ঘড়ি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
কাজী জহিরুল ইসলাম

কাজী জহিরুল ইসলাম

শনিবার সারাদিন তুষারপাত হয়েছে। কখনো দুলতে দুলতে তুলোর মতো, আবার কখনো বৃষ্টির মতো তুষারের কণা নেমে এসেছে মাটিতে। রোববারে তুষারপাত না হলেও তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের অনেক নিচে। আজ সোমবার, কাজের দিন। মোটেও বেরুতে ইচ্ছে করছে না।
ভাষা সৈনিক এডভোকেট আব্দুস সামাদের পুত্র আলোকচিত্রী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওবায়েদুল্লাহ মামুনের সাথে রাতে কথা হয়েছে, আজ তার অফিসে যাবো, আড্ডা দেব, কফি খাব। ওর অফিস ম্যানহাটনে, আমারও। মধ্যাহ্নবিরতির সময় যাবো বলে ঠিক করে রেখেছি। অফিসেই যদি না যাই তাহলে ওখানে যাব কি করে? বৈরী প্রকৃতিকে তুড়ি মেরে বেরিয়ে পড়লাম।
কাজে তেমন মন বসছে না। “শেকড়ের খোঁজ” গ্রন্থের একটি অধ্যায় আছে “একুশে ফেব্রুয়ারী”। ওটা লিখতে গিয়ে প্রচুর তথ্যের গড়মিল পেয়েছি। ওবায়েদুল্লাহ মামুন এই বিষয়ে প্রচুর কাজ করেছেন, তার কাছে ভালো কিছু বইও আছে। বইগুলো জোগাড় করা দরকার। সাড়ে এগারটায় বেরিয়ে পড়ি। দুই স্তরের কাচের দরোজা পেড়িয়েই টের পাই শৈত্যপ্রবাহ বর্শার ফলায় আমাকে গেঁথে ফেলেছে। আমিও শীতের চেয়ে কম বেয়াড়া নই। ট্রেন কিংবা বাসে নয়, তিন কিলোমিটার পথ হেঁটেই যাবো। জয় করতে হবে বৈরী প্রকৃতিকে। অথবা অন্যভাবে বলা যায়, প্রকৃতি যখন যেখানে যেমন তার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে, হয়ে উঠতে হবে প্রকৃতির প্রকৃত সন্তান।

তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে ৬ ডিগ্রী। পায়ের নিচে ক্রিস্পি শীত। হাঁটছি ম্যানহাটনের রাস্তায়। চল্লিশ মিনিট হেঁটে পৌঁছে গেলাম ডাউনটাউনে, দুগালে। দুগাল ফটোফ্রেম তৈরীর বিশ্বসেরা দোকান বা গ্যালারী । এখানেই কাজ করেন ওবায়েদুল্লাহ মামুন। আমরা বসলাম স্টারবাক্সে। তিনি তার সম্পাদিত গ্রন্থ “রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬” আমাকে দিলেন। আমরা অনেকক্ষণ আড্ডা দিলাম। কত কথা আমাদের। কথা হয় ভাষা আন্দোলন নিয়ে, কথা হয় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। আমরা আমাদের শেকড়ের খোঁজে কিছুক্ষণ ইতিহাসের অরণ্যে হাঁটি। মামুনের নিজের পরিবারেরই এমন কিছু গল্প রয়েছে যা বাঙা

