গার্ল অন দ্য পিকচার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শাকুর মজিদ

বহুদিন আগে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির লাইব্রেরিতে পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া ছবিগুলো দেখেছিলাম। সেখানে ভিয়েতনাম যুদ্ধের একটা ছবিও ছিলো। ১৯৭২ সালের ৮ জুনের এক বিকেলে দক্ষিণ ভিয়েতনামের ত্রাং ব্যং গ্রামে তখন আমেরিকান প্লনে নাপাম বোমা ফলেছ।ে এ-বোমা থেকে বারুদ বেরোয় না কিন্তু তার ধোঁয়া যেখানে যায়, সেখানে মানুষের চামড়া থাকে না। খসে পড়ে যায়। ভয়ানক এই বোমা ফেলা হয়েছে সে গ্রামে। এ গ্রামেই ঘটনাচক্রে এসোসিয়েট প্রেসের তরুণ ফটোগ্রাফার নিক উডও থাকতেন। একুশ বছর মাত্র বয়স তার। ফটোগ্রাফি করতে হলে জীবনের অনেক ঝুঁকি নিতে হয়। তিনি নিয়েছেনও কয়েকবার। ভিয়েতনামের সঙ্গে আমেরিকা যুদ্ধ করছে। আর তিনি প্রতিদিন অপেক্ষা করেন একটা ভালো ছবির। সেদিন বিকেলবেলা তার মনে হলো ছবিটি তিনি পেয়ে যাবেন। বোমার শব্দে লোকজন যখন গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে, তিনি তখন তাদের সে-ভয়ংকর অনুভূতিমাখা দৃশ্যগুলো ধারণ করছেন। এ-দৃশ্যের একটি ছিলো—কিম ফুকসহ একদল শিশুর দৌড়ে পালানোর দৃশ্য। তবে এ-ছবিতে ৯ বছরের এ-বালিকা শিশুটির গায়ে কাপড় ছিলো না। বোমার শব্দ শুনে যে যেভাবে পারে পালিয়ে যায়। কী কারণে তার শরীর থেকে সব কাপড় খুলে গিয়েছিলো, যদিও ভালো করে তা জানা গেলো না, তারপরও ছবিটি হয়ে গেলো অসাধারণ।
৮ জুন এ-ছবিটি তোলার পরপরই নিক মেয়েটিকে কোলে নিয়ে হাসপাতালে যান। চলতে থাকে তার চিকিৎসা। ১২ জুন ১৯৭২তারি

ভিয়েতনামী ফটোগ্রাফার নিক উডের ১৯৭৩ সালে তোলা ছবি

খে এ-ছবিটির খবর যখন আমেরিকার পত্রিকায় প্রথম প্রকাশ হয় তখন সারা দুনিয়ার নজর পড়ে ভিয়েতনামি এ-যুদ্ধকে নিয়ে। রৈ রৈ পড়ে যায় ফটোগ্রাফার এবং ফটোগ্রাফের সে-মেয়েটিকে নিয়ে। সে-বছরই ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো প্রতিযোগিতায় এ-ছবিটি সেরা ছবি হিসেবে পুরস্কৃত হয়। ১৪ মাস চিকিৎসার পর কিম মোটামুটি সুস্থ হয়ে যখন তার গ্রামে ফেরে তখন থেকেই সে সেলিব্রেটি হয়ে যায়। কিমকে নিয়েও চলতে থাকে নানা রকমের গল্প। তার গল্প নিয়ে ডকুফিল্ম হয়েছে, ২-৩টা বই পর্যন্ত লেখা হয়েছে। ৪৫ বছর বয়স্কা এই মহিলা এখন কানাডায় আছেন ইউনেস্কোর দূত হিসেবে। এসব খবর এখন ইন্টারনেট ঘাঁটলে পাওয়া যায়।
কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধের সে জায়গাটুকু যদি নিজের চোখে একবার দেখে আসা যেতো, মন্দ হতো না। ইচ্ছা তো প্রায়ই থাকে কিন্তু সুযোগ হয়ে ওঠে না। এবার হয়ে গেলো।
আমাদের পাঁচজনের একটা দল আছে। আমরা বলি পিপি। মানে পঞ্চ পর্যটক। এদের যে কোনো চারজন যদি হঠাৎ করে কোনো দেশের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন, আমাদের পঞ্চমজনের না করার সুযোগ থাকে না। এবারের এই দলে আমি একান্তই পঞ্চম। আমার কাজ ছিলো আরিফ ভাইয়ের কাছে পাসপোর্ট জমা দেয়া। আমাদের দলের অপর একজন সাঈদ ভাই। তার ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা। সুতরাং পৃথিবীর যে কোনো দেশে ভ্রমণ করার জন্য টিকিট কাটার ঝামেলা আমাদের কখনোই পোহাতে হয় না।
এক সময় জানতে পারি, ভিয়েতনাম যাবার জন্য আমাদের যাত্রা ঠিক হয়েছে। এয়ারপোর্ট পৌঁছে ইমিগ্রেশন করার সময় আমার পাসপোর্ট আর টিকেট হাতে পাই।
১৪ মে, ২০০৭ সাল।
বিমানে উঠে থ বনে যাই। এ বিমান যাবে ব্যাংকক। কেন?

