে সে খুশিতে ডগোমগো! রিনুর ছানা তার ডাগর চোখের পলক না ফেলে দেখে চলেছে চারপাশ! বুবু এবং জাবলো-আরো দুই ছানাও যারপরনাই excited! ডেক, ইঞ্জিনরুম এবং ‘ব্রিজ’ দেখা হবে পরে; প্রথমে কল্লোল স্যরের apartment এ যাওয়া! মানে এই বন্ধুর সেই অস্থায়ী আস্তানাই এবার গন্তব্য! রুমে যাওয়ার পথে মিস্টার বসু তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করাতে লাগলেন! রুমে ঢুকেও বেশ অবাক হবার পালা! পেল্লায় ঘর নয় ঠিকই, কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় জীবনের সবই সেখানে মজুত! এই ঘরে আসতে রিনুরা তিনতলা উঠলো। মানে officer’s room তিনতলার উপরে! বাইরের ঘর পেরিয়ে শোবার ঘর। বাইরের ঘরে fridge থেকে tv সবই আছে; ভেতরের ঘরে পরিপাটি বিছানা; আলমারি ইত্যাদি। লাগোয়া টয়লেটটিও অতি উত্তম! ঠান্ডা মেশিন বোঝাই ফলের রস, ঠান্ডা পানীয়; যার যা পছন্দ নিয়ে খেলেই হল! পুচকেদের জন্য দেদার মুখোরোচক চিপস্! বাকিদের অল্প বিশ্রাম নিতে বলে, কল্লোল চটপট বাইরের জামা বদলে কাজের জামা পরে নিল। তার ইঞ্জিন রুম যেতে হবে। খানিক বাদে বাকিরাও চললো সেখানে! আরো একবার ইয়া বড় হাঁ করে রিনুরা দেখলো জলের নীচে সে কি মহা যজ্ঞ চলছে সর্বক্ষণ! ক-ত মেশিন, ক-তধরনের কাজ করে চলেছে চব্বিশটি ঘন্টা! গায়ে হলকা লাগে এমন গরম সেইখানে, সঙ্গে কানে তালা লাগানো আওয়াজ! ইঞ্জিন রুমে যাবার আগে কানে ear plug গুঁজতে হয়েছে সবাইকে! অনভ্যস্ত কান অত জোর আওয়াজ নিতে পারেনা! কল্লোল দারুণ উৎসাহ নিয়ে পুরো দলের গাইড! তাকে ঘিরে রিনুরা! এক এক করে কল্লোল চেনাচ্ছে কোনটা কি মেশিন, কি তার কাজ! পরের পর সিঁড়ি দিয়ে নামা আর ওঠা! একসময়ে শোনা গেল জলের নীচে প্রায় পাঁচতলা নেমে এসেছে রিনুরা! জাহাজটির জলের নীচে আছে প্রায় পাঁচতলা; উপরেও প্রায় তাই! জাহাজে যাঁরা চাকরি করেন তাঁরা সারাদিন অনবরত ওঠানামা করেন! মিনিট চল্লিশ পর রিনুরা আবার ডেকে! এবার দেখা কিভাবে কয়লা unloading হয়! ডেকে বিশাল বিশাল গহ্বর! মানে তার নিশ্চয় নাম আছে কোন। কিন্তু দেখে গহ্বরই মনে হচ্ছিল! Cargo! তারমধ্যে এসেছে ৭৭ হাজার মেট্রিক টন কয়লা। নামছে হলদিয়ায়। এই কয়লা জাহাজের সেই কম্পার্টমেন্ট থেকে তুলে পাশে ডাঙায় জড়ো করা হচ্ছে বিশাল ক্রেনের সাহায্যে!

কন্ট্রোল রুম

যেটার মধ্যে থেকে কয়লা নেওয়া হয়ে গেছে সেই কম্পার্টমেন্টকে দেখে বুক ধক্ করে উঠছে! খালি একটা বিশা-ল ফাঁকা জায়গা! ভেতরে জমাট হয়ে আছে খানিকটা অন্ধকার! কতজন ছুটোছুটি করে এই কাজ তদারক করছেন! রিনুরা শুধু দেখছে! আর দেখছে। এরপর জমাটি আড্ডা! ডেক থেকে ঘরে গিয়ে জাহাজে অসম্ভব ভালো কুকের তৈরি করা চিংড়ির পকোরা আর চিকেন তন্দুরী খেতে খেতে তখন মিস্টার বসুকে ধন্যবাদ দেওয়া চলছে! ডাক আসে ক্যাপ্টেনের ঘর থেকে। তাঁর পরিবারও আছে জাহাজেই! ক্যাপ্টেন এবং তাঁর গিন্নী রিনুদের দলে আর তাঁর দুই পুত্রকন্যা চলে যায় ছোটদের দলে! নিমেষের মধ্যে বড়রা আড্ডায় আর ছোটরা খেলায় মশগুল! দুপুরের খাওয়ার আগে ‘ব্রিজ’ দেখা হবে! বিষয়টা কি কিসুই জানা নেই! মূর্খ রিনু সবার পিছু পিছু চলে! পৌঁছে বুঝতে পারে সিনেমাতে এই জায়গার ছবিটা দেখেছে! ঘরটার চারদিক কাচে ঘেরা। অজস্র মেশিন। লাল আলো নীল আলো জ্বলছে নিভছে! এখান থেকেই মূলত জাহাজ চালানোর কাজটা করেন ক্যাপ্টেন! সেই যে স্টিয়ারিং, যা ঘুরিয়ে ডানদিক বাঁদিক যেতে হয়, সেটাও এখানেই! আগে বেশিরভাগ কাজ হত ম্যানুয়ালি; এখন যন্ত্রই করে মূলত। তাকে চালায় মানুষ! কোন কারণে একটা সিস্টেমে কোনরকম গোলযোগ দেখা দিলে আরেকটা সিস্টেম চালু হয়ে যায়! ব্রিজে গন্ডগোল হলে ইঞ্জিন রুম সামাল দেয়! জাহাজ তরতর করে এগিয়ে যায়! সময়টাও এগোতে থাকে! হুস্ করে কখন যেন দুপুরের খাবার সময় হয়ে যায়; তারপরেই ফেরার তোড়জোর! যাবো যাবো ভাবতেই বেশ লাগে; গেলেই সব শেষ! ফেরার সময় আবার সেই গ্লাভস্ , সেই দড়ি, সেই সিঁড়ি; নীচে গাড়ি অপেক্ষা করছে; রিনুদের ফিরতেই হয়; জাহাজে থেকে যান মিস্টার বসু! যাকে সেদিন টা টা করার সময় দলের আর সকলের চোখেই টইটম্বুর কৃতজ্ঞতা! বহুক্ষণ চুপ থাকার পর রিনুর ছেলে বলে আর্কিয়োলজিস্টের সঙ্গে সে কল্লোল পিসোর মতো বড় হয়ে সে ‘মেরিন ইঞ্জিনীয়র’ হতে চায়… জাহাজ তাকে টানছে..

 ছবিঃ লেখক 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com