জন্মদিনে শুভেচ্ছা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আলী আসগর স্বপন

আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির একজন খ্যাতিমান অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী রওশন জামিল।আজ খ্যাতিমান এই ব্যাক্তিত্বের জন্মদিন।তাঁর প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা।
অবিস্মরণীয় প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী রওশন জামিল, যাঁর কাছে আমাদের ঋণ অশেষ। আজন্মের শিল্পী রওশন জামিল, নৃত্যশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও এক সময় পেশাদার অভিনেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ষাট থেকে সত্তরের দশকের পুরোটা সময়ই তিনি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের অনন্য অভিনেত্রী, আপন সৃজনী ক্ষমতা প্রদর্শনে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।  রওশন জামিল সব ধরনের চরিত্রচিত্রণেই সমান পারদর্শী ছিলেন। অভিনেত্রী হিসেবে তিনি নতুন একটি স্টাইল নির্মাণ করেন। তাই সবার মধ্যে থেকেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা ২৭৫। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি মঞ্চ, রেডিও, টেলিভিশন-নাটকে অভিনয় করেছেন। ঋত্বিক ঘটক, জহির রায়হান, শেখ নিয়ামত আলী, আমজাদ হোসেন প্রমুখ বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকারের সৃষ্টিকে বিকশিত করতে তাঁর অভিনয় দক্ষতার স্বীকৃতি দিতেই হবে। নির্ভেজাল দেশপ্রেমী, স্পষ্টভাষী মানুষ রওশন জামিল তাই আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে সংস্কৃতি সাধনার ক্ষেত্রে প্রেরণার উৎস।

স্বামী গওহর জামিলের সঙ্গে

একাধিক চলচ্চিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে সবার মনে দাগ কাটেন। ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচ্চিত্রে তার অসাধারণ অভিনয় সবার মন কেড়ে নেয়। শেখ নেয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন শাকের পরিচালিত ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ছবিতেও রওশন জামিলের বলিষ্ঠ অভিনয় একটি দৃষ্টান্তমূলক পারফরমেন্স বলা চলে। ওই ছবিতে তার চরিত্র ছিল একজন গ্রাম্য ভিক্ষুকের। একজন ধ্রুপদী অভিনেত্রীর পারফরমেন্স সেখানে ফুটে উঠেছে। অভিনয়ের ক্ষেত্রে নিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন তিনি। অনায়াসে বুঝে নিতেন চরিত্রের মূল ভাব। কেউ কেউ স্বশিক্ষিত এ অভিনেত্রীকে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করেন। জহির রায়হান পরিচালিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে রওশন জামিলের অসাধারণ অভিনয় সবাইকে মুগ্ধ করে। সেখানে তার স্বৈরাচারী, কঠোর গৃহশাসকের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্র যে ধরনের চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছিলেন ব্যক্তি ও শিল্পীজীবনে তার বিপরীত মেরুতে ছিল তার অবস্থান।তাঁর শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি তানভীর মোকাম্মেলের ‘লালসালু’সহ, ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’, ‘নয়ন মণি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘গোলাপী এখন ঢাকায়’, ‘মাটির ঘর’, ‘পোকা মাকড়ের ঘরবসতি’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রের অভিনয় করেছেন তিনি।
আর এভাবেই সৃজনীশক্তির আলো জ্বালিয়ে বহুমাত্রিক ও মহৎ শিল্পী রওশন জামিল সমৃদ্ধ করেছেন আমাদের মঞ্চ এবং টিভি-নাটক, নৃত্য ও চলচ্চিত্রশিল্পকে। অভিনয়ে তাঁর ছিল অসাধারণ দক্ষতা। প্রতিটি চরিত্র নান্দনিকভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। আঙ্গিক ও বাচিক অভিনয়ে তিনি অতুলনীয়। অভিনেত্রী হিসেবে অভিনয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার সৃজনশীলতার ছাপ ছিল। তিনি স্বাপ্নিক ও মহৎ মানুষ ছিলেন। তার অসাধারণ অভিনয় দেখেই আমরা সবাই তাকে চিনি,স্বজন মনে করি। জানা যায়, এই সংস্কৃতি সাধক ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন রুচিশীল, দয়ালু, স্নেহশীল, সজ্জন, মাতৃরূপী।

ঢাকার রোকনপুরে এক অভিজাত মুসলিম পরিবারে রওশন আরা করিম ওরফে রওশন জামিলের জন্ম। তাঁর বাবা আবদুল করিম এবং মা হোসনে আরা বেগম। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রথম সন্তান। শৈশব থেকে ‘ভারতবর্ষ’, ‘সওগাত’, ‘বুলবুল’, ‘পরিচয়’ পত্রিকা পাঠের অভ্যাস। শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে থাকার পরও তার পরিবারে নৃত্য-গীত অভিনয় ছিল একবারে নিষিদ্ধ। তবুও মায়ের অনুপ্রেরণায় সমাজের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে রওশন নাচ শিখেছিলেন। শৈশবেই রওশন নাচের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নৃত্যানুশীলন শুরু করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে তার নাচ শেখার শুরু ১৯৪৭ সালে; শিল্পী গণেশ নাথ (নৃত্যাচার্য গওহর জামিল) ও রবিশঙ্কর চ্যাটার্জির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘শিল্পকলা ভবনে’। স্কুলটির মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক নৃত্যচর্চার সূচনা। ১৯৪৮ সালে ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মঞ্চস্থ ‘ইন্দ্রের সভা’ (ঢাকায় মঞ্চস্থ প্রথম নৃত্যনাট্য) নৃত্যনাট্যে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন রওশন। তারপর বৈরী জীবন ও সমাজের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, শিল্পের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নেওয়া।
তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় লক্ষ্মীবাজার সেন্ট ফ্রান্সিস মিশনারি স্কুলে। পরবর্তীতে তিনি কামরুন্নেসা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করে ভর্তি হয়েছিলেন ইডেন কলেজে। ম্যাট্রিক পাসের পর ওয়ারী শিল্পকলা ভবনে নাচের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণকালে প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যকলার শিক্ষক প্রয়াত গওহর জামিলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় থেকে প্রেম ও পরিণয় (১৯৫২) হয়। এই দম্পতির দুই ছেলে ও তিন কন্যা সন্তান।