সাইগন শহরে মোটরবাইকের মিছিল

প্রশ্ন করলেও জবাব আসে না। তাহলে কি ভুল বিমানে আমরা চড়ে বসেছি?
আরিফ ভাইকে কথা বললে আমাকে চুপ করে থাকতে উপদেশ দেন। লাভলু ভাই আর এনায়েত ভাই মিষ্টি করে হাসেন। আমার ভরসা সাঈদ ভাই। তিনি আমাকে বুঝিয়ে বলেন সাইগনের কোনো ডাইরেক্ট ফ্লাইট ঢাকা থেকে যায় না। সবচে সহজে যাওয়া যায় ব্যাংকক বা কুয়ালালামপুর থেকে। ফেরার পথে ব্যাংকক শপিং করে আসবো বলে ব্যাংকক হয়ে যাচ্ছি। চিন্তা করিস না, ব্যাংককে আমাদের মাত্র দেড় ঘণ্টার ট্রানজিট। তারপরই হো চি মিন সিটি।

সুড়ঙ্গের ভেতর

বলি হো চি মিন আবার কোন দেশ, টিকেটে তো লেখা সাইগন।
ওই একই। আগে এর নাম ছিলো সাইগন। শহরের নাম বদলেছে কিন্তু এয়ারলাইনস্ নতুন নাম নিতে পারে না। যা সাইগন, তাই হো চি মিন সিটি।
চুপ করে বসে থাকি।
থাই এয়ারওয়েজের এই বিমানবহরের সামনে একটা বড় মনিটর। এ মনিটরে নানারকম লেখাজোখা ভেসে ওঠে।
ভিয়েতনাম দেশটি সম্পর্কে আমার তেমন কোনো ধারণা নেই। শুধু জানি, ওখানে একটা মারাত্মক যুদ্ধ হয়েছিলো আমেরিকার সঙ্গ। বহু বছর ধরে এ যুদ্ধ চলেছিলো। আর দুটো ফটোগ্রাফ দেখেছি ভিয়েতনাম যুদ্ধের। একটি সেই খালি গায়ে দৌড়ে পালানো মেয়েটির। আরেকটি সে সময়ই সাইগন শহরে তোলা। এক ভিয়েতনামি জেনারেল এক তরুণকে গুলি করছে। পিস্তল থেকে গুলি বের হবার ঠিক আগের মুহূর্তের ছবি। এ ছবিটিও আন্তর্জাতিকভাবে পুরস্কৃত হয়েছিলো।
ভিয়েতনাম সম্পর্কে মাত্র এই দুটি তথ্য জেনে নিয়ে এক সময় আমরা নেমে পড়ি হো চি মিন সিটি বিমানবন্দরে।
তখন সন্ধ্যা নেমেছে সাইগনের আকাশে।
বিমানবন্দর থেকে বেরোতেই বুঝতে পারি, ঢাকা থেকে ইন্টারনেটে ঠিক করে রাখা ট্রাভেল এজেন্ট আমাদের ধোঁকা দেয়নি।
আমাদের পিপিদের মধ্যে আমার বেশভূষাটি একটু অন্যরকম। দুই কাঁধে দুই ক্যামেরা। অসংখ্য পকেটওয়ালা জ্যাকেট আর ফুলপ্যান্ট। এসব দেখে আমাকে না-জানি কী মনে করলো লোকটা। কাছে এসে হ্যান্ডশেক করে পরিষ্কার ইংরেজিতে বলে, হ্যালো মিস্টার আরিফ, ওয়েল কাম টু সাইগন।

আমেরিকানদের ফেলে যাওয়া ট্যাংকের সামনে পঞ্চ পর্যটক

আরিফ ভাইকে ডেকে আনি।
যে ট্যুর অপারেটিং কোম্পানি আমাদের এই সাতদিনের দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে তাদের ঠিক করে দেয়া এই গাইড এবং দোভাষী। তার একটা ভিয়েতনামি নামও আছে। বেশ জটিল। তিনবার চেষ্টা করেও আমরা কেউ তার নাম ধরে ডাকতে পারি না। একসময় সে-ই আমাদের অনেকটা সহজ করে দিয়ে বললো, তাকে ‘হ্যারি’ নামেও ডাকা যাবে। ওটা ওর ইংরেজি নাম।
হ্যারি আমাদের নিয়ে একটা বড়সড় ভ্যানগাড়িতে উঠে পড়লো। মিনিট পনেরোর মাথায় আমরা যে হোটেলে এসে উঠলাম, তা দেখে মনটা ভরে যায়। এর নাম রেক্স হোটেল।
বেশ খানদানি একটা ভাব আছে হোটেলের সাজ-সজ্জায়। এক সময় এটা ফরাসি সরকারের সচিবালয় ছিলো। এখন হোটেল। সারাদিনের ক্লান্তিকর জার্নির পর খুব বেশি এডভেঞ্চারস হতে আর ইচ্ছে হলো না। পরদিন ভোরবেলায় হ্যারি আসবে। সকাল ৯টায় আমরা বেরিয়ে পড়বো হো চি মিন সিটি দেখতে।
দেশ ছেড়ে কোথাও গেলে আমার প্রায়ই যা হয়, এখানেও দেখি তা। খুব ভোরবেলা ঘুম ভেঙে যায়। যদি বাংলাদেশের হিসাবে তখন ভোর পাঁচটায় আমার ঘুম ভাঙার কথা নয়, তবুও ভিয়েতনামের প্রথম ভোরে সকাল সাতটার পর আর বিছানায় থাকতে ইচ্ছা হলো না। বিদেশে যখন বেড়াতেই যাই, তখন আর হোটেলের কামরায় শুয়ে বসে সময় নষ্ট করা কেন?
ভারি মুভি ক্যামেরাটা রুমে রাখি। রুমমেট সাঈদ ভাইকে বিছানায় রেখে নাইকনরে স্টিল ক্যামেরাটা নিয়ে আস্তে করে বেরিয়ে পড়ি।

