চারুবাবু, আমার নাম রুণু গুহ নিয়োগী। আপনাকে আমরা গ্রেফতার করতে এসেছি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

চারু মজুমদার। ভারতের রাজনীতির আকাশে আজো এক ঝড়ের নাম। ১৯৬৭ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি গ্রাম থেকে কৃষকের জমির অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে যে বিপ্লবের আগুন জ্বলে ওঠে সে আগুনকে দাবানলে পরিণত করেন চারু মজুমদার। ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ সালের মধ্যে চারু মজুমদার তার লেখায় তুলে ধরেন, মাও সেতুং নির্দেশিত সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের রণনীতি ও কৌশল। তিনি বলেন, তথাকথিত শান্তিপূর্ণভাবে নয়, সশস্ত্র শ্রেণি সংগ্রামের পথেই একমাত্র বিপ্লব সম্ভব। মাও নির্দেশিত গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার রণনীতিই হলো ভারতের প্রকৃত বিপ্লবী নীতি। কৃষক জনগণকে বাদ দিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের লাইন নেওয়ার অর্থ পাতি বুর্জোয়া বিচ্যুতি বই কিছু নয়। চারু মজুমদারের এই নতুন বৈপ্লবিক আহ্বান ভারতের রাজনীতিতে ঝড়ের হাওয়া বইয়ে দিয়েছিল।সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের স্বপ্নে বিভোর হয় মানুষ। বিপ্লবীরা সিদ্ধান্ত নেয়, জমির মালিকানা জোতদারের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে সেখানে খোদ কৃষককে পুনর্বাসন করা। পুলিশ মালিকের পক্ষ নিলে তাদের ওপরও আক্রমণ করা। এই আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি অংশ নেয় উপজাতি সম্প্রদায়। যারা বছরের পর বছর শুধু নিগৃহিতই হয়েছে। এছাড়া কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাও সমাজ বদলের রোমন্টিসিজমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বই-খাতা ফেলে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। ওইসময় প্রচলিত নিয়ম রীতিকে ভেঙে নতুন সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন যুবসমাজকে আন্দোলিত করেছিল। ছাত্র ও কৃষকদের সমন্বয়ে গঠিত বিপ্লবীরা জোতদার, মহাজনসহ ধনিক শ্রেণির মূর্তিমান আতঙ্কে পণিত হয়। পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে সরকার যে কোনো উপায়ে নকশাল আন্দোলন দমনের কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পুলিশের দমন পীড়নে সেই সময়ে বহু বিপ্লবীর মৃত্যু হয়।

ভারতের এই প্রখ্যাত নকশালপন্থী ও মাওবাদী রাজনীতিবিদ চারু মজুমদারের ৪৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল গত ২৮ জুলাই।১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই কলকাতার এন্টালী রোডের এক বাড়িতে আত্নগোপন করে থাকা এই নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। একই বছরের ২৮ জুলাই হৃদরোগে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ভারত সরকার কর্তৃক একটি ঘোষণা প্রচার করা হয়।তাঁর রাজনৈতিক দল সিপিআই(এমএল) দাবি করে পুলিশের কাস্টডিতে নির্যাতন চালিয়ে এই কমিউনিস্ট নেতাকে হত্যা করা হয়।

রাজশাহী জেলার হাগুরিয়া গ্রামে জমিদার পরিবারে জন্ম নেন চারু মজুমদার, তার পৈত্রিক নিবাস শিলিগুড়িতে। তার বাবার নাম বীরেশ্বর মজুমদার।

চারু মজুমদারকে ১৬ জুলাই গ্রেফতার করেন কলকাতা পুলিশের অফিসার রুণু গুহ নিয়োগী। বেশ কয়েক বছর আগে তিনি ‘সাদা আমি কালো আমি’ নামে কয়েক খন্ডে নিজের পুলিশ পেশার অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লেখেন। সেই বইতে চারু মজুমদারকে গ্রেফতার করার বিবরণ প্রাণের বাংলার পাঠকদের জন্য তুলে দেয়া হলো।

‘‘আমাদের প্রচন্ড চাপের মুখে রাত তিনটে নাগাদ বলতে বাধ্য হলো যে, সে জানে কোথায় আছেন চারু বাবু(চারু মজুমদার)। তাঁর নামটা এই এতো বছর পরেও গোপন রাখছি, যদিও ছাড়া পাবার পর নকশালরা তাকে খুন করেছিলো।

সেই নকশাল নেতাকে নিয়ে তার কথা মতো চললাম মৌলালির মোড়ের দিকে। মৌলালির মোড়ে আমরা আমাদের গাড়িগুলো দাঁড় করালাম। ঠিক করলাম, ওই নেতাকে নিয়ে আগে বাড়িটা দেখে এসে তারপর হানা দেবো। ছদ্মবেশে যাবো, যেন কাকপক্ষীও টের না পায় আমরা কে এবং কি উদ্দেশ্যে আমাদের আসা। দেখলাম মৌলালির মোড়ে একটা টানা রিকশা। চালক তার রিকশার মধ্যে গৃটিসুটি মেরে ঘুমচ্ছে। তাকে গিয়ে তুললাম। কিছু বোঝার আগেই গ্রেফতারের কায়দায় নিয়ে গিয়ে বসালাম আমাদের একটা গাড়িতে, যাতে আমাদের আগে সে কোনদিকে যেতে না পারে। তারপর তার রিকশাটা নিলাম। সিটের তলায় ওর একটা লুঙ্গি ছিল। আমি প্যান্ট-শার্ট ছেড়ে সেটা পরে নিলাম। কাঁধে ফেলে দিলাম তার গামছা। তারপর সেই নকশাল নেতাকে বোরখা পরিয়ে রিকশায় বসালাম। আমাদের একজন তাকে ধরে বসে রইল।

