ঘাতক ব্যাধি হেপাটাইটিস-বি হলে কি করবেন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল

হেপাটাইটিস-বি পৃথিবীর অন্যতম সংক্রামক এবং ঘাতক ব্যাধি। এ রোগটি হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের দ্বারা ঘটে। এই ভাইরাসটি এমন বিপজ্জনক যে, প্রধানত তা লিভারকে আক্রমণ করে। হেপাটাইটিস-বি এমন এক রোগ যা লিভারের প্রদাহ ঘটায় এবং লিভার ক্যান্সার সৃষ্টি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে সারা বিশ্বে দুই শ’ কোটির বেশি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত এবং ৪০ কোটির বেশি মানুষ এই রোগ বহন করছে। চিন্তার বিষয় হলো যারা এ ভাইরাসে আক্রান্ত তাদের অসুস্থ নাও দেখাতে পারে, এমনকি অনেকে জানতেও পারেন না যে, তারা হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত বা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে ওইসব শিশু দীর্ঘস্থায়ী লিভারের রোগে মারা যেতে পারে। স্কুলের-ছেলেমেয়েদের ‘হেপাটাইটিস-বি’ সম্পর্কে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। স্কুলে খেলাধুলা করার সময়ে দুর্ঘটনাবশত কেটে যাওয়া, ছিঁড়ে যাওয়া কিংবা রক্তপাতের ঘটনা কম নয়। এ সময় হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি থাকে। খুব সামান্য রক্ত যেমন ০.০০০০৪ মিলি-যা খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়- তা এই রোগ ঘটানোর জন্যে যথেষ্ট। হেপাটাইটিস-বি এইডসের চেয়ে বেশি সংক্রামক। এইডসের কারণে এক বছরে যত লোকের মৃত্যু ঘটে, হেপাটাইটিস-বি এর কারণে দৈনিক তারচেয়ে বেশি লোকের মৃত্যু হয়। হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস কাপড়ে লেগে থাকা শুকনো রক্তে কিংবা যে কোনো স্থানে পড়ে থাকা শুকনো রক্তে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় বেঁচে থাকে। হেপাটাইটিস-বি এর এই শক্তিমত্তা এটাই প্রমাণ করে যে, যেখানেই থাকুক না কেন-যে কোনো সময় সেটা মানব দেহে আঘাত হানতে পারে।

রোগের উপসর্গ
অনেক সময় রোগের কোনো উপসর্গ নাও দেখা দিতে পারে। তবে প্রাথমিক স্তরে ঠাণ্ডায় কাঁপুনি, ক্ষুধামন্দা, ক্লান্তি অনুভব, অল্পমাত্রার জ্বর, শরীর ব্যথা প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। পরবর্তী স্তরে যে উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে তা হলো- অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, জণ্ডিস, ত্বক ও চোখে হলুদ বর্ণ, ফ্যাকাশে বর্ণের পায়খানা, গাঢ় বর্ণের প্রস্রাব প্রভৃতি।

এ রোগ কীভাবে ছড়ায়?
 সংক্রমিত সূচের আঘাতে সৃষ্ট ক্ষত, ত্বক কেটে যাওয়া কিংবা ছিলে যাওয়া অথবা সংক্রমিত সূচের মাধ্যমে রক্তদান বা রক্ত গ্রহণ করলে।
 রক্ত রসের মাধ্যমে যেমন লালা, ঘাম, ক্ষত থেকে নিঃসৃত রস (এটা সবচেয়ে বেশি ঘটে খেলার মাঠে শিশুদের ক্ষেত্রে)।
 সংক্রমিত সূচ দিয়ে শরীরে টাট্টু চিহ্ন আঁকলে।
 সংক্রমিত মায়ের কাছ থেকে জন্মের সময় কিংবা প্রাথমিক ভ্রƒণাবস্থায়।
 সংক্রমিত ব্যক্তির সাথে দুর্ঘটনাজনিত সংস্পর্শের মাধ্যমে যেমন কেটে গেলে বা ছিলে গেলে তাকে যদি সংক্রামিত ব্যক্তি বহন করে।
 ডেন্টিস্টের চেম্বারে দাঁতের চিকিৎসায় একই যন্ত্রপাতি বিভিন্ন জনের ওপর ব্যবহার করলে।

হেপাটাইটিস-বি এর চিকিৎসা
সত্যিকার অর্থে হেপাটাইটিস-বি এর তীব্র সংক্রমণে চিকিৎসার ক্ষেত্রে মূলত কোনো কার্যকর ওষুধ নেই। কিছু নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে ‘ইন্টার ফেরন’ ওষুধটি ব্যবহার করা হয় কিন্তু ওষুধটি খুব দামি এবং সাফল্যের হার মাত্র ১০-২০ শতাংশ। সুতরাং প্রতিরোধই এই রোগের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার একমাত্র ব্যবস্থা এবং একমাত্র টিকার মাধ্যমেই সে প্রতিরোধ সম্ভব। যদি জন্মের সময় শিশুকে এই টিকা দেয়া না হয় তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টিকা দিতে হবে। এই টিকা যেকোনো বয়সে, যেকোনো তারিখে ও যেকোনো সময় দেয়া যায়। একমাত্র এই টিকাই পারে বাচ্চাকে হেপাটাইটিস-বি এর সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে। শরীরে হেপাটাইটিস-বি এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ‘হেপাটাইটিস-বি টিকা’ এনজারিক্স খুবই কার্যকর।

হেপাটাইটিস-বি টিকার সময়সূচি
মাংসপেশিতে বিভিন্ন সময়ে তিনটি মাত্রায় এ টিকা দেয়া হয়-
 প্রথম মাত্রা-যেকোনো দিন।
 দ্বিতীয় মাত্রা- প্রথম মাত্রার এক মাস পর।
 তৃতীয় মাত্রা-প্রথম মাত্রার ৬ মাস পর।
টিকার কার্যকারিতা দীর্ঘায়িত করার জন্য প্রথম মাত্রার পাঁচ বছর পর আরেকটি মাত্রা দেয়া হয় যেটাকে বুস্টার মাত্রা বলে।
বি:দ্র: যেকোনো বয়সে যে কেউ হেপাটাইটিস-বি রোগে আক্রান্ত হতে পারে যদি সে টিকা না নিয়ে থাকে। টিকা দিয়েই এই রোগ প্রতিহত করার একমাত্র উপায়। আপনি নিজে টিকা নিন এবং পরিবারের সদস্যদের টিকা দিয়ে বিপদমুক্ত করুন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমাটোলজি বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।
চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিঃ, ২ ইংলিশ রোড, ঢাকা।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com