সুড়ঙ্গ নিয়ে কৌতুহলী পর্যটক

সকাল সাড়ে ৭টা কিন্তু ভিয়েতনামের অনেক সময়। হোটেলের নিচ দিয়ে শুরু হয়েছে মোটরবাইকের মিছিল। শত শত নয়, হাজারে হাজারে মোটরবাইক। এ শহরে তেমন গাড়ি চোখে পড়ে না। চীনের মতো অতো সাইকেলও নেই। কিন্তু মোটরবাইক আছে। যত পুরুষ, প্রায় তত মহিলা। হাতে গ্লাভস, নাকে মুখে ধুলো থেকে বাঁচার জন্য কিছু বন্ধনী। এই যা। তবে খটকা লাগলো এদের মাথায় কিন্তু হেলমেট নেই এবং বেশির ভাগ মোটরসাইকেলে একজন মাত্রই আরোহী।
একটা বেঞ্চের উপর বসে এই হো চি মিন সিটিবাসীদের দেখি।
ভিয়েতনাম এবং হো চি মিন শব্দ দুটি একই সুতোয় গাঁথা।
হো চি মিন ভিয়েতনাম যুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা। ১৮৯০ সালে হুয়াং ট্রু গ্রামে হো চি মিন জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের অনেক চড়াই উৎরাই পাড়ি দিয়ে হো চি মিন ১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। কিন্তু তৎকালীন পুঁজিবাদী বিশ্ব তার প্রধানমন্ত্রীত্বরে স্বীকৃতি না-দেয়ায় তিনি সাম্রাজ্যবাদী ফরাসিদের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামের স্বাধীনতা যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তার নেতৃত্বে ভিয়েতনামিরা যুদ্ধে জয়লাভ করে। হো চি মিন হন ভিয়েতনামের প্রথম প্রেসিডেন্ট। সমস্যা পুরোপুরি দূর হয় না। দক্ষিণ ভিয়েতনামে আসন গেঁড়ে বসে থাকে ফরাসি আর আমেরিকানদের পুতুল সরকার। হো চি মিন ভিয়েতনামের তৎকালীন পুতুল সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। যার ফলে শুরু হয় আমেরিকানদের সঙ্গে ভিয়েতনামিদের যুদ্ধ। দীর্ঘ এই যুদ্ধের নেতৃত্বও দিয়েছিলেন হো চি মিন। আমেরিকানদের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে ১৯৬৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর হ্যানয়ে তার নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন ভিয়েতনামের এই বিপ্লবী নেতা।
ভিয়েতনামিদের সকল প্রেরণার উৎস এ-বিপ্লবী নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য তার মৃত্যুর প্রায় ৩০ বছর পর সিটি হলের সামনে এ-ভাস্কর্য বানিয়ে রাখা হয়েছে।
ভিয়েতনাম দেশটির প্রতিটি ধূলিকণায় জড়িয়ে আছে ভয়াবহ এক যুদ্ধের স্মৃতি। প্রায় সিকি শতাব্দী জুড়ে ভিয়েতনামবাসীরা যে দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা বয়ে বেড়িয়েছিলো। সেসব স্মৃতিমাখা অঞ্চল নিয়ে দূরাগত পর্যটকদেরও অনেক কৌতূহল।
আমাদের পঞ্চপা-বীয় পর্যটক দলটিও চঞ্চল হয়ে ওঠে ভিয়েতনাম যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত পর্যটনপ্রিয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার জন্য।
চু চি
দুপুরের খাবার সেরে আমাদের গাড়ি ছুটে চলে ভিয়েতনামের গ্রাম এলাকা দিয়ে। এসে পড়ি ফাঁকা হাইওয়েতে। বেশ খোলামেলা। ডানে বামে যে-দিকেই চোখ যায়, সবুজের সমারোহ।

এসব সবুজ অরণ্যের মধ্যেই মূলত ভিয়েতনামের গ্রামাঞ্চল। এরকম একটি অঞ্চলই ছিলো ভিয়েতনামি গেরিলা সৈন্য ন্যাশনাল ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশনের অভয় আশ্রম।
দু দিকের যে সবুজ শস্যক্ষেত তা সবই ধানের জমি। বর্তমানে পৃথিবীর এক নম্বর চাল রপ্তানিকারক দেশ ভিয়েতনাম। সে দেশের মাঠের দিকে চোখ রাখলেই ধানের ক্ষেত চোখে পড়বে এটাই স্বাভাবিক।
সবুজ শস্যক্ষেত পেরিয়ে রাস্তাটি একটি জঙ্গলকে দু ভাগ করে চলে গেছে।
জঙ্গলঘেরা হাইওয়ে দিয়ে কিছু দূর এসেই আমাদের বাসটি থেমে যায়। এখান থেকেই সেই ঐতিহাসিক জঙ্গলের শুরু। যার প্রতিটি বৃক্ষ, তার ডালপালা আর লতাগুল্মরাও ভিয়েতনামি গেরিলাদের গৌরব গাথার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
যে মাটি সহ্য করেছে কয়েকশ টন বোমার আঘাত।
ট্যুরিস্ট বাস থেকে নেমেই পর্যটকেরা চঞ্চল হয়ে পড়েন রহস্যময় এই জঙ্গলটি ঘুরে দেখার জন্য।
ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে প্যাকেজ ডিল। সুতরাং টিকেট কাটার জন্য ব্যস্ততা আমাদের হ্যারির। গাড়ি থেকে নেমে সুনসান এই জঙ্গলকে দেখি। সামনেই একটা বড় বিলবোর্ড সেখানে আঁকা আছে এই জঙ্গল হ্যারির। আমার প্রশ্নের জবাব দেয়ার সময় তার নেই। আমাকে বলে, চলেন ভেতরে ডেমনেস্ট্রেশনের ব্যবস্থা আছে। আসেন।

