চেস্টার বেনিংটন: রকস্টারের বিদায়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

“When my time comes
Forget the wrong that I’ve done
Help me leave behind some
Reasons to be missed”

মাদকাসক্তি, যৌন নিপীড়নের শিকার আর স্কুলে সহপাঠীদের বেদম মার খাওয়া- চেস্টার বেনিংটন এর গল্পের শুরুটা এমন বিভীষিকাময়ই ছিল। নব্বইয়ের দশকের শেষে ‘লিংকিন পার্ক’ নামের সাড়া জাগানো ব্যান্ডের গায়ক হিসেবে আত্নপ্রকাশ না করলে হয়তো এই মানুষটির বেদনাময় অতীত সম্পর্কে আমরা জানতেই পারতাম না। গত ২০ জুলাই নিজ বাড়িতে আত্নহত্যা করেছেন চেস্টার। বিশ্বজুড়ে অগণিত ভক্তের বিস্ময় যেন কাটছেই না, কেন মাত্র ৪১ বছর বয়সে জীবনের কাছে হেরে গেলেন এই শিল্পী?

১৯৭৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনাতে চেস্টার বেনিংটনের জন্ম। বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার, মা একজন নার্স। মাত্র ৭ বছর বয়সে মানুষের বিকৃত রূপটা ধরা পড়ে চেস্টারের সামনে। বয়সে বড় এক বন্ধুর দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হন তিনি। লজ্জায় কারো কাছে এই ঘটনা বলতে পারেননি চেস্টার, কয়েক বছর ধরে সবার অগোচরে চলতে থাকে এই নিপীড়ন। এক সময় চেস্টারের বাবা জেনে যান এই বীভৎস অপরাধের কথা। কিন্তু চেস্টার কোনো আইনী ব্যবস্থা নিতে চাননি। কারণ ইতোমধ্যেই তিনি জেনে ফেলেছিলেন, যে ছেলেটি তার সাথে অন্যায় আচরণ করেছিল, সে নিজেও এমনই এক অপরাধের শিকার হয়েছিল আগে।

এখানেই চেস্টারের দুর্ভাগ্যের শেষ না। ১১ বছর বয়সে বাবা-মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদে মুষড়ে পড়েন তিনি। নিপীড়নের বিবমিষা আর একাকীত্ব, দুটো যেন একেবারে জেঁকে বসে চেস্টারের জীবনে। মেটাল হ্যামার ম্যাগাজিনকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন,

“আমার আত্নবিশ্বাস একদম শূন্যের কোঠায় চলে যায়। নিপীড়নের ঘটনায় আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম, আমি এই ঘটনাটা কাউকে জানাতে চাইনি। আমার ভয় ছিল মানুষ আমাকে সমকামী ভাবতে পারে। এটা আমার জীবনের ভয়ঙ্করতম ঘটনা।“

শৈশবে মাদকের সংস্পর্শেও আসেন চেস্টার। অভিভাবক আর বন্ধুহীন জীবনে আফিম, মেথ, কোকেন আর অ্যালকোহল হয়ে ওঠে তার নিত্যদিনের সঙ্গী। ১৯৯২ সালে মাদক থেকে দূরে সরে যেতে সমর্থ হন তিনি, যদিও পরবর্তী জীবনে এই প্রাণঘাতী নেশা আবার কাবু করে ফেলে তাকে।

অ্যারিজোনা থেকে একসময়ে লস এঞ্জেলেসে চলে আসেন চেস্টার। এখানেই তিনি একটি ব্যান্ডের জন্য অডিশন দেন, পরবর্তীতে যেই ব্যান্ডের নাম হয় ‘লিংকিন পার্ক’। ব্যান্ডের লাইন আপ পূর্ণতা পায় চেস্টারের উপস্থিতিতে। তার অসাধারণ কন্ঠ ‘লিংকিন পার্ক’কে ঈর্ষণীয় সাফল্য এনে দেয়। প্রথম এ্যালবাম ‘হাইব্রিড থিওরি’ দিয়ে বাজিমাত করে ন্যু-মেটাল ঘরানার ব্যান্ডটি। ‘ক্রলিং’, ‘ওয়ান স্টেপ ক্লোজার’, ‘ইন দি এন্ড’ আর ‘পেপারকাট’ এর মতো তুমুল জনপ্রিয় গানগুলো এই এ্যালবামের ফসল। দুই বছর পর দ্বিতীয় এ্যালবাম ‘মেটেওরা’ প্রকাশ পায়। লিংকিন পার্ক যে একটা-দুটো হিট গানের ব্যান্ড নয়, নতুন এ্যালবাম দিয়ে তারা সেটা বেশ ভালোভাবেই প্রমাণ করে দেয়। ‘মেটেওরা’ শ্রোতারা লুফে নেয়, লিংকিন পার্ক বিশ্ব সঙ্গীতে তাদের অবস্থানটা পোক্ত করে নেয়।

‘লিংকিন পার্ক’ যখন সাফল্যের শিখরে, তখন আবার মাদকের কাছে ফিরে যান চেস্টার। ব্যান্ডের সদস্য মাইক শিনোডা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, “আমরা যখন কনসার্ট ট্যুরে নানা যায়গায় যাচ্ছিলাম, ব্যান্ডের সবাই হয় মদ্যপ ছিল, নতুবা মাদকাসক্ত।” ২০০৬ সালে আবার মাদক ত্যাগ করেন চেস্টার। স্পিন ম্যাগাজিনকে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, “মাদক নেয়াটা কোনো বাহাদুরির বিষয় নয়, মাদক ত্যাগ করতে পেরেছি সেটাই বাহাদুরি।”

