চারপাশে সবাইকে নিয়ে রিনু থাকতে চায়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস,সঞ্চালক ও বাচিক শিল্পী

খুব ফিকে হয়ে আসা কিছু স্মৃতি মাঝেমাঝে ফিরে আসে। চৈত্রমাসে ‘বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগি, মহাদেব’ বলে সাহায্য চাইতে আসতো কিছু মানুষ। রিনু বড্ড ভয় পেতো তাদের। ঠিক তাদের নয়, তাদের বলা ওই কথাগুলোর সুরটায়, শেষে ‘মহাদেব’ বলার একটা ঢঙে ছিল, বিশেষ একটা সুর। ওই সুরটা কেন যেন ভয় ধরাতো, ছোট্ট রিনুর মনে…।
অনেক ফেরিওয়ালা তখন শহর কলকাতার অলিগলিতে আনাগোনা করতো দুপুর বিকেলে। তাদের সকলের নিজের সুর ছিল। সকলের নিজের সময় ছিল। ‘শিল কাটাও’ যেমন মাঝদুপুরের পরে বিশেষ আসতোনা। আবার গান গেয়ে ভিক্ষে করতে আসতো যারা, তারা সকাল সকালই আসতো, বেলা গড়ালে তাদের দেখা মিলতোনা। শীতকালে ধুনুরী আসতো। নতুন লেপ তোষক বানানো হতো এবাড়ি, ওবাড়িতে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এদের কারুর কোন ডাক, কখনও রিনুর মনে ভয় আনতো না, সেই ‘মহাদেব’ বলার সুরটুকু ছাড়া…।
বাবা থাকতেন শহরের বাইরে, নিজের কর্মস্থলে। সপ্তাহান্তে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ। মা রোজ সকালে বেরিয়ে, অফিস সেরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। সন্ধ্যে গড়িয়ে যাওয়ার পর;রিনুর বড় হওয়ার বেশিটা সময়টাতেই মায়ের ছিল শিফটিং ডিউটি! একেকদিন একেক সময়ে অফিস। মা চেষ্টা করতেন এগারোটা চল্লিশ বা বারোটা চল্লিশের ডিউটি করতে। বাড়ি ফিরতে বেজে যেত সাড়ে আটটা-নটা। যেদিন যখন ফেরার কথা, ঘড়ির কাঁটা সেখানে পৌঁছনোমাত্র রিনুর একটা চিনচিনে ভয় করতো। যতক্ষণ না মা ডোরবেল বাজাচ্ছেন, ততক্ষণ সেটা কিছুতেই যেত না। বাবাই শনিবার বাড়ি আসতেন আটটা-সাড়ে আটটার মধ্যেই। কোন সপ্তাহে এর অন্যথা হলেই সেই নাছোড়বান্দা ভয় রিনুকে জাপটে ধরতো। বাবাই একসময় ‘থিয়োসল’ বলে একটা ওষুধ লাগাতেন। জল জল মতো। কাচের বোতলে ভরা। বাবাইয়ের গায়ে সম্ভবত সাদা সাদা ‘লিভার স্পট’ দেখা দিয়েছিল, তারই ওষুধ। কিভাবে যেন সেই বোতলটা রিনুর হাতে লেগে (নাকি হাত থেকে ) পড়ে ভেঙে গেল। মা এটা জানলে বকবে, এই ভয়টা যে কতদিন রিনুর সঙ্গী ছিল! ভাই সেটা বুঝে সুযোগমতো ভয়ও দেখাতো, ‘মাকে বলে দেবো, তুই ওটা ভেঙে ফেলেছিস’। এখন এনিয়ে দু’ভাইবোনে হাসে! এপ্রসঙ্গে ছোট একটা তথ্য, রিনুর হাত থেকে অনর্গল জিনিষ পড়ে এবং ভাঙে। দিব্যি শক্ত করে ধরা, তবুও যেন কি করে সেটা প’ড়ে যায়। বলাই বাহুল্য তারপর টুকরো টুকরো হতে দেরি লাগেনা। শুধু কি জিনিষ? কতকিছুই তো ধরে থাকা সত্ত্বেও এভাবে ভেঙে গেল, অনিচ্ছাকৃতভাবেই…।

তখন রিনু আর তার ভাই খুবই ছোট। মাকে নাইট ডিউটিও করতে হয়! বাবাই বাইরে। বাড়িতে কি করে ওই দুই ছোট ছেলেমেয়েকে রেখে যাবে মা? সন্ধ্যের মধ্যে ছেলেমেয়ে নিয়ে মা পৌঁছে যেত-কালীঘাট পার্কে তার বাপের বাড়ি, হ্যাঁ, তখন কতদিন মায়ের নাইট ডিউটি থাকলেই মামাবাড়িতে থাকতে যেত রিনু শুভ। শুভ তখন সদ্য স্কুলে ভর্তি হয়েছে। তার মর্নিং স্কুল। ঘুম থেকে উঠে মামাবাড়িতেই রেডি হওয়া। মা এসে ছেলেমেয়ের হাত ধরে বেরিয়ে পড়ে। বড় রাস্তা দিয়েই ভাইয়ের স্কুলবাস যায়, তাকে বাসে তুলে দিয়ে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফেরে মা। ফিরে থেকে দৌড় শুরু। রিনুর স্কুল বাস আসার সময় হয়ে যায়। তাকে তৈরি করে দিতে হয়। মামাবাড়িতে ভাইয়ের সঙ্গে ঘুমোতে ঘুমোতে একটা ভয় তৈরি হতো রিনুর ভেতরে। মায়ের যদি পরদিন সকালে ফিরতে দেরি হয়? ভাইয়ের স্কুল যাওয়া কি করে হবে!!! অবান্তর