মাটির তলার সুড়ঙ্গপথের রিলিফম্যাপ

সামনে সেমিনার হল। দেয়ালের একদিকে একটা মাঝারি সাইজের টেলিভিশন। তার পাশে বোর্ডে বড় করে আঁকা ভিয়েতনাম যুদ্ধক্ষেত্রের রিলিফ ম্যাপ। আমাদেরে
ক ১০ মিনিটের একটা ডকুমেন্টারি দেখানোর পর সেই রিলিফ ম্যাপ নিয়ে শুরু হয় গাইডের দীর্ঘ বক্তৃতা।
চু চি জঙ্গলের অবস্থান তৎকালীন সাইগন থেকে ৭০ কিলোমিটার উত্তর দিকে। চু চি’র এই টানেলকে আয়রন ট্রাইএ্যাঙ্গেল বলা হয়। টানেলের একটা মাথা চলে গেছে সাইগন নদীর দিকে, অপর মাথাটি সাইগন শহরের দিকে।
যুদ্ধের সময় টানেলের এই মাথা সাপ্লাই টানেল হিসেবে ব্যবহার হতো। টানেলের এই অংশ দিয়ে খাবার, ওষুধ, অস্ত্রপাতি এবং অন্যান্য রসদ যেতো গেরিলাদের হাতে। সে কারণে টানেলের মুখটি ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
পুরো ভিয়েতনাম জুড়ে এরকম সুড়ঙ্গ আছে প্রায় ২০০ কিলোমিটার। এই সমস্ত সুড়ঙ্গ যুক্ত হয়েছে জেলা থেকে জেলা, একগ্রাম থেকে অন্যগ্রাম, এক সেনাক্যাম্প থেকে অন্য সেনাক্যাম্পে।
ভিয়েতনামিদের এরকম টানেল তৈরির কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিলো না। যুদ্ধের বাস্তবতা তাদের বাধ্য করেছে এরকম টানেল তৈরি করতে। এর শুরু সেই ১৯৪৮ সালে যখন তারা ফরাসিদের অধীনতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ফরাসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। ফরাসিদের বিমান হামলা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তারা মাটির নিচে সুড়ঙ্গ বানিয়ে সেখানে আশ্রয় নেয়ার জন্য শুরু করে টানেল নির্মাণের কাজ যা চলতে থাকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত।
আমেরিকানরা এ খবর জেনে যাবার কারণে তাদের এই টানেল ধ্বংস করার যাবতীয় চেষ্টা চালায়।
পুরো চু চি জঙ্গলের উপর আমেরিকান বি-৫২ বোমারু বিমান থেকে ৩০ টন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বোমের বিস্ফোরণও ঘটানো হয়।
ইউএস ইনফেন্ট্রি ডিভিশন থেকে আট হাজার সৈন্যকে জঙ্গলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়।
আমেরিকানদের পুরো অপারেশনটাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
৩০ টন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বোমা ভিয়েতনামি গেরিলাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারেনি। আর আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত আট হাজার আমেরিকান সৈন্যের একজনও তাদের সেনা ক্যাম্পে ফিরে আসেনি পরবর্তী যুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য। তার কারণ, যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গেরিলারা ঢুকে পড়েছে টানেলে। আমেরিকান সৈন্যরা যখনই একটি টানেলের মুখ খুঁজে পেয়েছে তখন তারা এর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ দেখে অবজ্ঞা করেছে। কিন্তু তার পরপরই তাদের জন্য এই সুড়ঙ্গমুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে মৃত্যুদূত।
সুড়ঙ্গগুলো ছিলো এত চিকন যে একজন আমেরিকান সৈন্যের চওড়া শরীর নিয়ে এর ভেতরে ঢোকা ছিলো প্রায় অসম্ভব কিন্তু ভিয়েতনামি গেরিলারা অবলীলায় ঢুকে যেতে পারতো এর অলি-গলিতে।
শুধু কি তাই? টানেলের প্রবেশমুখ খুঁজে পেতেও মারা গেছে অনেক আমেরিকান সৈন্য। পুরো জঙ্গলে বানিয়ে রাখা ছিলো অসংখ্য মৃত্যুফাঁদ। বড় বড় গর্ত করে পুরো গর্তজুড়ে খাড়া করে রাখা হতো সুচের মতো চোখালো বাঁশের ফলা। আর গর্তের উপরটুকু ঢেকে দেয়া হতো হালকা করে আলগা মাটি দিয়ে। আলগা মাটির ওপর বসিয়ে দেয়া হতো আগাছা। অসাবধানতায় সেসব আগাছার উপর পা রেখে নিচের বাঁশের ফলায় বিদ্ধ হয়ে জীবন দিয়েছে পৃথিবীর সবচে প্রশিক্ষিত সৈন্য।
ব্যর্থ এই অপারেশনের ঝাল ঝাড়তে ১৯৬৭ সালে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ৩০ হাজার মার্কিন

চু চি জঙ্গলে মোমের গেরিলা

সেনা পাঠানো হয় এই চু চি জঙ্গলে। বিশেষ প্রশিক্ষিত এই সেনাদের নাম দেয়া হয় টানেল র‌্যাট। মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে এরা টানেল খুঁজে বের করবে এবং বধ করবে ভিয়েতনামি গেরিলাদের। এই অপারেশনের নাম দেয়া হয় অপারেশন সিডার ফলস।
আমেরিকানদের সমস্ত দম্ভকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে ভিয়েতনামি গেরিলাদের কৌশল।

