ছবিগুলোতে লেগে থাকা আদরগুলো কেমন আজীবন ঘিরে রাখে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কলকাতা থেকে রিনির ফোন। রিনি মানে বাচিক শিল্পী রিনি বিশ্বাস। প্রাণের বাংলার জন্য ধারাবাহিক ভাবে লিখতে চাচ্ছেন ওর ছেলেবেলার গল্প, বেড়ে ওঠার গল্প। এক কথায় রাজি আমরা। সামনের দিনে মিষ্টি সব লেখার স্বাদ পাবেন প্রাণের বাংলার পাঠকরা। সেইসঙ্গে তো অবশ্যই থাকবে রিনির শহর কলকাতার ভিন্ন কৌণিকের ছবি, থাকবে অন্যরকম কিছু মানুষের গল্প। এখন থেকে প্রাণের বাংলার ‘নির্বাচিত’ বিভাগে নিয়মিত ছাপা হবে ‘আলোক রেখার মতো’ এই ধারাবাহিকটি। আশা করছি আপনাদের ভালো লাগবে – সম্পাদক (প্রাণের বাংলা)

রিনি বিশ্বাস

(কলকাতা থেকে):  মা বাবাইয়ের সঙ্গে আলাদা বাড়িতে থাকার আগে রিনু থাকতো তার ঠাকুমা-বাড়িতে.. সে তখন এতই ছোট যে সেসব কথা কিছুই তার মনে নেই.. পরে শুনেছে পাড়ার এক দাদু তাকে অসম্ভব ভালোবাসতেন.. দাদু চাকরি করতেন কোর্টে। কোর্টে যাওয়ার আগে আর বাড়ি ফিরেই তাঁর কাজ ছিল ছোট্ট রিনুকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়া। দু তিনটে বাড়ি এপাশ ওপাশ। দাদুর কোলে করে রিনু যেত ওই দাদুর বাড়ি! দাদুর মুখ তার একটুও মনে পড়েনা! তবে তাঁর ছেলেমেয়েরা, বুলকাকা, টুলকাকা আর মুইপিসি-কমলিপিসিকে বিলক্ষণ মনে পড়ে। আসলে ওঁরা মনেই থাকেন! ছোটবেলাটাই ভালো ছিল বেশ, এই যে দুই পিসি-তারাও যে রিনুর নিজের নয় বরং বেশ দূরের-নেহাতই পাড়াতুতো, সে কথা তখন তো জানা ছিলনা! বড় না হলে জানতেও হতনা! কবছর আগেও রিনুকে মুইপিসি বুকে জড়িয়ে আদর করেছে বাচ্চা মেয়ের মত। কে বোঝাবে পিসিকে এখন রিনুর ছেলেও এই এত্ত বড়!

মা বাবাইয়ের সঙ্গে আমি

ছোটবেলায় ঘুমের ঘোরে বিছানা ভেজানোর অভ্যেস ছিল রিনুর! এখন শুনি এই নিয়ে মা-বাবারা বাচ্চাকে বকে… রিনু কোনদিন এই নিয়ে বকুনি খেয়েছে বলে তো মনে নেই! শুধু নিজের বিছানা ভেজালেও কথা ছিল, মুইপিসিদের বিছানাও নানা জায়গায় ভিজিয়ে ভিজিয়ে বিচিত্র নকশা তৈরি করে ফেলেছিল-কত বড় হবার পর রিনু স্বচক্ষে তা দেখেছে! কই পিসিরাও তো তাকে কখনও বকেনি!! পরে যদিও খেপাতো ‘তোর বিয়ে হলে জামাইকে দেখাবো এই নকশা!’ দাদু যখন চলে গেলেন, তখনও রিনু এতই ছোট যে কিছুই তার মনে নেই… শুধু মনে পড়ে শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে যারা পরিবেশন করছিল, বুলকাকা তাদের ডেকে এনে রিনুকে দেখিয়েছিল; বলেছিল ‘আর কাউকে না খাওয়ালেও হবে, কিন্তু ও যেন ভালো করে খায়… ও খেলেই বাবা শান্তি পাবে…!!’ কোন এক অফিস ছুটির দিনে কুট্টি রিনুকে কোলে করে তার মা সক্কাল সক্কাল তার মামাবাড়ি গেছিল বেড়াতে! দাদু তো তা জানেন না! রোজকার নিয়মে কোর্টে বেরোনোর আগে গেছেন রিনুকে কোলে নিতে! গিয়ে শোনেন রিনু নেই! সেদিন দাদুর কি শরীর খারাপ! বুকে কষ্ট! যন্ত্রণা! শুধু ছটফট করছেন! কোর্ট যাওয়া সেদিন মুলতুবি করতেই হল! দুপুরের পর অবস্থা এমন হল যে বাড়িতে সবাই হসপিটাল নেবার কথা চিন্তা শুরু করলো! এদিকে বিকেল নাগাদ কে যেন গিয়ে খবর দিল ‘রিনু’

ছোটবেলার আমি

ফিরেছে মামাবাড়ি ঘুরে…শুনেই দাদু সুস্থ! হসপিটাল-ডাক্তার-বদ্যি কিছুরই দরকার হলনা.. গিয়ে শুধু রিনুকে নিয়ে এলেন নিজের কাছে….. এখন রিনুর কাজের অনেকটা জুড়ে আছে মঞ্চ; সেই ছোটবেলাতে তার প্রথম মঞ্চ ছিল মুইপিসিদের খাট… নাচ করতে রিনু খুব ভালোবাসে… কুট্টিবেলাতে সে ডেকে ডেকে সকলকে নাচ দেখাতো… সবাইকে খাট থেকে নামিয়ে দিয়ে সে শুরু করতো তার নাচ… একবার কনজান্টিভাইটিস হল ছোট্ট রিনুর! সে কি কষ্ট! চোখে ব্যথা! চোখ জুড়ে বন্ধ! খোলাই যাচ্ছেনা! কেঁদে কেঁদে সে সারা! কোলে নিয়ে পায়চারি করলো কে? মুইপিসি…. তখন রিনুরা থাকে একটু দূরে। অন্য এক বাড়িতে; বুড়োমা( রিনুর ঠাকুমার মা) -র বয়স হয়েছে, তিনি অসুস্থ! একদিন বুড়োমা চলেও গেলেন… রিনুর মা বাবা দুজনেই তো অফিসে! তখন তো ঘরে ঘরে এত ফোনও ছিলনা.. কিভাবে তারা খবর পেয়েছিল কে জানে! তবে দুই পিসি রিনুকে নিয়ে এসেছিল সেদিন! কোথায় থাকে রিনুরা , সেই জায়গার নামটুকু শুধু জানতো পিসিরা। কিন্তু কোন বাড়ি তা জানা নেই! পরের দৃশ্য, রাস্তা দিয়ে রিনুর নাম ধরে ডাকতে ডাকতে তারা চলেছে আর ছোট্ট রিনু একলাফে খাটে উঠে জানলা ধরে ‘এই তো পিসি; এই তো রিনু’ বলে সাড়া দিচ্ছে! এই ছবিটা ছোটবেলার ছবিগুলোর মধ্যে এক্কেবারে টাটকা! বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে এই সব ছবি কেমন হালকা হয়ে যায়… খানিক ফ্যাকাশে… কিন্তু ছবিগুলোতে লেগে থাকা আদরগুলো কেমন আজীবন ঘিরে রাখে… ওম্ দেয়… আর মনে করায় ভালোবাসা ছিল.. ভালোবাসা আছেও…।

পড়ুন
ছোটবেলা আসলে নরম একটা মনকেমন – ১

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com