চিঠি দিও প্রতি দিন চিঠি দিও

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

শিবব্রত দেচৌধুরী

(নিউ ইয়র্ক থেকে): মুঠোফোন আর আন্তর্জালের এই যুগে অনেক কিছুই আজ অনেক সহজ লভ্য হয়ে গেছে । আজ মুহূর্তেই আমরা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে আপনজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি, আপন জনের ছবি দেখতে পারি , কথা বলতে পারি, গান শুনতে পারি। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই যে হারিয়ে ফেলেছি আমরা! অনেক অপেক্ষার প্রহর গুনে গুনে শেষ পর্য্ন্ত কাঙ্ক্ষিত কিছু পাওয়ার মাঝে যে আবেগ ছিল, ভালোলাগা ছিল সেই ভালোলাগা আজ আর নেই , সেই আবেগটাও যেন উধাও হয়ে গেছে! যন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও কেমন যেন যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছি দিন দিন! এই তো , এই কিছুদিন আগেও যোগাযোগ ব্যবস্থা যখন এতটা সহজ ছিলনা তখন প্রিয়জনের একটা চিঠির অপেক্ষায় পথের পানে চেয়ে বসে থাকতে হত দিনের পর দিন । ডাকপিয়ন এসে চিঠি বিলি করে গেলে ঐ চিঠি গুলি খুঁজে কাঙ্ক্ষিত চিঠি না পেলে সে দিনটাই যেনো বৃথা হয়ে যেত! শুরু হত আগামি কালের অপেক্ষায় প্রহর গোনা, ক্রিং ক্রিং শব্দ করে বাইসাইকেলে চড়ে ডাকপিয়ন আবার কখন আসে , সেই অপেক্ষায়। অবশেষে অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটিয়ে প্রিয়জনের চিঠি ঠিকই আসত একদিন !সেই কাঙ্ক্ষিত চিঠিটা পাওয়ার মাঝেও ছিল অনেক আনন্দ আর এক ধরণের চাপা উত্তেজনা! সে চিঠি টা হয়তো সন্তানের কাছে পিতা মাতার চিঠি , ভাইয়ের কাছে বোনের চিঠি কিংবা প্রেমিকের কাছে প্রেমিকার চিঠি। সকল ভালোবাসা আর আবেগ উজাড় করে হাতে লিখা এ চিঠি গুলির প্রতিটি অক্ষর যেন কথা বলতো প্রাপকের সঙ্গে ! চিঠির পাতায় ভেসে উঠতো প্রিয়জনের হাসিমাখা কিংবা অভিমানী মুখ। ‘আজ বিকেলের ডাকে তোমার চিঠি পেলাম’ কিংবা ‘ চিঠি দিও প্রতিদিন চিঠি দিও, নইলে থাকতে পারবনা’, প্রিয়জনের একটা চিঠির আশায় এমনি কতশত গান লিখা হয়েছে । কত চিঠিই আজ ইতিহাস হয়ে আছে , যেখানে চিঠির প্রাপক আজো খুঁজে পায় তার প্রিয়জনের গন্ধ মাখা সেদিনের সেই ক্ষন কে। এক ঝড়ের রাতে গভীর সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার আগে এক নাবিক তার প্রিয়তমার কাছে লিখা শেষ চিঠিটা কাচের বোতলে পুরে ভাসিয়ে ছিল সাগরের নোনা জলে , সে চিঠিটা তার প্রিয়তমার কাছে কখনো পৌঁছায় নি ,স্থান করে নিয়েছে যাদুঘরে । আবেগ মাখা সেই চিঠি পড়ে পাঠকদের মন আজো ও ভারি হয়ে উঠে! সেদিন পুরনো ফাইলে ঘাটতে গিয়ে খুঁজে পেলাম আমার মায়ের লিখা একটা চিঠি ! সাদা কাগজে লিখা চিঠিটার রং দিনে দিনে কেমন যেন হলদে হয়ে গেছে , কিন্তু কালো কালিতে মায়ের হাতের লিখা এখনো কী স্পষ্ট, কত জীবন্ত! সমস্ত চিঠি জুড়েই আমার জন্য শুধু উৎকন্ঠা, স্নেহ আর শুভকামনা! চিঠিটা বারবার পড়লাম ,মনে হল মা যেন আমার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন ! এখনো চিঠি আসে তবে সেই চিঠি গুলিতে শুধু পাওনাদারের বিলের অংক আর বিল পরিশোধের সময় সীমা লিখা থাকে । নববর্ষ বা জন্মদিনেও শুভেচ্ছা বার্তা নিয়ে চিঠি আসে এখনো! তবে সেই চিঠি গুলি আসে ব্যাংক, বীমা ,ড্যান্টিস্ট আর ব্রোকারদের বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে । ভালো বাসা আর আবেগে ভরা স্বার্থহীন চিঠি আজ আর আসেনা! কেউ আর লেখেনা এখন! লিখে কী ?!

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com