এতো এতো ব্যর্থতার গ্লানেিক চাপা দিতে আমেরিকানরা ১৯৬৯ সালে বি-৫২ বোমারু বিমানের সাহায্যে কার্পেট বোম্বিং শুরু করে। উদ্দেশ্য চু চির সমস্ত টানেল এবং সব থেকে কার্যকরী আয়রন ট্রাইএ্যাঙ্গেল ধ্বংস করা।
পুরো টানেল সিস্টেমের উপর প্রায় কয়েক শ টন বোম্বিংয়ের ফলে টানেলের অনেক অংশ দেবে যায় এবং কিছু কিছু অংশ অন্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আমেরিকানরা একেই সফল অপারেশন হিসেবে ধরে নেয়। যে সফলতা আসলে কোনো কাজেই আসেনি। কার্যত তখন আমেরিকানদের অবস্থা এমন যে আর একদিনও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই। এসব তথ্যই বেরিয়ে আসে স্থানীয় গাইডদের ব্রিফিং থেকে।
গাইডদের ছবক নিয়ে গহীন জঙ্গলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। দলে দলে পর্যটকেরা রওনা হন গহীন জঙ্গলের দিকে। সব দলে এক বাস ভর্তি পর্যটক। ২০-২৫ জনের মতো হবে। আমাদেরটাই সবচে ছোট। মাত্র ৫ জন পর্যটক নিয়ে একটা দল।
টানেল যাত্রার বোধটুকু উপভোগ করার জন্যই হয়তো ফাইবার গ্লাসে ছাদ দিয়ে একটি আধুনিক টানেলের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয় পর্যটকদের স্রোতধারা।
এই টানেল দিয়ে বেরিয়েই মুখোমুখি হতে হয় সেই টানেলের।
দীর্ঘ ২১ বছরের দুঃসহ যন্ত্রণার স্মৃতিবাহী ভিয়েতনামি গেরিলাদের সেসব টানেলের দু একটি অবিকল তেমন করেই সাজিয়ে রাখা হয়েছে ভিয়েতনামি উত্তরপুরুষ আর বিশ্বপর্যটকের জন্য। আমরা তার একটিতে এসে দাঁড়াই।
জঙ্গলের ভেতরের পায়ে চলা পথ ধরে অল্প এগোলেই দেখা মিললো এক ভিয়েতনামি গেরিলা দাঁড়িয়ে আছে।
তার কাছাকাছি যেতেই দেখা মেলে আসল গেরিলা টানেলের প্রবেশমুখ। আমাদের সংগীরা গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখতে থাকেন বিশ্বের সর্বকালের সার্থক যুদ্ধকৌশলের প্রবেশমুখ। পাশাপাশি আরো কতগুলো টানেলের প্রবেশমুখ। এই প্রবেশমুখ দিয়েই এক সময় কতো শত ভিয়েতনামি গেরিলা হারিয়ে গেছে মাটির নিচের গহীনে। সংযুক্ত হয়েছেন এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায়।
এই টানেলকে হাতের কাছে পেয়ে, তার অভিজ্ঞতাটুকু হাতছাড়া করতে মন চাইলো না। হ্যারি বললো, এই টানেলের মূল দৈর্ঘ্য ছিলো ২৫০ কিলোমিটার কিন্তু এখন আর তা নেই। কাজ কী আর টানেল রেখে! কিন্তু পর্যটক আর উত্তর প্রজন্মের জন্য মাত্র দুটো টানেল রাখা আছে। যার একটি ২০ মিটার, অপরটি ৫০ মিটার দীর্ঘ। এই সুড়ঙ্গ দিয়ে কী করে ভিয়েতনামি গেরিলারা যুদ্ধ করতো, তা দেখানোর জন্য হ্যারি নেমে গেলো গর্তের ভেতর। এটা দেখে আমাদের পিপি বাহিনীর অনেক উৎসাহ বেড়ে যায়। আরিফ ভাইয়ের মোটা শরীর। অনেকটা আমেরিকানের মতো। তিনি নামলেন সবার আগে। অনেক উৎসাহ তার। গর্তের ভেতর ঢুকে পোজ মেরে ছবিও তুললেন একটা। আমাদের কাছ থেকে বিদায়ও নিয়ে গেলেন। দেখা হবে সুঙ্গের ঐ মাথায়। তিনি ২০ মিটার সুড়ঙ্গ ক্রস করে ওপাশ দিয়ে বেরোবেন।
কিন্তু ২-৩ সেকেন্ড পর একটা চিৎকার দিয়ে তাকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেলো ঠিক সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখে। ভয় পেয়েছেন তিনি। এমন অন্ধকার জীবনে কখনো তার দেখা হয়নি।