টিভি নাটকের একটি দৃশ্যে

 কলেজে পাঠকালেই গণেশ নাথের কাছে নাচ শেখা শুরু তাঁর। এক পর্যায়ে গণেশের সঙ্গেই প্রেম। ইডেন কলেজে বছরখানেক উচ্চমাধ্যমিক পড়ার পর ১৯৫২ সালে বিয়ে। পঞ্চাশের দশকে যখন কোনো মুসলিম মেয়ের সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের ছেলের বিয়ে কেউ স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারত না তখন তাদের বিয়ে হয়। গণেশ নাথ ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন গওহর জামিল নামে। অতঃপর জীবনের নতুন অধ্যায় যোগ। নিয়মিত স্বামীর তত্ত্বাবধানে নৃত্যের তালিম নেওয়া, নতুন নাচের কম্পোজিশন ও মঞ্চে নৃত্য উপস্থাপনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। এক পর্যায়ে উপমহাদেশীয় ধ্রুপদী নৃত্যে দক্ষতা অর্জনের কথা ভাবেন এবং কলকাতায় গিয়ে দুজনে (১৯৫৪-৫৫) তালিম নেন। নৃত্যগুরু পণ্ডিত মারুথাপ্পা পিল্লাই ও পণ্ডিত রাম নারায়ণ মিশ্রের কাছে তারা শিখেছিলেন ভরতনাট্যম ও কথাকলি নৃত্য। গুরু-শিষ্য পরম্পরায় নৃত্যচর্চার ফলে রওশন জামিল একজন দক্ষ নৃত্যশিল্পী হয়ে ওঠেন। অচিরেই ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ওই সময় দেশে-বিদেশে রাষ্ট্রীয় ডেলিগেশনে স্টেজ পারফমেন্সে তাদের অংশগ্রহণ ছিল অনিবার্য।
গওহর জামিল তাঁর নৃত্যগুরু হলেও এক সময় রওশনই নৃত্যশিল্পী হিসেবে বিশেষ প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তাঁরা ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন নৃত্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র জাগো আর্ট সেন্টার। এদেশে নৃত্য শিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে এই শিল্পিযুগল অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল নৃত্য, সংগীত ও চারুকলা চর্চার মাধ্যমে দেশের জন্য আদর্শ নাগরিক তৈরি। প্রায় ছয় দশকের চর্চায় জাগো আর্টের বহু শিক্ষার্থী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গৌরবজনক ভূমিকা রেখেছে। রওশন ও গওহর জামিল আমৃত্যু বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। স্বামীর মৃত্যুর পর রওশন জাগো আর্ট সেন্টারের সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৬৫ সালে টেলিভিশনে রক্ত দিয়ে লেখা নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে রওশন জামিলের অভিনয়জীবন শুরু হয়। বিটিভির ঢাকায় থাকি এবং সকাল সন্ধ্যা ধারাবাহিক নাটকের অভিনয় তাঁকে অবিস্মরণীয় করে রেখেছে। চলচ্চিত্রাভিনয়ে তাঁর যাত্রা শুরু ১৯৬৭ সালে আরব্য রূপকথা আলিবাবা চল্লিশ চোর ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে। চলচ্চিত্রে জীবনঘনিষ্ঠ অভিনয়ের কারণে তিনি বিশেষভাবে খ্যাতি লাভ করেন।
বিকল্প ধারার বহু চলচ্চিত্রেও তিনি অভিনয় করেন। তিনি বহুসংখ্যক টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এদেশে যখন ছেলেদের মেয়ে সেজে মঞ্চে অভিনয় করতে হতো, সেই তখনই (১৯৫২ সালের দিকে) রওশন জামিল জগন্নাথ কলেজে মঞ্চায়িত শরৎচন্দ্রের দেবদাস নাটকে অভিনয় করেন। তিনি বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্রেরও মডেল হন।
দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, টেনাশিনাস পদক, সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড, বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার, তারকালোক পুরস্কারসহ বহু পদক ও পুরস্কারে ভূষিত হন। নৃত্যে তিনি ১৯৯৫ সালে একুশে পদক লাভ করেন।২০০২ সালের ১৪ মে সকাল ৭টা ২২ মিনিটে ঢাকা। তাঁর অমর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর ও বিনম্র শ্রদ্ধা।

তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com