২৩ বছর বয়সে চেস্টার যখন বিয়ে করেন, তখনও লিংকিন পার্কের জন্ম হয়নি। ১৯৯৬ সালে সামান্থা অলিট নামের এক তরুণীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাদের ঘরে আসে একটি পুত্র সন্তান। ২০০৫ সালে এই জুটির বিচ্ছেদ হয়ে যায়। পরের বছরই চেস্টার বিয়ে করেন তালিন্দা অ্যান বেন্টলিকে, এই স্ত্রীর সাথে চেস্টারের তিনটি সন্তান রয়েছে। চেস্টারের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা একসাথেই সংসার করছিলেন।

২০০৫ সালে চেস্টার লিংকিন পার্কের পাশাপাশি নিজের একটি আলাদা ব্যান্ডে কাজ শুরু করেন। ‘ডেড বাই সানরাইজ’ নামের সেই ব্যান্ডের একটি মাত্র এ্যালবাম মুক্তি পেয়েছে।

যেই বাংলাদেশে লিংকিন পার্ক তথা চেষ্টার বেনিংটনের অসংখ্য ভক্ত রয়েছে, সেই বাংলাদেশের কোনো মানুষ যদি স্বপ্নের ব্যান্ডের সাথে কাজ করার সুযোগ পায়, কেমন হবে বিষয়টা? ২০১৫ সালে স্টেজলাইট কনটেস্ট জিতে লিংকিন পার্কের স্টুডিওতে কর্মশালার সুযোগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশের তরুণ শব্দ প্রকৌশলী জায়েদ হাসান। চেস্টারের সঙ্গে বেশ হৃদ্যতা তৈরি হয় তার।

দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় জায়েদ এভাবে স্মৃতিচারণ করেছেন চেস্টার কে নিয়ে-

“লিংকিন পার্কের স্টুডিওতে মাইক শিনোডা ও রব বোর্ডনের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম। চেস্টার বেনিংটন তখনো পৌঁছাননি। বাড়ি থেকে বেরিয়েই নাকি জুতা কিনতে গেছেন। নতুন জুতা পরে স্টুডিওতে আসবেন। ভাবলাম, হয়তো আসবেনই না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি হাজির হয়ে হইচই জুড়ে দিলেন, নতুন জুতার আনন্দ! মাইক পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পরও আমি চুপ করে ছিলাম। চেস্টার আমার পেটে একটা খোঁচা দিয়ে বললেন, স্যরি ম্যান, জুতাটা দরকার ছিল।“

মাত্র দু’মাস আগে আরেক রক এন্ড রোল মহারথী ‘ক্রিস কর্নেল’ আত্নহত্যা করেন। ‘সাউন্ডগার্ডেন’ এবং ‘অডিওস্লেভ’ ব্যান্ড এর গায়ক ক্রিস কর্নেল ছিলেন চেস্টারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। চেস্টারের ক্যারিয়ারে বিশাল অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন সুহৃদ ক্রিস কর্নেল। বারংবার শ্রদ্ধার সাথে ক্রিস এর নাম উচ্চারণ করেছেন চেস্টার। পাঠকরা জেনে বিস্মিত হবেন, ক্রিস কর্নেলের ৫৩ তম জন্মদিনেই নিজের জীবনের ইতি টেনেছেন চেস্টার। সংবাদ সংস্থা সিএনএন তাদের খবরের শিরোনামে লেখে, “Chester Bennington dies on his good friend Chris Cornell’s birthday”। ক্রিস আর চেস্টার- দুজনের আত্নহত্যার ধরনের মধ্যেও মিল রয়েছে। দুজনেই হতাশা এবং মাদকাসক্তির ফলশ্রুতিতে আত্নাহুতি দেন।

কৃশকায় শরীরের চেস্টার স্কুলে নিয়মিত সহপাঠীদের হাতে মার খেতেন। হতাশার কাছে পরাজিত হয়ে গানের কাছে আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করেন তিনি। শিল্পের মাধ্যমে নিজের বিষণ্ণতা দূর করতে চেয়েছিলেন চেস্টার। স্টেডিয়ামে হাজার হাজার দর্শকের সামনে মঞ্চ কাঁপানো রকস্টারের ভেতরে যে এত অভিমান ছিল, তা কয়জন জানতো? বর্ণময় সঙ্গীত জীবনে গ্র্যামি এ্যাওয়ার্ড সহ পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। তবে শ্রোতার ভালোবাসাই বোধহয় চেস্টারের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। শতাব্দীর প্রথম দশকে একটি প্রজন্ম বড়ই হয়েছে লিংকিন পার্কের গান শুনে।

চেস্টার বেনিংটনের মৃত্যুতে নিঃসন্দেহে বিশ্বসঙ্গীত জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অন্যান্য শিল্পীরা আর্দ্র কণ্ঠে স্মরণ করেছেন তাদের প্রিয় মানুষ চেস্টারকে। বাংলাদেশের ভক্তরাও বেদনাবিধুর মনে বিদায় জানালেন প্রজন্মের জনপ্রিয় এই গায়ককে। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক শিল্পীর আত্নাহুতি একটি জিনিস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো সবাইকে, হতাশা এমন এক অসুখ, যার উপস্থিতি টের পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব। লাখো ভক্তের ভালোবাসা, সাফল্য আর টাকা- কোনোটাই তাদের মানসিক শান্তি দিতে পারেনি।

শিল্প যদি মানসম্মত হয়, সময় তার অস্তিত্বে চিড় ধরাতে পারে না। চেস্টার তার ভক্তদের জন্য যেসব গান রেখে গেলেন, সেগুলো তারা অন্তরে ধারণ করবেন চিরকাল।

বিদায় রকস্টার!

বিনোদন ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com