যুদ্ধের সময় মাটির তলায় বানানো ঘরগুলোর উপর এমন ছাউনি

সুড়ঙ্গের মুখে এসে আমাদের দেখে ফেলাতে ভয় তার কেটে গেছে। তিনি এবার হাসতে শুরু করেছেন। তার এই হাসি দেখে এনায়েত ভাই তার চুরুটে শেষ টান দিয়ে তিনি প্রস্তুতি নেন নামার। তার শরীর চিকনা-চাকনা। সুতরাং নামতে তার কোনোই বাধা নেই এবং তিনি যথারীতি নামলেন, সানগ্লাসটা ঠিকমতো পরে একটা স্টিল ফটোও তুলে নিলেন। এবার চশমাটা খুলে পকেটে ঢুকিয়ে নামলেন সিংহের মতো। যাবার আগে হাত নেড়ে অভিবাদনও জানালেন সবাইকে। আমরা সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ থেকে ধীরে ধীরে সরে যাই বাহির মুখের দিকে। এনায়েত ভাইকে আমাদের স্বাগত জানাতে হবে সেখানে। দুই কদম ফেলার পর তৃতীয় কদম ফেলার আগে তিনিও যথারীতি প্রবেশমুখ দিয়ে বেরিয়ে এলেন অনেকটা বিড়ালের মতো। সহজ বাংলায় তার অনেক ভয় হচ্ছিলো। যদিও চু চির জঙ্গলে দায়িত্বরত কিছু লোক আছে। স্বেচ্ছাসেবী গাইড। তাদের হাতে টর্চ থাকে। তারা টর্চ দিয়ে দেখিয়ে নিয়ে যাবে ভেতরে। আমাদের পিপির চারজনই প্রবেশমুখের ভেতর ঢুকে পোজ মেরে একটা ছবি তুলে সুড়ঙ্গ দেখা শেষ করলেন।
এখন কী করি?আমি কি এখন মহাবীর আলেকজান্ডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবো? হতে গিয়ে যদি সুড়ঙ্গের ভেতর আটকে যাই? যদি ফেরত না-আসি? যদি সুড়ঙ্গের ভেতরে হঠাৎ করে বিষাক্ত কোনো গ্যাস বেরিয়ে আসে? অথবা উপর থেকে মাটি চাপা পড়ে সুড়ঙ্গটা ধসে পড়ে আমার মাথায়।
আমাদের গাইডের সাহায্য নিয়ে জঙ্গলের স্বেচ্ছাসেবী ভাইটির সঙ্গে কথা বলি। সে বলে, ভয়ের কোনো কারণ নেই। অনেকেই এ সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢোকে। আপনি ঢুকতে চাইলে চলুন, আমিও যাবো। অন্ধকারে ভয় পাবেন না, ভয় পেলেই আমাকে ডাকবেন, টর্চ জ্বালিয়ে দেবো।
যেই কথা সেই কাজ।
যথারীতি সুড়ঙ্গের মুখে নেমে আমিও পোজ মারলাম একটা স্টিল ছবি তোলার জন্য। আমার ছবি তুলছে ৪টি ক্যামেরা। বাহ! সুড়ঙ্গের ভেতর পা রেখেই টের পেলাম, আমার বড় ডিভি ক্যামেরাটা ওখানে নিয়ে যাওয়া যাবে না। যে পরিমাণ পরিসর, তাতে শুধু নিজেই নামতে পারবো হয়তো। মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত পাল্টে দিলাম। ভারি ক্যামেরাটা উপরে পাঠিয়ে ছোট্ট ম্যাচবাক্সের মতো যে ডিজিটাল স্টিল ক্যামেরা আমার সাথে, তাতে ভিডিও মোড অন করে আল্লাহর নাম নিয়ে ঢুকে পড়লাম সুড়ঙ্গের ভেতর।
৩-৪ পা এগোনোর পর টের পেলাম আমার পূর্ববর্তী বীর পর্যটকেরা কী কারণে ভীত হয়েছিলেন। আমিও দাঁড়িয়ে যাই। কিন্তু দাঁড়াবার সুযোগ ওখানে নেই। ওখানে চলতে হবে হামাগুড়ি আর দাঁড়ানোর মাঝামাঝি শারীরিক অবস্থানে। নিকষ অন্ধকারে যে ফেরত আসবো, তারও সুযোগ নেই। তিন চার কদম সামনে এসে গেছি। পেছনে ফিরতে হলে আমার শরীরটাকে ঘোরাতে হবে উল্টা দিকে কিন্তু এই কঠিন সুড়ঙ্গের ভেতর তার সুযোগ কই? আমার একহাতে ডিজিটাল স্টিল ক্যামেরা অন করা, অপর হাতে হাতড়াতে থাকি সুড়ঙ্গের দেয়াল। একেবারেই মাটির দেয়াল। একজন মানুষ হামাগুড়ি দিয়ে চলতে পারবে সেরকম তার দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ এবং লক্ষ করি যে, সুড়ঙ্গটি ড্রেনের মতো সোজাও নয়। সাপের মতো আঁকাবাঁকা তার অবয়ব। এর মধ্যে দুবার আমাকে বাঁক ঘোরানোর সময় বাতি দেখিয়েছে জঙ্গলের স্বেচ্ছাসেবী গাইড। তিনবার সে কথা বলেছে জোরে।
কিন্তু তারপরও মাত্র ৬০ ফুট দূরত্বের অন্ধকার সুড়ঙ্গপথ পাড়ি দিতে আমার কতশত সেকেন্ড সময় পার হয়েছে বুঝতে পারি না। হামাগুড়ি দিতে দিতে একসময় দেখি সামনে আলো দেখা যায়। আমার হামাগুড়ির গতি বেড়ে যায়। দৌড়ানোর সুযোগ থাকলে হয়তো দৌড়ে যেতাম, কিন্তু তা তো সম্ভব ছিলো না।
সুড়ঙ্গের মুখে এসে মনে হলো বিশাল আয়োজন নিয়ে অপেক্ষা করছে আমার সংগীরা। ম্যাচ জয়ের পর আশরাফুলকে যেভাবে জেঁকে ধরে প্রেস ফটোগ্রাফারের ক্যামেরা, আমার দিকেও তাক করে আছে সে

