জলাঞ্জলি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

শাহরিয়ার খালেদ

রবিঠাকুর দাঁড়িয়ে আছেন বইয়ের দোকানের সামনে। আজ বই আসার কথা, অন্ততঃ প্রকাশক তাই বলেছিলেন। বই প্রকাশ এতো ঝামেলার ব্যাপার তাঁর জানা ছিল না। প্রায় প্রতিদিন আসবে আসবে করেও বই আসছে না। তাঁর উৎকণ্ঠা বেড়েই চলেছে। এদিকে বইমেলায় হাজার বইয়ের ভীড়। তাঁর ধারণাও ছিল না এমন হতে পারে। শোনা কথা, এবছর প্রায় সাড়ে তিন হাজার নতুন বই এসেছে বইমেলায়। এতো বইয়ের ভীড়ে তাঁর জায়গা মিলবে? আগে জানলে প্রকাশক কে অনুরোধ করতে যেতেন না।

-কি নাম?

-রবিঠাকুর

-কি?

-আজ্ঞে, শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

প্রকাশক হাসতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন এই প্রথম তিনি তাকালেন আগন্তুকের দিকে। সাদা আলখাল্লার মতো۔সাদা পাকা চুল দাঁড়ি নিয়ে বেশ ধরেছে

-তা আমার কাছে কি জন্য? প্রকাশক জানতে চান।

-আজ্ঞে, একটা বই প্রকাশ করবো।

-কি বই?

-জি কবিতার

-তা লেখা টেখার হাত আছে না এই প্রথম?

-জি না জনাব, এর আগেও লিখেছি, বলে পান্ডুলিপিটা এগিয়ে দেন সামনে।

-কি নাম ছিল বইগুলোর? নাম মনে আছে?

– জি জনাব, বেশ মনে আছে। আমার জীবনের সেরা লেখা সেগুলো, সঞ্চয়িতা, গীতাঞ্জলী।

প্রকাশক ফিক করে হেসে ফেলেন আর তখনি নজরে পরে পাণ্ডুলিপির স্বাক্ষরের উপর। ঠিক রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষরের মতো। তারপর হাতের লেখাটাও একই রকম। বইয়ের নাম জলাঞ্জলি।

প্রকাশক অনেক্ষণ ধরে পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে থাকেন। রবীন্দ্রনাথ বুঝে পান না কি করবেন। এর আগে কখনো প্রকাশকের মুখোমুখি তিনি হননি। একবার তিনি দাঁড়িতে হাত দিয়ে খেলা করেন, একবার হাত দিয়ে পাঞ্জাবির পকেটের একটা সুতো নাড়াচাড়া করেন, একবার চটি খুলে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে কার্পেটের রেশমে ঘষেন। দেয়ালে তাঁর একটা টানানো ছবি দেখা যায়। মনে মনে তিনি শিল্পীর কাজের প্রশংসা করেন। তুলির প্রতিটি আঁচড়ে যেন যৌবন ঝরে পড়ছে। পেছনের আলমারীতে তারই লেখা বইয়ের সারি। আবার কিছু বই তাকে নিয়ে লেখা। রবীন্দ্রনাথ ও সমকালীন সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথের জীবনে নারী, রবীন্দ্রসংগীত ও সমকালীন চিন্তা ভাবনা ইত্যাদি। তার সম্বিৎ ফিরে আসে প্রকাশকের কথায়

-বেশ ছাপাবো তবে টাকা পয়সা দিতে পারবো না।

রবীন্দ্রনাথ লজ্জায় পড়ে যান। জিভে কামড় দিয়ে ডানে-বামে ঘন ঘন মাথা নাড়েন তিনি।

-ধন্যবাদ জনাব, অশেষ ধন্যবাদ। আপনি রাজী হয়েছেন, এর চেয়ে আনন্দের বার্তা আর কি হতে পারে।

তিনি ধীর পায়ে বেরিয়ে আসেন ঘর থেকে। আজ তার মন প্রফুল্ল।

রবিঠাকুর গত হয়েছেন গত শতকে। প্রায় আশি বছর আগে। এ পর্যন্ত যা তিনি লিখে গেছেন তা ঈর্ষণীয়। নতুন করে কোনো বই ছাপার তাঁর দরকার ছিলোনা। অথচ জীবনানন্দের কবিতার মতোই যেন,

ঘুম কেন ভেঙে গেলো তার। আর পরপরই যেন

জাগিবার গাঢ় বেদনার

অবিরাম অবিরাম ভার সহিবেনা আর..। তাঁর মনে হলো বাংলা নামের দেশে, ভাষার মাসে, বইয়ের মেলায় তাঁর অন্ততঃ একটা বই বের করা উচিৎ। অতঃপর তিনি কলম ধরলেন।

প্রকাশক বলেছিলেন কোন এক নবীন চিত্রকরকে দিয়ে তাঁর বইয়ের প্রকাশনা উৎসব মানে মোড়ক উন্মোচন করাবেন। তিনি না পারেন হাসতে, না পারেন কাঁদতে। একসময় নিজেই কত ভালো ছবি আঁকতেন। এমনকি কবিতা লেখার সময় কোথাও ভুল হলে সেখানেও ঝর্ণা কলম দিয়ে এমন করে কাটাকুটি করতেন যে তাও শিল্প বলে ধরা যেত। আর তাঁর বইয়ের প্রকাশনা উৎসব করবে এক নবীন চিত্রকর। যস্মিন দেশে যদাচ৷র। তিনি নীরব থেকেছেন।