ওবায়েদুল্লাহ মামুন ও লেখক

ওবায়েদুল্লাহ মামুন ও লেখক

লীদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস। তেমনি একটি গল্প বলার লোভ সামলাতে পারছি না বলেই এই লেখাটি লিখতে বসা।মামুনের বড় ভাই মোহাম্মদ আবুল হোসেন তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারী কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র। ওদের এক প্রতিবেশী পাকিস্তান নেভির অফিসার। অনেকদিন পর তিনি দেশে ফিরবেন। ভদ্রলোকের স্ত্রী হোসেনের মাকে জিজ্ঞেস করেন, আপা উনিতো দেশে ফিরবেন, আপনাদের জন্য বিদেশ থেকে কিছু আনতে বলবো? মায়ের চোখে সন্তানের খুশি। ছেলেটা কলেজে পড়ে। একটা বিদেশী ঘড়ি পেলে খুব খুশি হবে। ঘড়ি আসে। সিকো ফাইভ ঘড়ি। হোসেন যারপরনাই খুশি। কখনো হাত থেকে সে খোলে না এই ঘড়ি। ঘড়িটি হয়ে ওঠে ওর দেহেরই অঙ্গ। মুক্তিযুদ্ধ শুcover chobi_1.1.2017রু হয়। বাবার কড়া নির্দেশ, তোমাকে মুক্তিযুদ্ধে যেতে হবে। মায়ের মন ঢুকরে কেঁদে ওঠে।
শহরে পাকিস্তানী আর্মি ঢোকে। সকলেই যার যার মতো করে গ্রামের দিকে পালাতে শুরু করে। পালাতে গিয়ে ঢালু পথে রিক্সা উল্টে যায়। বেতের ঝুড়িতে রাখা হোসেনের ঘড়িটি হারিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস মা’র দু’চোখে নদী। ছেলে ফিরে এলে আমি তার হাতে কি তুলে দেব? কিভাবে হারালাম ওর প্রিয় ঘড়িটি? ঘড়ির খালি বাক্স এবং এর ভেতরে রাখা ক্যাটালগটি খুঁজে পান তিনি। সারাক্ষণ মা খালি বাক্স হাতে নিয়ে ছেলের প্রতীক্ষা করেন আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটান।
দেশ স্বাধীন হয়। বীর বেশে ফিরে আসে মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন। মা ছেলের হাতে তুলে দেন প্রিয় ঘড়ির খালি বাক্সটি। হোসেনের বুকটা হু হু করে ওঠে। হোসেন আবার কলেজে ভর্তি হন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এজিএস পদে নির্বাচিত হন। যুদ্ধাহত কলেজটিকে গড়ে তুলতে হবে। টাকা দরকার। ছাত্র সংসদে সিদ্ধান্ত হয়, রূপসী এবং চিত্রালী সিনেমা হল থেকে টাকা সংগ্রহ করা হবে। প্রতি টিকিট থেকে পাঁচ পয়সা। রূপসী সিনেমার মালিক সুধীর বাবুর ছেলে প্রদীপ হোসেনের বন্ধু। একদিন টাকা আনতে গিয়ে টিকিট কাউন্টারে বসে আছেন হোসেন ও প্রদীপ। এক যুবক টিকিটের জন্য কাউন্টারের খোঁড়লে হাত বাড়ায়। অমনি হাতটি খপ করে ধরে ফেলেন হোসেন। কারণ সেই হাতে বাঁধা আছে হোসেনের ঘড়িটি। এটি যে তার প্রাণের ঘড়ি। এই ঘড়ি চিনতে কিছুতেই তার ভুল হবার কথা নয়। হোসেন ওর হাত ধরে রাখে। প্রদীপ উঠে বাইরে গিয়ে যুবককে ধরে। এরপর ওকে দুই বন্ধু মিলে বাড়ি নিয়ে আসে। যুবক জানায়, সেও মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোর্তাপাড়া মোড়ে এক রাজাকার পাহাড়াওয়ালাকে সে গুলি করে হত্যা করে এবং তার হাত থেকে এই ঘড়িটি খুলে নেয়। হোসেন তার ঘড়িটি ফিরে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। মায়ের চোখ থেকে দুফোটা আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ে। “এই ঘড়ি আমার পুতের জান। এই ঘড়ি গেলে আমার সোনায় বাঁচত নাগো, বাঁচত না।”
হোসেন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। জাসদ ছাত্রলীগের নেতা। ডাকসুর জিএস নমিনেশনের আয়োজন চলছে। ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল। ঘড়ির কাটা রাত বারটার সীমা অতিক্রম করে। ক্যালেন্ডার পা বাড়িয়েছে ৫ এপ্রিলে। সূর্যসেন হলের ৬৩৪ নম্বর কক্ষে ঘুমাচ্ছেন হোসেন। একদল অস্ত্রধারী ঘুম থেকে ডেকে তোলে হোসেন, কোহিনূরসহ সাতজনকে। ওরা সবাই ৬৩৪ এবং ৬৪৮ নম্বর কক্ষে ছিলেন। অস্ত্রের মুখে ওদেরকে মুহসীন হলের টিভি রুমের সামনে এনে দাঁড় করানো হয়। এরপর মেশিনগানের ব্রাশফায়ার। নিভে যায় মুক্তিযোদ্ধা হোসেনের জীবন প্রদীপ। এই ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের পরে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা “সেভেন মার্ডার” হিশেবে ইতিহাসে চিহ্নিত।
হোসেনের স্বজনরা ওর প্রিয় সেই ঘড়িটি কোথাও খুঁজে পান নি।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com