গাছের ডালের নিচে ঢাকা পড়ে যাওয়া ঘর

সব এবং শুধু আমার পিপিরাই নয়, অন্য গ্রুপরে পর্যটকদের ২-৪ জনও এসে শামিল হয়েছেন এই অভ্যর্থনায়।
উপরে উঠে প্রাণভরে নিশ্বাস নিলাম। কারণ, টের পাচ্ছিলাম, ভেতরের সুড়ঙ্গে শ্বাসপ্রশ্বাসের একটু সমস্যা হচ্ছিলো।
এরকম দুর্গম সুড়ঙ্গ ছিলো তখনকার ভিয়েতনামি গেরিলার সাধারণ বিচরণের ক্ষেত্র। এর ভেতর দিয়েই তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চলতো এবং সুড়ঙ্গের মুখ থেকে গুলি করে হত্যা করতো তাদের দেশে আগ্রাসন করতে আসা আমেরিকান সৈন্যদের।
টানেল মুখ দেখা শেষ করে একটু সামনে এগোতেই দেখা মেলে সম্মুখযুদ্ধের জন্য খনন করা বাংকার।
দু পাশে উঁচু বাঁধ। মাঝখানে খালের মতো একটি জায়গা। এই খালে ফাঁদ পেতে থাকতো ভিয়েতনামি গেরিলা। আর সুযোগ বুঝে কুপোকাত করতো সৈন্যদের। কেমন করে লুকিয়ে থাকতো খালের পাড়ে, তা দেখানোর জন্য কোনো কোনো গাইড নিজেই ডেমনেস্ট্রেশনে নেমে যান।
জঙ্গলের ভেতর দিয়েই আমরা হাঁটতে থাকি। সেই জঙ্গল, সেই কাঁচা রাস্তা। বনবাদাড়, ঝোপঝাড়, বড়-ছোট গাছ।
হ্যারি আমাদের নিয়ে এলো একটা ওয়ার্কশপে। ওয়ার্কশপটি আধখানা মাটির নিচে। মাটির উপরে শুধু তাদের চালটি। এখানে লোহা গলিয়ে বানানো হতো বন্দুক। কেমন করে আগুন জ্বালিয়ে লোহার লাভাকে নির্দিষ্ট তাপে অস্ত্রের আকার দেয়া হতো, তার ব্যবস্থা ছিলো তখন, আছে এখনও।
সবুজ আর আঁশটে হলুদ রঙের ইউনিফর্ম পরা যোদ্ধারা নিজেদের অস্ত্র বানাচ্ছে। হোক না মোমের বানানো এসব শ্রমিক কিন্তু আবহটা তো একেবারেই খাঁটি!
এরকম অনেক ঘর দেখলাম ঘুরে ঘুরে। কোনোটি হাসপাতাল, কোনোটি দর্জিঘর, কোনোটি রান্নাঘর, কোনোটি সভাকক্ষ। সবই মাটির উপর দোচালা শনের ঘর। মাটির সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামতে হয় তার ঘরে যেতে। সব স্থাপনার সর্বোচ্চ উচ্চতা যে কোনো বড় গাছের সবচে ছোট ডালের চেয়েও কম। সে কারণে আকাশ থেকে নেয়া এমনকি স্যাটেলাইটের রশ্মিতেও এসব স্থাপনার কোনো চিহ্ন ধরা পড়েনি আগ্রাসী মার্কিন সেনাদের কাছে।
মাটির তলার এরকম কয়েকটি স্থাপনা দেখার পর একটা প্রায় খোলা জঙ্গলের দিকে আমরা রওনা দিই। এখানে তাঁবু টাঙিয়ে কয়েকজন যোদ্ধা আছে। দুজন সৈন্য হাঁটাহাঁটি করছে এদের পাশে। সবার একই রকমের সামরিক পোশাক।
একজন যোদ্ধাকে দেখি একমনে বসে বসে ডায়রি লিখছে। সে কিন্তু একদম নড়ছে না। তার পাশে দোলনায় দুলছে দুই তরুণ সৈন্য। এদের একজন মহিলা। বেশ সুন্দরী। দলছুট হয়ে একেবারে কাছে গিয়ে বোকা বনে যাই। ওসব মোমের মূর্তি।
তাদের সঙ্গে দুজন মাত্র জীবন্ত সৈন্য। জীবন্ত আর মৃত মিলে একাকার। কোনোটার প্রাণ আছে, কোনোটার নেই, তা বড় বিবেচ্য থাকে না। মনে হয়, সবটাই জীবন, কেউ ১৯৭৫ সালের পর থেকে দীর্ঘ বিশ্রামে স্থির হয়ে আছে তার সংগ্রামের কাহিনী তার উত্তরসূরিকে শোনানোর জন্য।
একটু পর টের পাই এ জায়গাটি পর্যটকদের জন্য খুব পছন্দের জায়গা। মোমের ভিয়েতনামি গেরিলাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার একটা উৎসব পড়ে যায় পর্যটকের মধ্যে।
গাছের সঙ্গে কাপড় পেঁচিয়ে দোলনা বাঁধা থাকে। তার উপর মোমের গেরিলা শুয়ে। পর্যটকেরা ইচ্ছা করেই দোলনার গায়ে হাত বুলিয়ে দেন। মোমের গেরিলা আপন মনে দুলতে থাকেন।
এখান থেকে একটু দূরে, জঙ্গলের মধ্যে পড়ে থাকা একটা ট্যাংকের দিকে আমাদের মনোযোগ আকৃষ্ট হয়।
আমেরিকান এই এম-৪১ ট্যাংকটি ১৯৭০ সালের এক যুদ্ধে স্থলমাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভিয়েতনামি গেরিলারা অকার্যকর করে দেয়। সেই থেকে ট্যাংকটি পড়ে আছে এখানে।
আমরা রোমাঞ্চিত হয়ে পড়ি। বাংলাদেশ থেকে বেড়াতে যাওয়া পঞ্চ পর্যটক ফটোসেশনের জন্য দাঁড়িয়ে পড়ি ট্যাংকের গায়ে হেলান দিয়ে।
ঘণ্টা দুইয়ের মধ্যে আমরা প্রায় ক্লান্ত হয়ে পড়ি। হ্যারিকে বলি—ভাইজান, জঙ্গল থেকে বেরোবো কীভাবে? আমরা তো অনেক দূর চলে এসেছি সাইগন ফেরত যাবো না?
হ্যারি হাসে। বলে, ডো’ন্ট ওয়ারি। ইউ বাই স্যুভেনির? ভিয়েতনাম ওয়ার স্যুভেনির?
কেনাকাটার বিষয়ে আমাদের পঞ্চ পর্যটকের ৩ জনের আগ্রহ সবচে বেশি। আমার আগ্রহ কম, কারণ দামাদামি করতে সময় যায় অনেক। তারচেয়ে ঐ জিনিসগুলোর ছবি তোলার সময়টা আমার কাছে অনেক বেশি জরুরি। আর আমাদের সাঈদ ভাইকে পৃথিবীর খুব কম জিনিসই আকর্ষণ করে। অন্য কেউ কোনো কিছু দেখে বা কিনে পুলকিত হলে সাঈদ ভাইয়ের আনন্দের সীমা থাকে না।
আমার সহ-পর্যটকেরা ধেই ধেই করে ঢুকে পড়লো একটা বিশাল অট্টালিকার ভেতর।
এই স্যুভেনির শপের জিনিসপত্র একটু অন্যরকমের। হঠাৎ করে মনে হতেই পারে কোনো মিলিটারি ক্যাম্পের দোকানে এসে পড়েছি। সামরিক পোশাকের ছড়াছড়ি তার কাউন্টারগুলোতে। তাছাড়া মেশিনগানের কার্তুজের আদলে গ্যাস লাইটার। হ্যান্ড গ্রেনেডের আদলে বডি¯েপ্র, গেরিলারা যে ধরনের হ্যাট পরতো সে ধরনের হ্যাট, আমেরিকান সৈন্যদের ফেলে যাওয়া ট্যাংকের মিনি সংস্করণ। সবই চু চি টানেলের যুদ্ধের স্মৃতি বহনকারী স্মারক।
আমাদের সংগীরা যখন এসব কার্তুজ লাইটার হাতে নিয়ে নেড়ে-চেড়ে দেখছেন তখন শুনতে পাই তাজা এসল্ট রাইফেলের গুলির শব্দ। ছুটে যাই গুলির শব্দকে লক্ষ করে।
এই স্যুভেনির শপের পাশেই বিশাল মাঠ। ফাঁকা। মাঠের অপর প্রান্ত ঠেকেছে পাহাড়ের গায়ে। সেই পাহাড়ে কতগুলো বস্তা ঝুলিয়ে দেয়া আছে। মাঠের এপার থেকে সত্যিকারের গুলি করে বস্তা ভেদ করার মজা লুটতে যারা চায়, তাদের জন্য রাখা হয়েছে এই আয়োজন।
আগত পর্যটকেরা শুধু এসব যুদ্ধাস্ত্র দেখে আর যুদ্ধের কাহিনী শুনেই ফিরে যাবেন কেন। পর্যটকেরা যাতে এসব যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করতে পারে তারও ব্যবস্থা রেখেছে কর্তৃপক্ষ।
আমাদের এনায়েত ভাই উৎসাহী হয়ে ওঠেন এই যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের জন্য। তিনি পাঁচটি গুলি কিনে নেন দোকান থেকে। তারপর মাঠের এ পাশে সাজিয়ে রাখা মেশিনগানের কাছে চলে যান অপর এক গাইডের সঙ্গ। এরপর দ্রিম দ্রিম।