ভয়। এখন রিনু জানে সারারাত জেগে অফিসের কাজের পর, মা অপেক্ষা করতো ভোরের আলো ফোটার। আলো ফুটলেই বাস চলা শুরু হবে, ডালহৌসি থেকে কালীঘাট পৌঁছতে পারবে রিনুর মা। তখন বোধহয় ক্লাস সিক্স, সেভেনে পড়ে রিনু। সবে মাত্র মৃত্যুভয় তৈরি হচ্ছে মনের মধ্যে। পাকা বুদ্ধি হয়নি তখনও। তবু রিনু এটা বোঝে এই ভয়ের খবর মা বাবাই অবধি পৌঁছনো যাবেনা। অযথা আতঙ্কিত হবে তারা। হঠাৎ হঠাৎ একা একাই ভয়ে কেঁপে উঠতে থাকে রিনু! কি হবে, যখন থাকবো না?! কি হবে যদি এখনই আর না থাকি? মা ,বাবা,ভাই,ঠাকুমা, আর সকলে,নিজের ঘর, বই, আর দেখতে পাবো না?? অঝোর ধারা নামে, বেশ কিছুক্ষণ ফুঁপিয়ে কান্নার পর শান্ত হয় রিনু। ভয়টা যায়না। বোধহয় ক্লান্ত লাগে ভয় পেতে! এখনও মাঝেমধ্যেই এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে…। স্কুলবাসে তখন পারমিতার সঙ্গে রোজ গপ্পো জমে। সবে সবে পুনর্জন্ম, জাতিস্মর ইত্যাদির কথা জানতে পেরেছে তারা। মৃত্যুভয়ের মধ্যে এ-কি একটু আশার আলো?! ফুরিয়েও না ফুরোনোর খেলা? পারমিতাকে রিনু জিগ্যেস করেছিল ‘বিশ্বাস করিস?’ পারমিতার উত্তর ছিল-‘যদি আবার জন্মাইও, গ্যারান্টি কি যে আমি আদৌ জাতিস্মর হবই!!! যদি না হই, যদি মনেই না থাকে আগের কোন কথা, তাহলে কি সেটাকে পুনর্জন্ম বলা যাবে?!’ তাই তো!! বড় দরকারি কথা। তারপর থেকে আজ, আর কখনই পরের জন্মের কথা নিয়ে রিনু মাথা ঘামায়নি। তবে ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়ও ফুরোয়নি। রিনুর ছেলে তখন কয়েকদিনের। সবে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে রিনু। সারাটাদিন ছানার সঙ্গে সঙ্গে কাটছে, হঠাৎ-ই তীব্র আকার নিলো তার মৃত্যুভয়। রোজই রিনু দেখে তার সদ্যোজাত ছানা একটু বড় হল; আর তার দুচোখ উপচে আসে! এগিয়ে আসছে তার চলে যাবার দিন। সন্তান বড় হওয়া মানেই যেন মায়ের এগিয়ে যাওয়া মৃত্যুর দিকে, খুব অবাক হয় রিনু। বিরক্ত হয় নিজের উপর। এসব কি ভাবছে সে! সে তো ভীষণভাবে ‘মা’ হতে চেয়েছে। মা হয়ে সে অসম্ভব খুশিও। তাহলে কেন অমন বিচ্ছিরি ভয় তাকে জাপটে ধরছে? কেন বারবার কান্না আসছে, কেন দমবন্ধ হয়ে আসছে কথায় কথায়। যথারীতি মা বাবাইকে এসব কিচ্ছু জানায়নি রিনু। সে আর তার বর আলোচনা করে ডাক্তারের কাছে যাওয়া স্থির করলো শেষমেশ। কার কাছে যাবে জানতে রিনু ফোন করলো ইলোরাদিকে। দিদি জোর ধমক দিলেন, বললেন ‘কিচ্ছু হয়নি তোর। এমন ডিপ্রেশন নতুন মায়েদের হতেই পারে, কাজে ফের শিগগিরি’…। সত্যিই তাই, সেভাবে কাজে না ফিরলেও অল্প ব্যস্ততায় সেই অবান্তর ভয় ছু মন্তর হতে তেমন সময় লাগলোনা। ভাগ্যিস! ঘুমের মধ্যে হঠাৎ উঠে বসে রিনু। হাত দেয় পাবলোর গায়ে, কি যেন খোঁজে। তারপর আবার শুয়ে পড়ে। রিনুর বর বলে কখনও কখনও ‘পাবলো, পাবলো’ বলতে বলতে রিনু উঠে বসে। কখনও ‘পাবলো খেলো না?’, কখনও ‘পাবলো কই?’ , কখনও আবার ঘুমের মধ্যেই রিনু ফুঁপিয়ে কাঁদে ! কিসের ভয়ে রিনু এমন করে? নাহ্, রিনু তা জানেনা। শুধু রিনু জানে তাকে একটা ভয় তাড়া করে বেড়ায়, একা হয়ে যাওয়ার ভয়…। কেন যেন তার মনে হয় চারপাশে কেউ কোথ্থাও নেই, সে একা। যতদূর চোখ যায়, সমস্ত চরাচরেই আর কেউ নেই…। এক্কেবারে একা সে… তেমন হলে কি করবে রিনু? আঙুল থেমে গেল, আসলে শব্দই তো নেই। রিনু তো সত্যিই জানেনা তেমন হলে কি করবে সে! একা হতে রিনুর বড় ভয়… চারপাশে সবাইকে নিয়ে রিনু থাকতে চায়… হাত বাড়িয়ে পাশের মানুষটাকে ছুঁতে চায়.. মা বাবার নির্ভরতায় আঁকড়ে থাকতে চায় সন্তানকে… একা হতে চায়না… কখনও, কোনওদিন….।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com