চ্যাপলিন, চ্যাপলিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমেরিকার বিজ্ঞানী টমান অলভা এডিসন ফিল্মের জন্য ক্যামেরা আবিষ্কার করেছিলেন ১৮৮৯ সালে। দুনিয়া জুড়ে সে নিয়ে তখন মহা হৈ চৈ। এরই মাঝে একই বছরে অষ্ট্রিয়ায় জন্ম নিলো পৃথিবীর নির্মমতম ঘাতক অ্যাডলফ হিটলার। আর সেই একই বছরের ১৬ জুলাই আরেকজন মানুষ জন্ম নিলেন পৃথিবীর বুকে। তিনি চার্লি চ্যাপলিন। যার জীবন আনন্দ বেদানার এক মহাকাব্য হয়ে রয়েছে ইতিহাসের পাতায়।

আজ পৃথিবীর প্রবাদপ্রতিম মূকাভিনেতা কৌতুক অভিনেতা চার্লস স্পেন্সর চ্যাপলিনের জন্মদিন। এই অসাধারণ মানুষটির জন্মদিনে তার স্মৃতির প্রতি প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে রইলো গভীর শ্রদ্ধ্ ভালোবাসা।

১৮৮৯ সালের ১৬ই এপ্রিল লণ্ডনের লন্ডনের ইষ্ট স্ট্রিট ওয়ালওয়ার্থে জন্ম গ্রহণ করেন পৃথিবী বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক চার্লি চ্যাপলিন (Charlie Chaplin) । তার পুরো নাম স্যার চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন জুনিয়র,। চার্লি চ্যাপলিন জন্ম নিয়ে সর্বদাই কুয়াশা রয়েছে। চার্লি চ্যাপলিনের কোনো বৈধ জন্ম প্রমানপত্র পাওয়া যায়নি। সংবাদ মাধ্যম নানা সময়ে নানারকম তথ্য দিয়েছে তার জন্মস্থান সম্পর্কে। এমনকি চলচ্চিত্র জীবনের প্রথমদিকে চ্যাপলিন নিজেও একবার বলেছেন যে তিনি ফ্রান্সের ফঁতেউব্ল শহরে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। ১৮৯১ সালের আদমসুমারী থেকে জানা যায় যে চার্লি তার মা হান্নাহ চ্যাপলিন এবং ভাই সিডনির সাথে ওয়ালওয়ার্থ, দক্ষিণ লন্ডনের বার্লো স্ট্রিটে থাকতেন, এটি কেনিংটন জেলার অন্তর্গত। 

চ্যাপলিনের শৈশব কাটে প্রচন্ড দারিদ্র আর কষ্টের মাঝে। তাই হয়তো তিনি উপলদ্ধি করতেন দেওয়া ও পাওয়াতে কী আনন্দ। তিনি একটা কথা প্রায়ই বলতেন যে, বৃষ্টিতে হাঁটা খুবই ভালো কারণ এই সময় কেউ তোমার চোখের অশ্রু দেখতে পায় না”। দারিদ্রই চ্যাপলিনকে শিশু বয়সেই অভিনয়ের দিকে ঠেলে দেয়। তার মা-বাবা দুজনেই মঞ্চের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তাই এই পেশাতে আসাটা তাঁর কাছে সহজ ছিল। চ্যাপলিন সেইসময়ের জনপ্রিয় লোকদল “জ্যাকসন্স এইট ল্যাঙ্কাসায়ার ল্যাডস” এর সদস্য হিসাবে নানা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। এরপর ১৪ বছর বয়সে তিনি উইলিয়াম জিলেট অভিনীত শার্লক হোমস নাটকে কাগজওয়ালা বিলির চরিত্রে অভিনয় করেন। এই সুবাদে তিনি ব্রিটেনের নানা প্রদেশে ভ্রমণ করেন ও অভিনেতা হিসাবে তিনি যে খুবই সম্ভাবনাময় তা সবাইকে জানিয়ে দেন ।