চুচি টানেলে মাটির তলার সভা কক্ষের প্রবেশ পথ

চু চি টানেল বন্ধ হয়ে যায় সূর্য ডোবার আগে। তারপর আর কেউ এখানে ঢুকতে পারে না। আমরা এই স্যুভেনির শপ থেকে বেরোতেই দেখি আমাদের গাড়ি সামনে দাঁড়ানো কিন্তু হঠাৎ করে এক জায়গায় এসে চোখ আটকে যায়। যুদ্ধের ভয়াবহতা যে কতোটা নৃশংস ছিলো তার একটি খন্ডচত্রি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে একটি বোর্ডের সাথে কতোগুলো আলোকচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে। যে নৃশংসতা থেকে বাদ পড়েনি ভিয়েতনামি শিশুরা। এসব বিকলাঙ্গ, অঙ্গহারা শিশুরা হয়তো ভিয়েতনামের মাটিতেই আজও বহন করে চলেছে যুদ্ধের ভয়াবহতার স্বাক্ষর।
চু চি টানেল এখন একটা পর্যটক এলাকা। দেশ-বিদেশ থেকে নানারকম পর্যটক আসছেন এখানে। তাদের মধ্যে নিশ্চয়ই আমেরিকান পর্যটকও আছেন কিন্তু হঠাৎ করে দেখে কাউকে সহজে আমেরিকান বলে চেনা যায় না, যেমন যায় চৈনিক বা জাপানিদের।
আমার খুব ইচ্ছা করে সেসব গেরিলা যুদ্ধ যারা করেছিলো তাদের কারো সঙ্গে কথা বলতে। নিশ্চয়ই তাদের অনেকেই বেঁচে আছেন এখনও। আমার মনের কথা হ্যারিকে খুলে বলি। হ্যারি বলে তার চেনাজানা অনেকেই আছে। তবে বেশির ভাগই অসুস্থ। কারো হাত নেই, কারো পা কাটা। কেউ-বা অসুখ-বিসুখে ভুগছে।
এর মধ্যে এসে পড়ি টানেল এলাকার শেষ প্রান্তে। ছোট একটা গেট। এ গেট পেরোলেই আমাদের গাড়ি। হঠাৎ করে হ্যারি আমাকে থামায়। নিয়ে যায় গেটের দারোয়ানের কাছে। দারোয়ানটি বেশ তরুণ। ২৫-২৬ বছর বয়স হবে। হ্যারি আমাকে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ওর বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি নিজে এই জঙ্গলে গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। ওর এই চাকরিটা হয়েছে ওর বাবার কারণে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা সরকারি চাকরিতে সুযোগ পায় অন্যদের আগে। সে কারণে তার এই চাকরি।
তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি। হ্যারি আমাদের দোভাষী।
লোকটি জানায়, তার মা ও বাবা দুজনই একসঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন সেসময়। যুদ্ধের সময় মা মারা যান। বাবার একটা পা কাটা পড়ে। এখন পর্যন্ত তিনি বেঁচে আছেন এবং ঘরেই শুয়ে থাকেন। তার বাড়ি এখান থেকে ৩-৪ মাইল দূরে।
আমার ইচ্ছা করে ওর বাড়ি যেতে।
কিন্তু লোকটি এখন আমাদের নিয়ে যেতে পারবে না। এখন তার কাজ ডিউটি।
আমারও ডাক পড়ে গাড়ি থেকে। হো চি মিন সিটি এখান থেকে দুই ঘণ্টার পথ। আমার সঙ্গীরা ক্লান্ত। তারা হোটেলে পৌঁছার জন্য অস্থির হয়ে যান।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com