আজ বইমেলার শেষদিন। প্রতিদিন রবীন্দ্রনাথ এসে বসে থেকেছেন বইমেলায়। মেলার ধুলো মাটি তাঁর পোশাকের শুভ্রতাকে ম্লান করেছে। কিন্তু তাঁর মনকে কলুসিত করতে পারেনি। প্রকাশক প্রতিদিন নানা অজুহাত দিয়েছেন, প্রুফ দেখা হয় নি, বাঁধাইয়ের কাজ এখনো বাকি, প্রচ্ছদের মলাট ছাপা হলো বলে। রবীন্দ্রনাথ জানেন, প্রকাশককে অনেক চড়াই উৎরাই এর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। মনকে শান্ত করেন তিনি।

মেলার শেষ দিন বলেই আজ দৃশ্য অন্যরকম। বিকেলে মধ্যেই কোনো কোনো দোকানের বাঁধা-ছাঁদার কাজ শেষ। কেউ বই বাক্সে ভরছেন, কেউ হিসাব মেলাচ্ছেন। এরই মাঝে নবীন লেখক যাঁদের বই দেরীতে এসেছে বা বিক্রি হয়নি তাঁরা বইয়ের উপর নিজের স্বাক্ষর দিয়ে বিলি করছেন বিনামুল্যে। সবার মধ্যেই একটা গা ছাড়া ভাব। প্রতিমা বিসর্জনের পর ভক্তের মন যেমন ভারাক্রান্ত থাকে দুঃখে। রবীন্দ্রনাথ আশা করছেন এই শেষ মুহূর্তে হলেও তাঁর বইটা আসুক। তিনি প্রকাশকের সঙ্গে দেখা করার জন্য সোহরোওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত নির্দিষ্ট দোকানের দিকে হাঁটা ধরলেন।

রাস্তায় দেখা মিললো প্রকাশকের। তিনি বইয়ের দোকান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে দেখে তিনি একটা হাত উঁচিয়ে নেতিবাচক ভঙ্গিতে নাড়লেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পথ রোধ করে জানতে চাইলেন বইটা আজ আসবে কিনা। প্রকাশক তাঁর সহকারীর দিকে ইঙ্গিত করলেন। থলের ভেতর থেকে পাণ্ডুলিপি বেড়িয়ে এলো। রবীন্দ্রনাথের হাতে গুঁজে দিয়ে শীতল গলায় প্রকাশক বললেন, না।

ছোটবেলায় নিয়ম বাঁধা দ্বায়িত্বের মধ্যে খাওয়া, পড়তে বসা, ছবি আঁকা, কুস্তি লড়া এসব করে তিনি যেমন হাঁপিয়ে উঠতেন, তেমনি একের পর এক প্রশ্ন এসে তাঁকে অস্থির করে তুললো। তাহলে প্রুফ দেখা, প্রচ্ছদ করা, মলাট মুদ্রণ, মোড়ক উন্মোচন এর সবই মিথ্যে? হঠাৎ করেই তাঁর মনের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে বলে মনে হলো। তার সফেদ সাদা পোশাকে আবৃত দেহটাকে অনেক কষ্টে তিনি টেনে নিয়ে চললেন।

রাত ন’টা বেজে গেছে। বাতিগুলো নিভে যাচ্ছে এক এক করে। শুধু মাত্র যাদের প্রয়োজন তারা ছাড়া আর কেউ নেই। রবীন্দ্রনাথ উদ্যান থেকে বেরিয়ে একাডেমির বর্ধমান ভবন বায়ে রেখে সামনে এগুলেন। প্রথমেই কিছু স্মৃতি স্তম্ভ, তার সামনে এক নতুন ভবন। সেগুলো পেরিয়ে তিনি চলে এলেন পুকুর পাড়ে।

জায়গাটা নির্জন। রবীন্দ্রনাথ পুকুরের বাঁধানো সিঁড়িতে গিয়ে দাঁড়ালেন। আলো এখানে নেই বললেই চলে। একটু নীচু হয়ে হয়ে পরম মমতায় তিনি পাণ্ডুলিপিটি ভাসিয়ে দিলেন পানিতে। দু-হাত উদার খুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো..। বলতে গিয়ে তার গলা ধরে এলো, শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। তার সাহিত্য জীবনে এমন দুঃখ কি কোনদিন পেয়েছেন? তার কণ্ঠের তেজ মিলিয়ে গিয়ে শোনাল এক ভগ্ন হৃদয় মানুষের মতো। আবারো তিনি শক্তি সঞ্চয় করে শুরু করলেন..

যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো

তবুও তাদের ক্ষমা করো তুমি, তবুও বেসো ভালো।

তাঁর দুই চোখ থেকে মুক্তবিন্দুর মতো অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। সিঁড়ি বেয়ে তিনি নেমে গেলেন পানিতে। মৎস্য কন্যার গায়ে সূর্যের আলো পরায় সে যেমন ফেনা হয়ে মিশে গিয়েছিল তেমনি রবীন্দ্রনাথও পানির মধ্যে মিলিয়ে গেলেন নিঃসীমে।

ছবি:গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com