১৯১৪ সালে তাঁর নিজের সৃষ্ট দ্য ট্রাম্প বা ভবঘুরে চরিত্রটি দিয়ে তিনি বিশ্ব চলচ্চিত্রে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে মানুষকে হাসানোর মত দূরহ কাজটি শুধুমাত্র অঙ্গভঙ্গি দিয়ে যিনি করতেন অত্যন্ত সফলভাবে। সাদাসিধা ভবঘুরে একটা মানুষ, যার পরনে নোংরা ঢিলেঢালা প্যান্ট, শরীরে জড়ানো জীর্ণ কালো কোট, পায়ে মাপহীন জুতো, মাথায় কালো মতো হ্যাট আর হাতে লাঠি। যে ব্যাপারটি কারও চোখ এড়ায় না তা হচ্ছে লোকটার কিম্ভুত আকৃতির গোঁফ। লোকটা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে আর ঘটাচ্ছে অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা। আর এসব দেখেই হেসে কুটিকুটি হচ্ছে বিশ্বের কোটি মানুষ। দ্যা ট্রাম্প চলচ্চিত্র খুঁজে পেয়েছিলো সর্বকালের সেরা শোম্যানকে।

হাস্যরসের মধ্য দিয়ে চ্যাপলিনের চলচ্চিত্রে উঠে এসেছিল সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতিসহ তৎকালীন বিভিন্ন রাজনৈতিক সমস্যা, দুটি বিশ্বযুদ্ধ, হিটলারের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, জাতীয়তাবাদ, মানবাধিকারসহ নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়বস্তু। প্রতিটি চলচ্চিত্রেই স্যার চ্যাপলিন কোনো না কোনো বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন এবং তিনি সেটা করেছিলেন তাঁর চিরচেনা দ্য ট্রাম্প স্টাইলে। বিশেষ করে বিভিন্ন ছবিতে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার যে পরিস্ফুটন দেখা যেত তা ছিল সত্যিই অসাধারণ।

মানুষের জীবন সম্পর্কে তিনি বলতেন, ‘মানুষের জীবন ক্লোজ শটে দেখলে ট্র্যাজেডি, কিন্তু লং শটে সেটাই কমেডি।’ নির্বাক চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তী সবাক চলচ্চিত্র সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘শব্দ খুবই দুর্বল। ওটাকে ‘হাতি’র চেয়ে বড় কিছুই বলা যায় না।’ আর এই কমেডিয়ানের শ্রেষ্ঠ উক্তি সম্ভবত এটাই: ‘না হেসে একটা দিন পার করা মানে একটা দিন নষ্ট করা।’

তার জীবনের একটি বিশাল ট্র্যাজেডি হলো তার একটি স্বীকৃতি! সেটি হচ্ছে চ্যাপলিনের অস্কার জয়। তিনি অনারারি অ্যাওয়ার্ড ছাড়াও কম্পোজার হিসেবেও অস্কার জিতেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে এতোবড় একজন অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও অভিনেতা হিসেবে কখনোই তিনি অস্কার জিততে পারেননি। ১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর, ৮৮ বছর বয়সে এই মানুষটি পৃথিবীকে বিদায় জানান।

তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রঃ মেকিং অব লিভিং (১৯১৪), দ্য ট্রাম্প (১৯১৪), কিড অটো রেসেস অ্যাট ভেনিস (১৯১৫), এ ডগস লাইফ (১৯১৭), শোল্ডার আর্মস (১৯১৮), দ্য কিড (১৯২১), দ্য সার্কাস (১৯২৬), সিটি লাইটস (১৯৩১), মডার্ন টাইমস (১৯৩৬), দ্য গ্রেট ডিক্টেটর (১৯৪০), দ্য গোল্ড রাশ (১৯৪২), লাইম লাইট (১৯৫২), এ কিং অব নিউইয়ক (১৯৫৭) প্রভৃতি।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

ছবিঃ গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com