আমি রিকশা টানছি। রাত তিনটে। চারদিক নিস্তব্ধ, নিঝুম। রিকশা টানার অভিজ্ঞতা তো নেই, মন দ্রুত চললেও রিকশাকে অত দ্রুত টানতে পারছি না। এভাবেই চলতে চলতে নকশাল নেতাটি আমাকে মিডল রোডের একেবারে শেষ প্রান্তে নিয়ে এসে একটা তিনতলা বাড়ি দেখিয়ে দিল, কোনদিকে কোন ফ্ল্যাটটায় বিখ্যাত নেতা চারু মজুমদার আত্নগোপন করে আছেন তা জানিয়ে দিল। আমি আবার রিকশা ঘুরিয়ে মৌলালির মোড়ে এসে পৌঁছলাম। নকশাল নেতাকে একটা গাড়িতে ড্রাইভার ও্র আর্মড সেপাই-এর জিম্মায় দিয়ে রওনা হলাম মিডল রোডের দিকে।

মিডল রোডের কাছাকাছি এসে আমরা গাড়ি রেখে পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম সেই বাড়িটার কাছে। ১৭০ এ, মিডল রোড, তিনতলা বাড়ির একতলায় পেছনের দিকের ফ্ল্যাটে চারুবাবু আছেন। আমরা অফিসার ও সেপাই মিলে চৌদ্দজন। প্রথমেই বাড়িটাকে ঘিরে ফেলা হলো। ঠিক করলাম, আমি একাই বাড়ির ভেতরে ঢুকব। শচী এমনভাবে পাঁচিলের ওপর দাঁড়ালো, যাতে আমি ঢুকলে সে দেখতে পায় ভেতরে কি করছি।

আমি সদর দরজায় গিয়ে কড়া নাড়লাম। রাত তখন তিনটে তিরিশ। ক্যালেন্ডারের ডেট অনেকক্ষণ আগে পাল্টে গেছে, অভিযান শুরু করেছিলাম পনেরই জুলাই আর আজ ষোলই জুলাই। অনেকক্ষণ কড়া নাড়ার পর একজন লোক এসে দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলো, ‘‘কাকে চাই?’’। আমি তার প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়েই তাকে ঠেলে ভেতরে ঢুকে সোজা সেই ঘরের দিকে হাঁটতে লাগলাম, সেই নকশাল নেতার বিবরণ অনুযায়ী যেখানে চারুবাবুর থাকার কথা। সে ঘরটার দরজা খোলা, একজন বৃদ্ধ দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছেন। আমি সেই লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘উনি কে?’’ লোকটি আমায় বললো, ‘‘আমার দাদু’’।আমি সরাসরি ওই ঘরে ঢুকে পড়লাম। তারপর সেই জীর্ণশীর্ণ বৃদ্ধের গায়ে হাত দিয়ে ডাকলাম, ‘‘দাদা, দাদু’’।দাদু প্রায় সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলেন। পাশে বসে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘আচ্ছা, এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা সত্য, তবু শেষ সত্য নয়-, এই কথাটা কবি কেন বলেছিলেন?’’দাদু কোন কথাই বললেন না।

আমি নীরবতা ভেঙ্গে একটা চুরুট এগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘‘এটা ধরান।’’ উনি এবার বললেন, ‘‘টানব?’’ আমি বললাম, ‘‘হ্যাঁ’’। দেশলাই দিয়ে ওঁকে চুরুটটা ধরাতে সাহায্য করলাম। চুরুট ধরাবার সাথে সাথেই আমি বাইরে শচীকে ইশারা করলাম ভেতরে আসার জন্য। বাড়ির মালিকের বাসায় ফোন ছিল। প্রথমেই লালবাজার হেড কোয়াটার্সে ফোন করে ফোর্স পাঠাতে বললাম। তারপর আমাদের ডি সি ডি ডি দেবী রায়কে ফোন। উনি ফোন ধরতেই আমি বললাম, ‘‘গুড মর্নিং স্যার আমি রণু বলছি, একটা ভালো খবর আছে।চারু মজুমদারকে ধরেছি।’’

দেবী রায় আমার কথা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। আমি বললাম, ‘‘হ্যাঁ স্যার, আমি ওকে দেখেই চিনেছি। আমি ওকে চুরুট দিয়েছি, উনি সেটা ধরিয়েছেন। আমি জানতাম চারুবাবু চুরুট টানতে ভালোবাসেন।’’

ধরা পড়ার পর চারু বাবু প্রথম কথাই বলেছিলেন, ‘‘আমাকে ইনজেকশন দাও।’’ দেখলাম পেথিড্রিন ইনজেতশন সমেত প্রচুর অষুধ চারু বাবুর খাটের পাশেই রয়েছে।চারুবাবুর বালিশের তলা থেকে পাওয়া গেল চৌদ্দ হাজার ছ‘শ টাকা ও অনেক চিঠিপত্র, তার মধ্যে বিদেশ থেকে আসা অনেক চিঠিও ছিল। আমি চারুবাবুকে বললাম, ‘‘ চারুবাবু, আমার নাম রুণু গুহ নিয়োগী। আপনাকে আমরা গ্রেফতার করতে এসেছি।’’

অদ্বিত আহমেদ

তথ্যসূত্রঃ সাদা আমি কালো আমি, রণু গুহ নিয়োগী

ছবিঃ গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com